মেইন ম্যেনু

চলছে ‘হালখাতা’র মৌসুম...

কলাগাছ, দেবদারুর পাতা, মাইক বাজানো, জড়ি-রঙিন কাগজের বাহারি ঢং বিলুপ্তির পথে

আরিফ মাহমুদ : চলছে ‘হালখাতা’র মৌসুম। কলাগাছে দেবদারুর পাতা জড়িয়ে, মাইক বাজিয়ে, জড়ি ও রঙিন কাগজে সাজিয়ে এবং অন্যান্য উপায়ে হালখাতার প্রচলন নেই বললেই চলে অথবা হামাগুড়ি দিয়ে চলছে, কিংবা সেটা বিলুপ্তির পথে।

বাকী পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ করছেন। পাওনা আদায়ের পাশাপাশি ক্রেতাদের আপ্যায়নও করা হচ্ছে। গ্রাম্যঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলের বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বকেয়া-বাকী পরিশোধের প্রত্যয়ে ব্যবসায়ীরা হালখাতা করছেন পুরোদমে।
বাংলা সন হিসেবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সাধারণত হালখাতা করার প্রচলন দেখা যায়। বছরে একবার হালখাতা করতে দেখা গেলেও অনেক ব্যবসায়ীরা শীত মৌসুমেও দ্বিতীয় দফাও হালখাতা করে থাকেন।

বিগত বছর গুলোর চেয়ে বর্তমানে ‘হালখাতা’র জৌলুশ অনেকটা হ্রাস পাচ্ছে বলে ধারণা করাই যেতে পারে। বকেয়ার পুরোটাই যেমন পরিশোধিত হচ্ছে না তেমনি পুরো বছরের বাকীও একেবারে পরিশোধ না করে অনেক ক্রেতারা মাসে মাসেও বাকীর খাতায় কিছু টাকা জমা করে থাকেন। ফলে বছরে ‘একবার’ ‘এক বা দুই/তিন দিনের’ ‘হালখাতা’র জৌলুশ অনেকটা হ্রাস পাচ্ছে।

তবে গ্রাম্যঞ্চলে কলাগাছে দেবদারুর পাতা জড়িয়ে, মাইক বাজিয়ে, জড়ি ও রঙিন কাগজে সাজিয়ে এবং অন্যান্য উপায়ে হালখাতার প্রচলন এখনো চলছে।

মূলত: নতুন বর্ষকে বরণ করে নেয়া এবং পুরনো হিসেব নিকেশ চুকিয়ে নতুন হিসাব খোলার জন্য ব্যবসায়ীদের অন্যতম একটি বিষয় হচ্ছে হালখাতা। কিন্তু ডিজিটাল যুগের ছোঁয়ায় সেই হালখাতার প্রচলন আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হাতে লেখা খাতা থেকে অনেককে নিষ্কৃতি দিয়েছে। কয়েক বছর আগেও আড়ত ও খুচরা এবং পাইকারী দোকানগুলোতে হালখাতার যে জাঁকজমক অনুষ্ঠান দেখা যেতো, তা এখন তেমনটা চোখে পড়ে না। আগে ব্যবসায়ীরা মুখের কথায় বিশ্বাস করে লাখ লাখ টাকা বাকি দিতেন। তার বেশিরভাগই উসুল হতো হালখাতার দিনে। এখন লেনদেনটা অনেকে ব্যাংকের মাধ্যমে চুকিয়ে নেন। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পাল্টে গেছে আয়োজনের ধরণও। সেই দিন আর নেই। নেই সেই জাঁকজমক হালখাতা উৎসবও।

অথচ সর্বজনীন উৎসব হিসেবে ‘হালখাতা’ ছিল বাংলা নববর্ষে প্রাণ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সনাতন হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো।

ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। আর এর সাথে সম্রাট আকবরের প্রচেষ্টায় শুরু হয় বাংলা সনের প্রথম দিনে খাজনা আদায় এবং দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়াও। মোগল আমল থেকেই পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন। পয়লা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টিমুখ করানোর পাশাপাশি আনন্দ উৎসব করতেন বলে জানা যায়।

আর বর্তমানে চির চেনা লাল কাপড় বা কাগজে মোড়ানো হিসাবের ‘হাতে লেখা’ খাতার ব্যবহারও হ্রাস পেতে শুরু করছে। দোকানে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার বা মোবাইলের মাধ্যমে পণ্য বেচাকেনার হিসাব রাখা হচ্ছে। ‘হালখাতা’র রেওয়াজটা-ই আজ ‘শুভ হালখাতা’য় অনেকটা পরিণত হচ্ছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন।