মেইন ম্যেনু

কঙ্কাল ও খুলিতে ৪-৫ কাঠা জমি ভরে গিয়েছিল

গাজীপুরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছিল শক্ত অবস্থান। যুদ্ধকালীন জেলার বিভিন্নস্থানে পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। জেলার সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা চালায় গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়ি এলাকায়।

গাজীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রাক্তন ডেপুটি কমান্ডার মো. হাতেম আলী জানান, তখন গাজীপুরের ভাওয়াল রাজবাড়িতে ছিল দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অবস্থান। সে সময় ঢাকা নর্থের হেডকোয়ার্টার ছিল এটি। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ এ রেজিমেন্টের বাঙ্গালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে এলে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ চালায়। এর জেরে ২৬ ও ২৭ মার্চ রাতে বাঙ্গালি সৈন্যরা এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এ রেজিমেন্টের পাকিস্তানি সৈন্যদের পরিবারসহ হত্যা করে। আইয়ুর আলী নামে এক পাকিস্তানি সুবেদার এলএমজি নিয়ে রাজবাড়ির পাশে পানির ট্যাংকির উপরে অবস্থান নেয়। ২৮ মার্চ এ রেজিমেন্ট দখলে নিতে পাকিস্তানিরা হেলিকপ্টার ও বিমান থেকে রাজবাড়িতে গুলি বর্ষণ এবং বোমা ফেলে। তারা আইয়ুব আলীকে হেলিকপ্টর দিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। বোমা বর্ষণে মুক্তিযোদ্ধা এবং বাঙ্গালি সৈন্যরা পালিয়ে গেলে পাকিস্তানি সৈন্যরা ২৯ মার্চ রাজবাড়ি দখলে নেয়। এ দিন তারা জয়দেবপুর বাজারে দোকানপাট ও আশপাশ এলাকার বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

তিনি জানান, পাকিস্তান আমলে ইন্টারমিডিয়েট পাস করা পূর্ব পাকিস্তানের ছেলেদের নিয়ে ন্যাশনাল ট্রেনিং কোর শুরু হয়েছিল। তাদের অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। ন্যাশনাল কোরের ছেলেরা বের হয়ে মুক্তিযোদ্ধে যোগ দেবে এমন আশঙ্কায় পাকিস্তানিরা যার যার এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে পরিকল্পিতভাবে তাদের ঢাকা থেকে এই রাজবাড়িতে নিয়ে আসে। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এলাকার ন্যাশনাল কোরের প্রায় একশ ছেলেকে তারা এখানে এনে বন্দি করে রাখে। পাকিস্থানি সৈন্যরা গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ধরে রাজবাড়িতে নিয়ে আসত। জয়দেবপুর ও আশপাশের এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে তারা এখানে আটকে রাখত। এখানে পাকিস্তানিরা ৯ এপ্রিল গণহত্যা চালায়। জড়ো করা ন্যাশনাল কোর বাহিনীর সদস্যসহ আনুমানিক ৩০০ মানুষকে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই এখানে পাকিস্তানি সেনারা এখানে মানুষ হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এখানে কত মানুষ হত্যা করা হয় তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

স্বাধীনতার পর ভাওয়াল রাজবাড়ি সংলগ্ন পুকুর ও ডোবা থেকে অসংখ্য মানুষের মাথার খুলি, কঙ্কাল, হাড় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা কঙ্কাল, খুলি, হাড় রাখা হয়েছিল পাশের মাঠে। প্রায় ৪-৫ কাঠা জমি ভরে গিয়েছিল।

তিনি আরো জানান, গণহত্যার স্থানটিতে স্মৃতিস্তম্ভ করার জন্য জেলার মুক্তিযোদ্ধোদের পক্ষ থেকে বহুবার দাবি জানানো হয়েছে। ৫-৭ বছর আগে জমি নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। আমিও ওই কমিটির একজন সদস্য ছিলাম। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত এ কাজের অগ্রগতি হয়নি। এ জমিটি ভাওয়াল এস্টেটের সম্পতি। লিজ নিয়ে কিছু লোক এখানে মার্কেট করে রেখেছে।

মুক্তিযোদ্ধা মুহা: নরুল ইসলাম জানান, স্বাধীনতার পর এখান থেকে অনেক কঙ্কাল, হাড়, নারীদের চুল পাওয়া গেছে। জেলার মধ্যে এখানে সব চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। এই জমি কিছু সুবিধাভোগী লোক দখল করে রেখেছে। এটা মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় এই জায়গাটি চিহ্নিত করলে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।

যে পুকুর থেকে কঙ্কাল, হাড় খুলি উদ্ধার করা হয়েছিল সে পুকুর পাড়ের টং দোকানী গিয়াস উদ্দিন (২৫) বলেন, ‘আমার বাড়ি চাঁদপুরের মতলব থানা এলাকায়। আমি প্রায় ১০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। ভাওয়াল রাজবাড়ির গণহত্যা ও এ পুকুর থেকে কঙ্কাল, হাড় খুলি উদ্ধার সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’