মেইন ম্যেনু

কলকাতার নায়িকাদের লইয়া এত মাতামাতি ও আদিখ্যেতা দেখাইবার কি প্রয়োজন?

ডিলান হাসান : বহুদিন ধরিয়াই আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পখানি লাটে উঠিয়াছে। কম-বেশি সিনেমা নির্মিত হইলেও কোনোটিই দর্শক মজাইয়া ব্যবসা করিতে পারিতেছে না। বহু প্রযোজক লাভের আশায় আসিয়া একটি সিনেমা বানাইয়া ফতুর হইবার পূর্বেই দ্রুত সরিয়া পড়িয়াছেন। আবার অনেকেই ঝুঁকি লইয়া বিনিয়োগ করিতে আসেন। এইভাবে অর্থের যোগানদাতারা আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়াই চলিয়াছেন। ইহাতে চলচ্চিত্র জগতের কিঞ্চিত উন্নতি সাধিত হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে না। দিন দিন নিম্ন থেকে নিম্নতর দিকে গমন করিয়া চলিয়াছে। চলচ্চিত্রের কেন এই দুর্দশা তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা যাইতে পারে। একেকজন জ্ঞানের ঢালি সাজাইয়া কাশি দিয়া গলা পরিষ্কার করিয়া বিজ্ঞের মতো অনেক কথাই বলিতে পারিবেন। শুনিতে আরাম বোধ হইলেও, এইসব কথা যে ক্রেন হইয়াও অধঃপতিত চলচ্চিত্র শিল্পকে টানিয়ে তুলিতে পারিবে না, তা বোধকরি একজন সাধারণ মানুষও জানে। ইহা আমার আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আমার বোধ হইতেছে, চলচ্চিত্রের এই ঘোলা সময়ে কেহ কেহ ভিন্ন কোনো উদ্দেশে মৎস্য শিকার করিতে নামিয়াছেন। বলিতে চাহিতেছি, যৌথ প্রযোজনার কথা। পৃথিবীর চলচ্চিত্রে ইতিহাসে কখনোই দেখা যায় নাই, কোনো পতন্মুখ চলচ্চিত্র শিল্প যৌথ প্রযোজনার সিনেমা দিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে। মন্দ অবস্থা হইতে চলচ্চিত্র ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে শুধু মাত্র নিজেদের প্রচেষ্টায় এবং নিজেদের সিনেমা দিয়া। আমাদের চলচ্চিত্রের এই মন্দাবস্থা নতুন নহে। বহুবার মন্দাবস্থায় পড়িয়াছে। আবার ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে। এইবারের মন্দাবস্থাটা যেন কিছুতেই কাটিতেছে না। চারিদিকে কেবল হতাশা আর হতাশা। এরই মাঝে যেন আলোক বর্তিকা হাতে কেহ কেহ চলচ্চিত্রকে উদ্ধার করিতে আসিয়াছেন। মনে হইবে উহাদের উদ্দেশ্য অতি মহৎ। তবে যারা একটু বুঝিয়া-শুনিয়া স্থির হইয়া চিন্তা করিয়া থাকেন, তারা বিলক্ষণ দেখিতে পাইবেন উহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মোটেই চলচ্চিত্রের মঙ্গলের জন্য নয়। শনির দশা লাগাইবার জন্য আসিয়াছেন। যৌথ প্রযোজনার নামে উহারা শনি লইয়া খেলিয়া চলিয়াছেন। কলকাতার সিনেমাকে আমাদের চলচ্চিত্রের শূন্যস্থানে বসাইয়া দেয়ার একটা সূ² পরিকল্পনা লইয়া আগাইয়া চলিয়াছেন। এই যৌথ প্রযোজনার সূত্র ধরিয়া ইদানীং কলকাতার নায়ক-নায়িকাদের বাংলাদেশে আগমন ও নির্গমন এন্তার বৃদ্ধি পাইয়াছে। আমাদের দেশে আগেও যৌথ প্রযোজনার সিনেমা নির্মিত হইয়াছে এবং সেগুলো ব্যবসা সফলও হইয়াছিল। তবে সেগুলো এমন সময় নির্মিত হইয়াছিল যখন আমাদের চলচ্চিত্রের অবস্থান অতীব শক্ত ভিতের উপর দÐায়মান ছিল। ফলে সেসব সিনেমা আমাদের দেশেই বেশি ব্যবসা করিয়া নির্মাতাদের লাভবান করিয়াছে। তখন দেখা যাইত কলকাতার সিনেমার খুবই করুণ দশা। সেখানের নায়ক-নায়িকারা বাংলাদেশের সিনেমায় অভিনয় করার জন্য পাগল ও উদগ্রীব হইয়া থাকিতেন। এর অন্যতম কারণ হইয়াছিল এই, বাংলাদেশের তারকা শিল্পীরা সিনেমা প্রতি যে পারিশ্রমিক পাইতেন উহা দেখিয়া তাহাদের চক্ষু কপালে উঠিয়া গিয়াছিল। তাহারা ভাবিতেই পারিত না বাংলাদেশের নায়ক-নায়িকারা এত পারিশ্রমিক পাইতে পারে! হা করিয়া ভাবিতেন এক সিনেমাতেই এত পারিশ্রমিক পাওয়া যায়! ইহা কী করিয়া সম্ভব দাদা! তখন বাংলাদেশ হইয়া উঠিল উহাদের প্রতিষ্ঠিত হইবার আরেকটি ঠিকানা। উহারা ঝাঁকেঝাঁকে বাংলাদেশে আসিতে লাগিলেন। সবাই নাম করিতে না পারিলেও কেহ কেহ নাম করিয়াছিলেন। ঋতুপর্ণা, সুনেত্রা, শতাব্দী রায়, সন্ধ্যা রায়, রিয়া সেনসহ এমন আরও অনেক কলকাতার নায়িকা। সুনেত্রা তো বাংলাদেশে বিবাহ-সাদী করিয়া একপ্রকার থিতুই হইয়া গিয়াছিলেন। বেশ নামও করিয়াছিলেন। যাহাই হোক, এসবই ইতিহাস। আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালী দিনের দিনলিপি। এসব নিয়া আলাপ শেষ হইবে না। এখন আমাদের চলচ্চিত্রে মহাদুর্দিনে যৌথ প্রযোজনার নামে সিনেমা নির্মাণের যেন জোয়ার নামিয়াছে। কলকাতার নায়ক-নায়িকাদের লইয়াও মাতামাতি অতিমাত্রায় শুরু হইয়াছে। পত্র-পত্রিকায়ও এমনভাবে উহাদের লইয়া লেখালেখি হইতেছে যাহা দেখিয়া বাংলাদেশের নায়ক-নায়িকাদের প্রতি মায়া না জন্মাইয়া পারে না। উহারা হয়তো নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া বলেন, কী আর করা! কলকাতার নায়ক-নায়িকাদের লইয়া আমাদের কিছু সাংবাদিকের এই অতি আহলাদিত হইয়া পড়া দেখিয়া বিচলিত না হইয়া পারা যায় না। কলকাতার নায়ক-নায়িকাদের সাক্ষাৎকার লইবার জন্য উহাদের মধ্যে বিস্তর প্রতিযোগিতা লাগিয়া যায়। কে কার আগে নায়ক-নায়িকাদের হোটেল কক্ষে গিয়া পৌঁছাইবেন, তাহা লইয়া পেরেশানিতে পড়িয়া যান। এমনকি সেল্ফি তুলিয়া ফেসবুকে পোস্ট করিয়া এমনভাব দেখান যেন ধন্য হইয়া গিয়াছেন। উহাদের এই অতি উৎসাহ দেখিয়া আফসোস করা ছাড়া কিছু করিবার আছে বলিয়া মনে হয় না। অবশ্য উহাদের দোষ দিয়া লাভ নাই। বোধ হইতেছে উহারা জানে না, কলকাতায় বাংলাদেশের শিল্পীদের সহিত উহাদের মিডিয়া কিরূপ আচরণ করিয়া থাকে। উহাদের পত্র-পত্রিকায় বাংলাদেশের শিল্পীদের বড় করিয়া সাক্ষাৎকার ছাপা দূরে থাক, নামখানি পর্যন্ত ঠিক মতো লিখেতে কুণ্ঠাবোধ করিয়া থাকে। বিকৃত করিয়া লিখিয়া থাকে। এইসবের শিকার হইয়াছেন আমাদের নায়করাজ রাজ্জাক, সমী কায়সারসহ অন্যান্য প্রখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। বাংলাদেশের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কলকাতায় কাজ করিতে গেলে সেখানের সাংবাদিকরা হুমড়ি খাইয়া পড়ে না বা সাক্ষাৎকার লইবার জন্য ছুটাছুটি করে না। উহারা এমন একটা ভাব দেখাইয়া থাকে, কেহে তুমি, কোথা থেকে উদয় হইয়াছ! যখন পরিচয় জানিতে পারে এবং সেখানের প্রযোজক-পরিচালকরা অনুরোধ করেন উহাদের নিয়া একটু লেখালেখি করিতে, তখন অনেকটা যেন দয়াপরবশ হইয়া সিঙ্গেল কলামে ছোট্ট করিয়া একখানি সংবাদ ছাপিয়া ধন্য করিয়া দেয়। ভাবখানা এমন দিয়াছিতো! আর কত দিব! সাম্প্রতিক সময়ে যৌথ প্রযোজনার সিনেমাগুলোর মুক্তি পাওয়ার ইতিহাস দেখিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হইয়া যাইবে। কলকাতায় যে সিনেমাগুলো মুক্তি পাইয়াছে উহাদের পোস্টারে বাংলাদেশের শিল্পীদের এমনভাবে ঠাঁই হইয়াছে যে, উহাদের খুঁজিয়া পাইতে মাইক্রোস্কোপ লাগাইতে হইবে। আমি নিজ চক্ষে কলকাতা গিয়া দেখিয়া আসিয়াছি। যাহা হউক, এইবারের ঈদে যৌথ প্রযোজনার একটি সিনেমা মুক্তি পাইবে। সিনেমাটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কলকাতার নায়িকাকে প্রচারণার কাজে অতি খাতির করিয়া লইয়া আসিয়াছেন। উক্ত নায়িকাটিকে লইয়া পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন মিডিয়া ইতোমধ্যে বেশ মাতামাতি শুরু করিয়াছে। সাক্ষাৎকার ছাপা এবং এবারের ঈদে বিভিন্ন চ্যানেলে উহাকে লইয়া সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠানও রেকর্ড করা হইয়াছে। বলা হইতেছে, সিনেমার প্রচারের কাজে উহাকে এখানে আনা হইয়াছে। অথচ এই সিনেমায় নায়ক হিসেবে বাংলাদেশের শাকিব রহিয়াছেন। লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে, বাংলাদেশের প্রযোজক কলকাতার নায়িকাকে লইয়া যেভাবে আহলাদে আটখানা হইয়া উঠিয়াছেন, কলকাতার প্রযোজক শাকিবকে লইয়া কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাইতেছে না। কই, আমরা তো দেখিতেছি না, কলকাতায় সিনেমাটির প্রচারের জন্য শাকিবকে সেখানের প্রযোজক লইয়া যাইতে ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছেন? তাহা হইলে আমাদের প্রযোজক কেন কলকাতার নায়িকাকে লাখ টাকা খরচ ও খাতিরযতœ করিয়া বাংলাদেশে আনিয়াছেন? সিনেমাটি তো তাহার একার প্রযোজনা নহে, কলকাতার প্রযোজকও রহিয়াছেন। কাজেই কলকাতার প্রযোজক যাহা প্রয়োজন মনে করিতেছেন না, ঢাকার প্রযোজক কেন তাহা করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন? বলা বাহুল্য হইবে, বোধকরি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সর্বনাশ করিতে ও শনির দশা লাগাইতে যেন জানিয়া-বুঝিয়াই এই শ্রেণীর প্রযোজক উতলা হইয়া উঠিয়াছেন। ইহাতে তাহার বা তাহাদের কী লাভ একমাত্র তাহারাই বলিতে পারিবে। তবে দেশীয় চলচ্চিত্র সম্পর্কে যাহারা সামান্য জ্ঞান ঘটে রাখিয়া দিয়াছেন, উহারা ভাল করিয়াই জানেন, ইহাতে দেশীয় চলচ্চিত্রকে অধিক ধ্বংসের দিকে ঠেলিয়া দেয়া ছাড়া তিল পরিমাণ লাভ হইবে না। যৌথ প্রযোজনার নামে এই ধরনের একপক্ষীয় সিনেমা নির্মাণ যদি চলিতে থাকে, তবে চলচ্চিত্রের মানুষদের মনে রাখিতে হইবে, এখনও দেশীয় যাহা টিকিয়া আছে, উহাও অচিরেই শেষ হইয়া যাইবে এবং উহাদের সিনেমা নির্মাণের সাধ ছাড়িয়া দিয়া চলিয়া যাইতে হইবে। এ কথা তো তাহারা নিজেরাই বলিয়াছে, যৌথ প্রযোজনার নামে বাংলাদেশে ভারতীয় সিনেমার বাজার তৈরি করার ষড়যন্ত্র চলিতেছে। এজন্য তাহারা কাফনের কাপড় মাথায় বাঁধিয়া মিছিল-মিটিংও করিয়াছিল। এই আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হইতে দেখিয়াও কি তাহারা চুপ করিয়া থাকিবে? যৌথ প্রযোজনার নামে দুই বাংলায় আমাদের সিনেমার ব্যবসা প্রসার হইবে-এই মনোলোভা কথায় যদি তাহারা আকর্ষিত হইয়া বুঁদ হইয়া থাকেন, তবে ইহার চাইতে বোকার স্বর্গে বসবাস করিবার উত্তম উদাহরণ আর কিছুই হইতে পারে না। তাহাদের বুঝিতে হইবে নিজেদের চলচ্চিত্রের ভিত শক্ত না হইলে তাহা কোথাও দাঁড়াইতে পারিবে না। কাজেই সময় থাকিতে শনির দশা লাগাইবার এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে চলচ্চিত্রের লোকজনকে সতর্ক হইতে হইবে। যৌথ প্রযোজনার নামে ভারতীয় সিনেমা এবং তাহাদের শিল্পীদের এদেশে বাজার সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে থামাইতে হইবে। তাহাদের এই কথাও মনে রাখিতে হইবে, কলকাতার একজন শিল্পীর প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করার অর্থ হইল, নিজ দেশের একজন শিল্পীকে বঞ্চিত করিয়া ভিনদেশিকে জায়গা করিয়া দেয়া। কলকাতার মিডিয়া তাহা বুঝে বলিয়াই তাহারা বাংলাদেশের শিল্পীদের লইয়া মাতামাতি করে না, এমনকি ঠিক মতো যাহাতে চিনিতে না পারে, এজন্য নামখানিও ঠিক করিয়া লিখে না। বিকৃত করিয়া প্রকাশ করে।-ইনকিলাব