মেইন ম্যেনু

কলারোয়া পৌর নির্বাচন: দলীয় প্রতীক আর ব্যক্তি ইমেজে বন্দি ভোটাররা

মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থীরা গাছে ঝুলতে থাকার পর এবার মানুষের দ্বারেও পৌছে যাচ্ছেন। হ্যা, এতোদিন প্রার্থীদের ডিজিটাল ব্যানার-প্লাকার্ড-সাইনবোর্ড ইত্যাদি গাছে ঝুলতে দেখা গেলেও সশরীরে তারা এবার নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন জোর কদমে।

পৌরসভা নির্বাচনের তফশিল ঘোষনা না হলেও ইতোমধ্যে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভা নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কলারোয়া পৌরসভার ২য় নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। নির্ঘুম রাত কাটাতে শুরু না করলেও ক্লান্তিহীন ইমেজে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছুটে যাচ্ছেন বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায়।

আ.লীগের হাফ ডজন, বিএনপির দু’জন ও জাতীয় পার্টির একজন নেতা সম্ভাব্য মেয়র পদের প্রার্থী তালিকায় দৌরঝাপ শুরু করছেন।
তবে ‘সরাসরি’ দলীয় মনোনয়নে প্রার্থী নির্ধারণে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে কলারোয়া পৌরসভার সাধারণ ভোটারদের মাঝে। সকলেরই কৌতুহল- ‘কে’ হচ্ছেন নৌকার মাঝি বা ধানের শীষের বাহক? কেননা নির্বাচনে ‘দলীয় প্রতীক’ যে বড় ফ্যাক্টর সেটা প্রায় সকলেই স্বীকার করে থাকেন।
কলারোয়া পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডের ১৮হাজার ৫১০জন ভোটারের মধ্যে সিংহভাগই কোন না কোন দলকে সমর্থন করে। মূলত: আওয়ামীলীগ ও বিএনপির মধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের মূল লড়াই হবে বলে অনেকে মনে করছেন।

১৯৯০ সালে কলারোয়া পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন মামলা জটিলতায় নির্বাচন সম্ভব হয়নি। গত পৌরসভা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো কলারোয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন উপজেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও তৎকালীন উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি গাজী আক্তারুল ইসলাম। বয়সে তরুণ আক্তারুল ইসলাম কয়েক মাস আগে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত হয়ে বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে অন্তরীণ।

এবারের আসন্ন নির্বাচনে ইতোমধ্যে মেয়র পদে সম্ভাব্য যেসকল প্রার্থী নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন তারা হলেন- উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু, জেলা আ.লীগ নেতা ও কলারোয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আরাফাত হোসেন, উপজেলা আ.লীগের সাবেক আহবায়ক সাজেদুর রহমান খাঁন চৌধুরী মজনু, পৌর আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, উপজেলা আ.লীগের অর্থ সম্পাদক ও গত নির্বাচনে আ.লীগ দলীয় সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আলহাজ্ব শেখ আমজাদ হোসেন, আ.লীগ নেতা ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও গত নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শেখ শরীফুজ্জামান তুহিন, সাময়িক বরখাস্ত মেয়র উপজেলা বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক গাজী আক্তারুল ইসলাম এবং উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি এম মুনছুর আলী।

এই ৯জন প্রার্থীর মধ্যে মূলত আ.লীগ ও বিএনপির প্রার্থীর মধ্যেই মূল লড়াই হতে পারে। তবে সংশয়, আশংকা ও চ্যালেঞ্জ নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে কিনা সেটা নিয়ে।
অনেক ভোটাররা জানান, নির্বাচন নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও অবাধ হওয়াটাই মূল চ্যালেঞ্জ। যদি নিরপেক্ষতা নিশ্চিত ও বাস্তবায়ন সম্ভব হয় তবে কলারোয়া পৌর নির্বাচনের হিসাব নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ‘কে’ পাবেন নৌকা বা ধানের শীষের টিকিট সেটার উপরই অনেকটা নির্ভর করবে হার-জিতের।

দলীয় সূত্র জানায়, আ.লীগের প্রার্থী মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে আছেন আমিনুল ইসলাম লাল্টু, সাজেদুর রহমান খাঁন চৌধুরী মজনু, আরাফাত হোসেন ও শেখ আমজাদ হোসেন।
বিগত কয়েক মাস আগে একটি অনুষ্ঠানে পৌর মেয়র পদে মজনু চৌধুরীকে দল সমর্থিত প্রার্থী ঘোষনা করা হয়। তবে সেটা নাকচ করে দিয়ে সম্প্রতি দলের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লাল্টু নিজেও প্রার্থী হিসেবে জোরেসোরে ব্যাপক জনসংযোগে নেমে পড়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘দল মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করবেন।’ অপরদিকে, আরাফাত হোসেন দীর্ঘ কয়েক বছর নিয়মিত জনসংযোগ করে আসছেন। মজনু চৌধুরীও নির্বাচনে লড়তে গত বছর থেকে কার্যক্রম শুরু করেছেন। বসে নেই শেখ আমজাদ হোসেন ও শহীদুল ইসলাম। তবে ঢিলেঢালা জনসংযোগ করছেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র রফিকুল ইসলাম।
এদিকে, দলীয় প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে দলের মধ্যে চাপা কোন্দল ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে আ.লীগ কর্মী-সমর্থকদের মাঝে। পরোক্ষ কোন্দলে গ্রুপিং যেমন প্রতিয়মান তেমনি শেষমেশ ‘কে’ কখন ‘কার’ সেটাও বলা মুশকিল। ফলে দলীয় প্রার্থীতা নিয়ে জটিলতা ও চরম নাটকীয়তা হলে সেটা আশ্চর্যের কিছু হবে না -এমনটাই জানালেন মাঠ পর্যায়ের দলীয় একাধিক সমর্থক।

কোন্দলের শেষ নেই বিএনপিতেও। মামলায় আটক কারাগারে অন্তরীণ বর্তমানে সাময়িক বরখাস্তকৃত মেয়র বিএনপি নেতা গাজী আক্তারুল ইসলামও নির্বাচনে লড়বেন বলে তার স্বজনরা জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে তার পক্ষে পোস্টারও শোভা পাচ্ছে সবখানে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার জয়-পরাজয়ের চেয়ে নির্বাচনে লড়াটাই মূখ্য বিবেচ্য বলে সূত্র জানায়। আক্তারুলের ব্যক্তি ইমেজ ও দলের নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভের বহি:প্রকাশে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েও তিনি বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন। তবে মেয়রের দায়িত্বকালীন অনেক কর্মকান্ডে তার প্রতি নাখোশও আছেন অনেক সমর্থকরাও। অপর বিএনপি দলীয় শেখ শরীফুজ্জামান তুহিনও ইতোমধ্যে ‘শান্তভাবে’ নির্বাচনী গণসংযোগ করেছেন। দলের মনোনয়ন তিনি পুণরায় পাবেন বলে আশাবাদী। গত নির্বাচনে দলের আভ্যন্তরিণ কোন্দল, ক্ষোভ-বিদ্বেশ ও প্রার্থীর অহমিকায় তিনি পরাজিত হন বলে বিএনপি সমর্থকরা জানান।

জাতীয় পার্টির একমাত্র প্রার্থী এম মুনছুর আলী ঢিলেতালে এগুচ্ছেন। মহাজোটগত ভাবে মনোনয়ন পেলে তিনি নির্বাচন করবেন বলে জানান।

নিবন্ধন বাতিল ও রাজনৈতিক মহাচাপে আটক কিংবা আত্মগোপনে থাকায় জামায়াতের কোন প্রার্থীকে এখনো পর্যন্ত মাঠে দেখা যায়নি। তবে সাধারণ জামায়াত সমর্থকদের ভোট পৌর নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

পৌরসভার সাধারণ ভোটারা মনে করছেন- দলীয় প্রতীকের গুরুত্বের পাশাপাশি এবারের নির্বাচনে আ.লীগের আরাফাত হোসেন কিংবা আমিনুল ইসলাম লাল্টু ও বিএনপির আক্তারুল ইসলামের মধ্যে মূল লড়াই হতে পারে, যদি নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়। নিজ দল, ব্যক্তি ইমেজ ও সাধারণ জামায়াত সমর্থক ভোটের একটি বড় অংশ এ’ দুই প্রার্থীর পক্ষে যেতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন। বিগত দিনে পৌরসভার কোটি কোটি টাকার দরপত্রের টেন্ডারে অনৈতিক হস্তক্ষেপে ভাগবাটোয়ারাও নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

নির্বাচনী আমেজ শুরু হওয়ায় সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে ৫/৬জন করে কাউন্সিলর- মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী জনসংযোগে নেমে পড়েছেন কোমড় বেধে।

সবমিলিয়ে দলীয় প্রতীক ‘কে’ পাবেন সেটার উপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। সাধারণ ভোটাররা দলীয় প্রতীক নাকি ব্যক্তি ইমেজকে প্রাধান্য দিবেন সেটা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ভোটের দিন পর্যন্ত। তেমনটি হলে দলীয় প্রতীক আর ব্যক্তি ইমেজের লড়াইয়ে বন্দি হতে যাচ্ছেন কলারোয়া পৌরবাসী।
উল্লেখ্য, গত পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আ.লীগ সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন আলহাজ্ব শেখ আমজাদ হোসেন ও বিএনপির শেখ শরীফুজ্জামান তুহিন।