মেইন ম্যেনু

“ওরা মাসে চার বার আমার মেয়েটাকে নিয়ে যায়, আমার খুব ভয় হয়…”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তরুণী মা জানিয়েছেন নিজের সমস্যার কথা।

“আমি খুবই সাধারণ একটা মেয়ে। বাবা-মার পছন্দে বিয়ে হয়ে যায় আমার। বয়স ছিল চব্বিশ। বিয়ের দিন থেকেই আমাদের দুই পরিবারের ঝামেলা। বিয়ের পর দিনই বুঝতে পারি যে ভুল লোকের সাথে আমার বিয়ে দেয়া হয়েছে। বড় ডিগ্রি থাকলেই মানুষ বড় হতে পারেনা। তার পরিবার কী রকম শাস্তি আমাকে দিতো এটা আমি কাউকে বলতে চাই না। কিন্তু মজার বিষয় হলো এমন কাজ করতো যা কাউকে বললে হেসে উড়িয়ে দিবে। যেমন আমাকে একটা কাজ করতে দিলো বা কথা বললো, তারপর আমি সেটা করলে বলতো-“কই এগুলা কিছু করতে বলি নাই তো”।

বিয়ের দুই মাসের মাথায় মা কে সব বলছিলাম। মা বলছে উপায় নাই। মাও ভুল কিছু বলে নাই। আমি তখন প্রেগন্যান্ট। আমার মেয়ের জন্ম আমি কীভাবে দিয়েছি, খেয়ে না খেয়ে, আমি জানি। আল্লাহ জানে। উনারা সমাজের চোখে অতি ভদ্র। আমি জানি উনারা কী। যাই হোক, নিজে চাকরি করতাম। সেই টাকায় বাচ্চার আর আমার খরচ চালাতাম।একদিন মনে হলো আর কত?এভাবে চললে আমি পাগল হয়ে যাব। আমার মেয়েকে কে বড় করবে?

আমার ননদ ভালো ছিল। একদিন ওকে আমি সব খুলে বলি। ও আমাকে বাবার বাড়ি পালিয়ে যেতে বলে। আমি জানতাম ওখানে আমার জায়গা হবে না। মা বাবা ততদিনে উনাদেরকে খুব পছন্দ করতেন। করবেই না বা কেন? এত অভিনয় উনাদের সামনে। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে দুই রুম এর বাসা ভাড়া নেই। অফিশিয়ালি তালাক দেই। এগুলা করতে আমার যে কী পরিমাণ অপমান পদে পদে হতে হয়েছে আমি জানি। তাও মনে হতো আমাকে বাঁচতে হবে। আমি ছাড়া আমার মেয়েকে এরা ফকিরের বাচ্চার মতো (সরি ফর মাই ওয়ারডস) বড় করবে। অনেক ঝামেলার পর আমাদের তালাক হয়ে যায়।

দেনমোহরের টাকাও সে দেয়ার প্রয়োজন মনে করে নাই। আর আমার অবস্থা-ভিক্ষা চাই না, কুত্তা সামলাও। দেনমোহর লাগবে না। আমাকে আর আমার মেয়েকে রেহাই দাও। আমার বয়স ৩১। জীবনের বড় একটা সময় যুদ্ধ করতে করতে চলে গেছে। চার বছরের মেয়েকে আর্থিক এবং সবদিক দিয়ে সুখী জীবন দেয়ার চেষ্টা করেছি। মা সাহায্য করেন। নয়তোবা চাকরি করতাম কেমন করে?

আপু আমি শুধু এতটুকু জানতে চাই যে এইযে ঐ পক্ষ এখন আমার মেয়ের জন্য এত আহল্লাদ দেখায়, উনাদের দরদ উথলে উঠে সমাজের সামনে, এটা থেকে রেহাই পাবার কোনো উপায় আছে কি? আমি খুব ক্লান্ত আপু ।খুব সাধারণও। বিপদে পড়লে আমাকে সাহায্য করার মতো আমার মা ছাড়া আর কেউ-ই নাই। আমি আর কোনো ঝামেলায় যেতে চাই না। শুধু আমার মেয়েকে ভালো মানুষ হিসেবে বড় করতে চাই। নিজেকে খুব ছোটো লাগে আজকাল। আমাদের কে কি আমাদের মতো থাকতে দিবে না সমাজের এই অতি শিক্ষিত পরিবার?

উল্লেখ্য, বাচ্চাটার জন্মের সময় এতই অত্যাচার করতো আমি প্রায়ই ভাবতাম আমার মনে হয় এবনরমাল বাচ্চা হবে। প্রথম যেদিন আলট্রাসনো করলো আমি গাধার মতো ডাক্তার কে জিজ্ঞেস করেছিলাম-“আমার বাচ্চার হাত, পা সব ঠিক আছে?” অনেক কিছু লিখলাম। আগোছালো লেখা। আপনি বুঝে নিয়েন আপু।

আমি দেশের খুবই ভালো একটা পাবলিক ভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করেছি। আমার রেজাল্ট কীভাবে এতো ভালো হতো আমি জানিনা। মেয়েকে কোলে নিয়ে অংক করতাম মনে আছে। রাতের পর রাত ঘুমাতাম না। এখন আমি ক্লান্ত আপু। আমার বাচ্চাটা জীবনে আমি এরকম কিছু হতে দিবো না।

এরা প্রতি মাসে চারবার মেয়েকে নিয়ে যায়। আমার ভয় লাগে আমার মেয়েটার জন্য। অনেকের মনে হতে পারে এইটা আর এমন কি? এটা অনেক কিছু আপু। উপরে আল্লাহ,সেল্ফ রেস্পেকত, চাকরি,পুতুলের মতো এই বাচ্চা আর আমার মা ছাড়া আমার আর কেউ নাই, কিছুই নাই। কিছু লাগবেও না। আমাকে কেবল বলুন আমি কী করবো এখন?”

পরামর্শ:
আপু, প্রথমত বলি যে জীবনে একের পর এক আঘাত পেতে পেতে আপনি একেবারেই অস্থির হয়ে গিয়েছেন, তীব্র হতাশায় ভুগতে শুরু করেছেন, আপনার আতঙ্ক এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে যে আপনি স্বাভাবিক ভাবে কোন কিছু চিন্তাই করতে পারছেন না। এমনকি নিজের সফলতাও আপনার চোখে পড়ছে না। আপনি দিনরাত একটা আতঙ্কে ভুগছেন, যতটা খারাপ আপনি পরিস্থিতি ভাবছেন, ব্যাপারটা আসলে মোটেও ততটা খারাপ নয়। কিন্তু আপনি এতই মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছেন যে আর টিকে থাকার শক্তি পাচ্ছেন না।

আমি আপনার অবস্থাটা বুঝতে পারছি আপু। আর তাই, একজন তৃতীয় ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে আমি যা দেখতে পাচ্ছি কেবল সেটাই বলবো। কোন রকম মিথ্যা সান্তনা আমি দিবনা, কেবল যা সত্য সেটাই বলছি। যেখান থেকে আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনি মারাত্মক সাহসী একটি মেয়ে এবং দারুণ সফল। আপনি যা করে দেখিয়েছেন এমনটা আসলে এই সমাজের বেশিরভাগ মেয়ে পারে না। আপনি ধুঁকে ধুঁকে বেচে থাকার জীবন বেছে নেন নি। মাথা উঁচু করে বাঁচতে চেয়েছেন, নিজের মেয়েকে বাঁচাতে চেয়েছেন। এবং আপনি সেটা পেরেছেন। আপু রে, আপনার কোন ধারণাও নেই যে আপনি কী পরিমাণ সফল! যে মুক্তি আপনি অর্জন করেছেন, সেটা পাবার জন্য অনেক মেয়েই হা হুতাশ করে মরছে এই দেশের ঘরে ঘরে।

সেই আপনি যদি হতাশায় বলেন যে আপনার কেউ নেই, তাহলে কি মানায় বলুন তো। আপনি কত মানুষের জন্য আইডল, কত মেয়ে আজ আপনার কাহিনী পড়ে লড়াই করার সাহস পাবে আপনার সেটা ধারণাও নেই আপু। আর কে বলেছে যে আপনার কেউ নেই, কিচ্ছু নেই? আমি তো দেখতে পাচ্ছি আপনার সব আছে। ফুটফুটে একটা সন্তান, গর্ভধারিণী মা, সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মত একটা ভালো চাকরি, উচ্চ শিক্ষা, মেধা… কী নেই আপনার আপু? জীবনে এর চাইতে বেশি আর কী চাই? কেবল স্বামী থাকাটাই তো সব থাকা নয়।

আমি বুঝতে পারছি যে আপনি অনেক কিছু লেখেন নি। সেই পরিবারের মানুষকে যে আপনি তীব্র ভয় পান, সেটার পেছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কারণগুলো জানলে হয়তো পরামর্শ দেয়া সহজ হতো। সাথে আমি এটাও বুঝতে পারছি যে আইনি ঝামেলায় গিয়ে মেয়ের সাথে ওই পরিবারের দেখা করা রোধ করতে যে লড়াইটুকু করতে হবে, সেটা করার শক্তিটুকু আপনার আর নেই। তবুও আমি বলবো মনে সাহস সঞ্চয় করুন। একজন ভালো উকিলের দারস্থ হয়ে অন্তত কথা বলে দেখুন যে আসলেই আইনের মাধ্যমে কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। হয়তো কাজটায় অনেক ঝামেলা হবে। কিন্তু এতে চিরকালের মুক্তি সম্ভব।

আপনিও আরও একটা কাজ করতে পারেন আপু, যেটা আপনার ও আপনার মেয়ে দুজনের জন্যই ভালো হবে। সেটা হচ্ছে মেয়েটিকে নিয়ে আপনি চেষ্টা করে দেশের বাইরে চলে যান। আপনি উচ্চ শিক্ষিত, একটু চেষ্টা করলেই পারবেন। আপনার নিজেরই বয়স কম, এখনো পুরো জীবন পড়ে আছে। চিঠি পড়ে বুঝতে পারছি যে ওই পরিবারের সংস্পর্শে থাকলে আপনি শান্তিতে থাকতে পারবেন না। দেশের বাইরে গেলে আপনার মেয়েকে ওদের থেকে দূরে রাখতে তো পারবেনই, সেই সাথে নিজেও নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবেন। পৃথিবীর সব পুরুষ খারাপ না আপু। আর এই বাচ্চা মেয়েটিরও একজন পিতার ছায়া প্রয়োজন আছে। সর্বোপরি আপনার পাশে একজন শক্ত মনের পুরুষ থাকলে ওই পরিবারের যন্ত্রণা অনেকটাই কমে যাবে।

হাল ছাড়বেন না আপু, দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করুন একটা ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত। আপনার মেয়েটি অনেক ছোট, ওরা চাইলেও এখন মেয়ের ব্রেইন ওয়াশ করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ চেষ্টা করবে। এটাই খেয়াল রাখবেন যেন মেয়ের মাথায় আপনি সম্পর্কে কেউ বাজে কথা ভরতে না পারে। আরেকটা কথা লেখেন নি, সেই লোক আবার বিয়ে করেছে কিনা। যদি সে আবার বিয়ে করে, তাহলে বিয়ের কিছুদিন পরই আপনি মুক্তি পেয়ে যাবেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান হবার পর। কারণ একটি মেয়ে যত ভালোই ওকে না কেন আগের পক্ষের স্ত্রীর বাচ্চা নিয়ে আদিখ্যেতা পছন্দ করবে না। আর এতে লাভ হবে আপনারই।

যত যাই হোক, লোকটি আপনার মেয়ের জন্মদাতা পিতা। তাই পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়তো করতে পারবেন না। কিন্তু, নিজের ওপরে আস্থা রাখুন আপু। যে মানুষ এত ভয়ানক সব লড়াই জিততে পারে, তার কাছে এত সামান্য ব্যাপার সামাল দেয়া কোন বিষয় না। আরও বড় কথা, মেয়েকে মানুষ করছেন আপনি। মেয়ে নিজেই ভালোমন্দ বেশ বুঝে নিতে পারবে। কেউ আপনার মেয়ের কিচ্ছু করতে পারবে না।

আর হ্যাঁ, সম্ভব হলে আপনি একজন কাউন্সিলারের সাথে যোগাযোগ করবেন। একজন মানুষকে নিজের মনের হতাশা আর ভয়ের কথা বলতে পারলে মানসিকভাবে অনেক শান্তি পাবেন আপনি। সাহস ফেরত পাবেন। আর কাকে বলতে না পারলে আমাকেও বলতে পারেন। আমি সবসময় আছি শোনার জন্য।

অনেক দোয়া রইলো আপনাদের জন্য আপু।