মেইন ম্যেনু

কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছি এটা কি আমার অপরাধ?

‘কন্যা মানেই বোঝা নয়-করবে তারা বিশ্ব জয়’ ‘নারী নির্যাতন আর নয়’ ‘মানবতার উন্নয়ন-নারীর ক্ষমতায়ন’ সহ নানা শ্লোগানে যখন দেশে কন্যা দিবস-আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে ঠিক সেই নারী দিবসেই (৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস) কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ায় এক কলেজ ছাত্রীকে নিমর্ম নির্যাতন করা হয়েছে। স্বামীর হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার আয়েশা খাতুন সাথী (২৪) কামারখন্দ উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। লোকলজ্জার ভয়ে থানায় মামলাও করতে পারছে না। আয়েশা খাতুন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের সদানন্দপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আমিনুলের ইসলামের মেয়ে ও বেলকুচি উপজেলার নাগগাতী গ্রামের হাজী নুর হোসেন মন্ডলের ছেলে তাঁত ব্যবসায়ী আলহাজ আলী ওরফে আবু সামার স্ত্রী।

হাসপাতালে কাতরাতে কাতরাতে নির্যাতনের শিকার কলেজ ছাত্রী আয়েশা খাতুন সাথী জানান, ২০১৩ সালের ৮মে ডিগ্রী প্রথম বর্ষ পরীক্ষা শেষ হবার পর বাবা-মা পছন্দ অনুযায়ী সিঙ্গাপুর ফেরত আলহাজ আলী ওরফে আবু সামার সাথে দুই ভরি গহনা এবং দেড় লক্ষ টাকা কাবিন মুলে বিয়ে হয়। ছেলে বিদেশ ফেরত এবং দেশে তাঁতের ব্যবসা সব মিলিয়ে বাবা-মাসহ সকলেই খুশী ছিল। কিন্তু ৫ মাস পর স্বামীর নিষ্ঠুর চেহারা ফুটে। প্রথমে যৌতুকের জন্য নির্যাতন শুরু করে। প্রতিরাতে মারপিট করত। এ অবস্থায় গর্ভে সন্তান আসে। পরীক্ষা করে দেখা যায় কন্যা সন্তান। শুরু নির্মম নির্যাতন। সন্তান নষ্ট করার জন্য প্রতিরাতে মারপিট করত। সিগারেট দিয়ে ছ্যাকা দেয়।

কান্নাজড়িত কন্ঠে আয়েশা জানান, বাচ্চা নষ্ট করতে এক পর্যায়ে নিষ্ঠুর স্বামী যৌনাক্ত টিভির রিমোট পর্যন্ত ঢুকিয়ে দিয়েছিল। এতো নিষ্ঠুর নির্যাতনের পরও সন্তান নষ্ট করিনি। ভেবেছিলাম সন্তানের মুখ দেখে পাল্টে যাবে। কিন্তু কন্যা সন্তান জন্ম নেবার পর আরো নির্যাতন বেড়ে যায়। আমাকে এবং সন্তানের কাপড়-ওষুধ কেনার কোন খরচ দেয় না। চাইলে ফকির মেয়ে বলে নানা ধরনের কটুক্তি ও অত্যাচার-নির্যাতন করত। এ জন্য বাবা-মা প্রতি সপ্তাহে খরচের টাকা দিয়ে আসত। তবুও লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতন সহ্য করে চলেছি। প্রায় ছয়মাস আগে শিশু কন্যা তানিশাকে নিষ্ঠুর বাবা বালিশ চাপা দিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু আমার ননদ শিশুটিকে রক্ষা করে। ইচ্ছে ছিল শত নির্যাতন সহ্য করে ডিগ্রী পরীক্ষা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। কিন্তু কলেজে ভর্তি হলে তাকে লেখাপড়া করতে নিষেধ করেন। পড়াশোনা ইচ্ছা থাকায় তিনি হাল তবুও হাল ছাড়েনি। এ অবস্থায় গত ৮ মার্চ সকালে মেয়ের জন্য কিছু টাকা চাইলে কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার কারণে তাকে আবার নির্যাতন করে। একই সঙ্গে দেড় লক্ষ টাকা যৌতুক ও পড়াশোনা বন্ধ করার চাপ দেয়। টাকা দিতে অস্বীকার করলে লাঠি দিয়ে বেদম পেটাতে থাকে। প্রতিবেশীর ফোন পেয়ে বাবা আমার কাছে আসলে বাবার সামনেও মারপিট করে। পরে বাবা আমাকে উদ্ধার করে কামারখন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। হাসপাতালে চিকিৎসা থাকাবস্থায় একবারও স্বামী বা তার পরিবারের কেউ খোঁজ নেয়নি। স্বামীর কথা-তুই কেন মেয়ে সন্তান জন্ম দিলি? আয়েশার প্রশ্ন? কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছি এটা কি শুধু আমার অপরাধ?

আয়েশার মা জিয়াসিমিন খাতুন জানান, ভাল ছেলে ভেবে মেয়েকে সুখের জন্য বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পর থেকে নানা কারণেই নির্যাতন শুরু করে। গর্ভবতী অবস্থায় অনেকবার সন্তান নষ্ট করতে চেয়েছিল। শিশু মেয়েটিসহ আয়েশা হত্যা করতে অনেক নির্যাতন করেছে। এ অবস্থায় কি করা উচিত আমার ভেবে পাচ্ছি না।

আয়েশার মামা সোনালী ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার মাহবুব-উল- আলম বলেন, আয়েশাকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বা হচ্ছে এটি কোন সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। নারী সংগঠন ও সমাজের সচেতন ব্যক্তিদের আয়েশার পাশে দাড়ানোর অনুরোধ জানান সাবেক এ ব্যাংক কর্মকর্তা।

হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জোতদার রাকিবুল হাসান জানান, ইনজুরি নেই তবে কৌশলে বেদম প্রহার করা হয়েছে। তবে বর্তমান অবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে।