মেইন ম্যেনু

কিসের টানে রাজপথে নেমে এসেছিল তুরস্কের জনগণ?

তুরস্কে গত শুক্রবারের অভ্যুত্থান চেষ্টার সময় থেকেই প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সমর্থনে রাজপথ দখল করে আছে দেশটির জনগণ। সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দেয়ার পাশাপাশি পরবর্তী কোনো ধরনের অভ্যুত্থানের আশঙ্কা থেকেই রাজপথে রাতদিন কাটাচ্ছেন তারা। তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলের সিটি হলের সামনে গিয়েও দেখা গেল একই চিত্র। সেখানেও জড়ো হয়ে আছে অসংখ্য মানুষ। রাস্তার শেষ প্রান্তে এরদোয়ানের বিশাল একটি ছবি টানিয়ে রেখেছে সেনাশাসন বিরোধী তুর্কিরা।

সরকারের পক্ষ থেকেই একটি বার্তা পেয়েই রাস্তায় ছুটে এসেছে মানুষ। সেনা অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে দিয়ে এবং তুরস্কের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে সমর্থন জানিয়ে গত সপ্তাহের এই গণজমায়েতকে তুরস্কের কর্মকর্তারা বলছেন ‘গণতন্ত্রের প্রহরা’ (ডেমোক্রেসি ওয়াচ)। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কারণে বা কিসের টানে এসব লোক ছুটে এসেছিলেন রাজপথে, যারা নিজের জীবন দিতেও ভয় পায়নি। কার আকর্ষণে তাদের এই আত্মত্যাগ?

জড়ো হওয়া অনেকের সঙ্গেই কথা বলে জানা যায়, একজন ব্যক্তির প্রতি ভালোবাসার কারণেই তারা ছুটে এসেছেন রাজপথে। জড়ো হওয়াদের একজন এরসিন কর্কমাজ। তুরস্কের পতাকায় সজ্জিত হয়ে রাজপথেই থাকছেন ২৯ বছরের এই তুর্কি। সঙ্গে আছে তার দুই মেয়েও। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে এরসিন বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রেসিডেন্টকে অনেক ভালোবাসি। ইস্তাম্বুল বিজেতা সুলতান মেহমেদ’র পর তিনিই আমাদের সবচে ভালো শাসক।’ ১৪৫৩ সালে কনস্টান্টিনোপল বিজয় করেছিলেন উসমানীয় সুলতান মেহমেদ।

তবে এরদোয়ানের এই বিপুল জনপ্রিয়তায় সুখে নেই তার পশ্চিমা মিত্ররা। এরদোয়ান দিন দিন কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঝুঁকছেন বলেই মনে করে তারা। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে তার শুদ্ধি অভিযান নিয়ে সতর্কতাও দিয়েছেন পশ্চিমা নেতারা। অভিযানের অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত তুর্কি প্রশাসন প্রায় অর্ধলক্ষ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারিকে বরখাস্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, সামরিক বাহিনীর সদস্য, পুলিশ, বিচারক, আইনজীবী এবং শিক্ষক। এরদোয়ানের ভাষায়, তুরস্ককে ‘ভাইরাসমুক্ত’ করা হবে।

রাস্তায় জড়ো হওয়া তুরস্কের আরো একজন নাগরিক আদম চেঙ্কিয়া এরদোয়ান সম্পর্কে বলেন, ‘অনেকে তাকে স্বৈরশাসক আখ্যা দিতে চায়। কিন্তু আমরা যারা আগের শাসকদের দেখেছি তারা জানি, তিনি মোটেও তেমনটা নন।’ ৪২ বছরের আদম আরো বলেন, ‘এ কারণেই আমরা সবাই তাকে ভোট দেই। আমাদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমরা এরদোয়ানের সঙ্গে আছি।’

এরদোয়ান এবং তার দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একে পার্টি) জনপ্রিয়তার তিনটি প্রধান কারণের কথা জানান তার সমর্থকরা। প্রথম কারণটা সামাজিক। এরদোয়ানকে নিজেদেরই একজন মনে করে তুরস্কের জনগণ। দেশটির নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তরা প্রেসিডেন্টকে নিজেদের প্রতিনিধি বলেই মনে করে। আগের শাসকদের সময় এসব শ্রেণি ছিল নানাভাবে উপেক্ষিত।

একে পার্টির পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় জড়ো হওয়া ইসমাইল নামের একজন তুর্কি এই প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে বলেন, ‘ব্যাপারটি হচ্ছে, এরদোয়ানের আগের প্রেসিডেন্টরা জনগণকে মূল্য দিত না। কিন্তু এরদোয়ান সব সময় তাদের প্রতি মনোযোগী। এটাই সবচে বড় কারণ। আমরা তাকে আমাদেরই একজন মনে করি।’

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থা ‘ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স’র তুর্কি গবেষক আসলি আয়দিন্তাবাস বলেন, পুরো একে পার্টির অবস্থানটাই হচ্ছে, তারা অভিজাতদের (এলিট) কাছ থেকে তুরস্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছেন। এলিটরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। তুরস্কের জনগণ এরদোয়ানকে একে পার্টির এই অবস্থানের মূর্তরূপ মনে করে। আগের শাসকদের সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল জনগণের বিরুদ্ধে। আর এখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণেরই প্রতিষ্ঠান।

এরদোয়ানের জনপ্রিয়তার পেছনে আছে ধর্মীয় কারণও। এরদোয়ানের ইসলামপন্থী একে পার্টি সব সময়ই তুর্কি সমাজের ধর্মানুসারী অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কেমাল আতাতুর্ক দেশে সেক্যুলার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে ধর্মানুসারীদের ওপর নানা অত্যাচার চালানো হয়। বিশেষ করে মুসলিমদের ওপর। আতাতুর্ক ক্ষমতায় আসার পর তুরস্কে মুসলিম নারীদের পর্দা নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া তুরস্কে আজান এবং আরবি অক্ষরও নিষিদ্ধ করেন তিনি। তুর্কিদের ওপর ইউরোপীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন কেমাল আতাতুর্ক। দুই মেয়ে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আসা এরসিন কর্কমাজ বলেন, ‘আমাদের জনগণ ছিল বিকৃত এবং বিভ্রান্ত। আল্লাহকে ধন্যবাদ যে আমরা একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারছি।’

এরদোয়ানের জনপ্রিয়তার পেছনে তৃতীয় কারণটি হচ্ছে তুরস্কের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছে তুর্কিরা। ২০০৩ সালে এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার পর থেকে অর্থনীতিতে অনেক এগিয়েছে তুরস্ক। ইতিহাসে সবচে বেশি অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে এরদোয়ানের সময়ে। রাস্তা, সেতু, মেট্রো লাইনের উন্নয়ন ছাড়াও স্বাস্থ্যখাতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

সরকারি হাসপাতালেই সব ধরনের স্বাস্থসেবা পায় দরিদ্র তুর্কিরা। এর সবটুকু কৃতিত্বই এরদোয়ানকে দিতে চান আদম চেঙ্কিয়া। নিজের মায়ের কিডনি চিকিৎসাও সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে করাতে পেরেছেন তিনি। এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার আগে সেটা সম্ভব হয়নি। তখনও মাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলেন, কিন্তু কাজ হয়নি। এখন চেঙ্কিয়া তার মাকে সপ্তাহে তিনবার বিনা খরচেই করাতে পারেন ডায়ালাইসিস।

তিনি বলেন, ‘এরদোয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছেন। স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, বৃদ্ধদের সেবায় এসেছে উন্নতি। মুদ্রাস্ফীতিও কমেছে। জনগণকে অনেক বেশি মূল্যায়ন করা হচ্ছে।’

‘রাইজ অব টার্কি’ (তুরস্কের উত্থান) নামক একটি বইয়ের লেখক সোনের সাগাপতাই মনে করেন, এরদোয়ান যদি কিছুটা কর্তৃত্বশালী হয়ে ওঠে তো হোক। জনগণও এটাকে সঠিক মনে করে। একে এক ধরনের কৌশল বলেই মনে করেন তিনি। সরকারের সাম্প্রতিক অভিযান সম্পর্কে সোনের বলেন, প্রশাসনে যারা হুমকিস্বরূপ তাদের সরিয়ে দেয়াই বিধিসম্মত। তার ভাষায়, ‘সব সময়ই এরদোয়ানের এমন কিছু বিরোধী ছিল, যারা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়। তাই অভিযানকে ঠিকই মনে করে বেশিরভাগ তুর্কি।’

গণমাধ্যমের ওপর তুর্কি সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে ইসমাইল বলেন, ‘অনেক সাংবাদিক যা করছে সেটা বিশ্বাসঘাতকতা। সাংবাদিকতার নামে তারা যা ইচ্ছে তাই করছে। এক ধরনের সাংবাদিক আছে যারা দেশকে সহায়তা করছে। আরেক ধরনের সাংবাদিক আছে যারা বিশ্বাসঘাতক।’

এরদোয়ান কি শিগগিরই তার জনপ্রিয়তা হারাতে পারেন? এটা আপাতত প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। যতক্ষণ তুরস্কের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকবে এবং বিরোধী দল একটা যোগ্য নেতৃত্ব না পাবে ততক্ষণ এটা অসম্ভবই। তবে দেশ দুভাগে ভাগ হয়ে যাক এটাও চান না এরদোয়ানপন্থীরা। তুরস্কের বিরোধী দলও অভ্যুত্থান চেষ্টার বিরোধীতা করেছে। মিলেমিশেই দেশকে এগিয়ে নিতে চান তারা।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে