মেইন ম্যেনু

‘কী বিচিত্র এই দ্যাশ’ এ বার হোক বোনফোঁটা, বউফোঁটা!

‘সত্য সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দ্যাশ!’ বহু যুগ আগে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট আমাদের দেশের মাটিতে পা রেখে যে নাটুকে বাক্যিটি প্রকাশ করেছিলেন, সেটি কী দারুণ ভাবে সত্যি—তা মুম্বই, কলকাতা, চেন্নাই বা দিল্লির চারপাশে নজর ঘোরালেই দৃশ্যমান হবে। তবে আদৌ তাকে দ্রষ্টব্য বলা যাবে কি না সন্দেহ। কম্পিউটার বা ব্রহ্মাণ্ড-বাক্সের এত ঢাকঢোল পেটানো সত্ত্বেও আমরা অতি নিরীহ দেশবাসীর সিংহ ভাগই আকাশমুখো হয়ে চেয়ে থাকি—বর্ষা হবে কি হবে না? হলে কত দিন হবে? আবার এও ভাবি, বর্ষা থামবে কি না? কত দিন ধরে মাটি একেবারে ডোবা-পুকুর কিংবা নদী হয়ে সর্বস্ব ভাসিয়ে ডুবিয়ে দিচ্ছে, আর আমাদের অতি তৎপর আবহাওয়া বিভাগ কি না হন্যে হয়ে ইনফর্মেশন টেকনোলজি হাতড়েও দিশাহারা। দেশের সত্তর-আশি ভাগ জনগণ প্রায় সর্বহারাই থেকে গিয়েছেন।

বলছি আজকের কথা। একবিংশ শতকের পরেও প্রায় দেড় দশক হেঁটে এলুম—অথচ আজও আমরা যে তিমিরে, সে তিমিরেই বসবাস করি। সব ভুলে তাকাই পশ্চাতে। ‘তে-মাথা’রা দাওয়ায় বসে এখনও সেই আদ্যিকালের মতোই মাথা নেড়ে নেড়ে ঘোষণা করেন:

‘‘আহা-হা! আমাদের সময়ে হ্যান হত, ত্যান হত! আসল ঘি-দুধ খেতুম কবজি ডুবিয়ে। আকাশ মাটি জল বসুমাতা পরান খুলে খুশি ছড়িয়ে দিতেন গ্রামেগঞ্জে।’’ এই সংলাপও আজকের নয়। পঞ্চাশ-ষাট- একশো বছরের পুরনো। তবে হ্যাঁ, আজও সত্যি এবং টাটকা।

image

তা, আমরা এই সব যেন ‘ঈশ্বরের ক্ষোভ’ বলেই ধরে নিয়েছি আজকাল। তাঁকে তুষ্ট করতে আমরা তাঁকেই পুজো করছি। ভিন্ন ভিন্ন রূপে কল্পনা করি। এত সব দুঃখ, জ্বালা-যন্ত্রণা, বন্যা-খরা, দুর্ভিক্ষের অশনি সঙ্কেতকেও অগ্রাহ্য করে আমরা নাচতে নাচতে তলিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বাস ভক্তি অন্ধ বিশ্বাসের নানান জমিতে মূর্তি গড়ে, আদ্যিকালের নানাবিধ মন্ত্র আওড়াচ্ছি পৈতেধারীর শুদ্ধ-অশুদ্ধ উচ্চারণের সঙ্গে তাল রেখে ও চোখ বুজে, বুঝে বা না-বুঝে দুলেই যাচ্ছি। হাততালি দিচ্ছি। আহা! কী আনন্দ! মন্ত্রপাঠ তথা ঢাকঢোল কাঁসর খোল-করতালের রকমারি বাদ্যি-বাজনার তুমুল নেত্য-আরতি চলেছে। চলে আসছে। সেই মান্ধাতার আমল থেকে আজ অবধি। তবু অশান্ত জনগণমন। কারণ, বছরের পর বছর সেই একই ত্রাস-দুশ্চিন্তা-ভোগান্তি।

‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা

মারী নিয়ে ঘর করি!’

এই কথা আজ শুধু বাংলার নয়, আমাদের গোটা দেশ ভারতের পক্ষেই নিদারুণ ভাবে প্রযোজ্য। তারই মধ্যে আমরা মন ভোলাতে চেষ্টা করি, ঠাকুরকে ‘দয়া’ করতে প্রার্থনা করি।

image3

এখানে এসে হাজির হয় আদিম কালের জীবন্ত ও কঠোর এক সত্যি কথা। যা আমাদের পূর্বপুরুষরা দিন ও রাত্রি যাপনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিল। গুহায় বসবাসকারী আদি মানবেরা নানা বিপদ-সম্ভাবনা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে একটু বেলা পড়ে এলেই তথা ‘ঘোর’ হওয়ার আগেই ঢুকে পড়ত গুহার অন্ধকারে। রাত ফুরোলেই আলো ফুটত সূর্যের। গুহামুখ থেকে বেরিয়ে দিনের আলো ফোটার কারণে তারা ধন্যবাদ জানাত দিনপালকে। মনের সেই বোধ থেকেই ক্রমশ মন্ত্র ইত্যাদি প্রবেশ করেছে আমাদের জীবনে। স্তব স্তূতি প্রশস্তির সংস্কৃতে প্রকাশ:

‘ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং

কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং

ধান্তারিং সর্ব পাপঘ্ন

প্রণতোস্মি দিবাকরং!’

সাপের ছোবলে আদিমানবের মৃত্যু হত। এখনও হয়। সেই ভয়ে ভয়েই গ্রামেগঞ্জে আজও মনসাপুজো। সর্প- ভয়ের মতোই গুটিবসন্তের ভয়। একই ভাবে যা জীবন বিপন্ন করে। ক’দিন আগে নিজের চোখে দেখে এসেছি, সুন্দরবনে আজও দক্ষিণরায়ের থানে গ্রামবাসীরা ফুলমালা দেন, পেন্নাম করেন।

image1

বিভিন্ন দেবদেবীর পুজোর সূত্রপাত বা ব্যুৎপত্তি কিন্তু এ ভাবেই হয়। ‘অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী’ কথাটি আমার ক্ষেত্রে হাড়ে-হাড়ে প্রযোজ্য। সামান্য পড়াশোনা ও লজিক তথা নিমিত্তমাত্র বোধবুদ্ধি নিয়ে কথাগুলো বললুম। গুণিজন তথা আমার পিতৃপুরুষ ব্রাহ্মণ তথা পুরোহিতগণ, ভুল বলে থাকলে ক্ষমা করে নেবেন।

তবু মূল কথাটি না-বলে পারছি না যে—মানুষের জীবনে ভগবানের প্রবেশ তিন দুয়ার খুলে। ভয় ভক্তি এবং বিশ্বাস। যদিও সর্বশ্রেষ্ঠটি আসে কিন্তু অভ্যাসের বশে।

এ বারে এ প্রসঙ্গের শেষ কথা। কালীপুজো পরশু দিন। এখন তার মহড়া চলছে। হিন্দু দেশবাসী চতুর্দিকে শুরু করে দিয়েছেন আলোক-উৎসব। মহারাষ্ট্র কিংবা বঙ্গদেশেই শুধু নয়, এই মিঠাইমণ্ডার মোচ্ছবে সামিল হবেন প্রায় সমগ্র ভারতবাসীই। মুম্বইতে অবশ্যই কলকাতার থেকে শান্তি কম। এই তো গত সপ্তাহেই এক দিকে স্কুল, অন্য দিকে হাসপাতাল এই দু’টি ‘শব্দহীন’ এলাকার গণ্ডির ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, রাজনৈতিক মিটিং ও ভাষণ চলেছে ঘণ্টা দু’য়েক। তবে কালীপুজো বা দীপাবলিতে আইনভঙ্গ করে পটকাবোমা ধরনের শব্দবাজির খবর নেই কোথাও! ফলে ইংরেজি বছরের শুরু থেকে সেই যে সরস্বতী-গণেশ-শ্রীকৃষ্ণর পুজো পালা পার্বণের হিড়িক শুরু হয়, এ বছরে তা ক্রমশই নিস্তেজ হয়ে আসছে।

এ বারে আমি একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করব, হে সুধীজন! বহু দিন থেকেই যেটি আমার মনকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে চলেছে। আপনাদের দরবারে আজ পেশ করব। কেউ ‘লজিক্যাল’ জবাব জানলে এই পত্রিকার ঠিকানায় ‘মুম্বই ক্রোড়পত্র’ হেডিং দিয়ে পাঠালে বাধিত হব এবং এই কলমের মাধ্যমে অন্য পডুয়াদের জানিয়ে দেব।

প্রশ্নটি হল ভাইফোঁটা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া তথা ভাইদুজ উৎসব বা আচারের উৎস বা ব্যুৎপত্তি কোথা থেকে? মন্ত্র বলতে যেটুকু বাংলায় পাই, তা হল:

‘ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা

যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা

আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা’

তথাকথিত কিংবদন্তি বা ‘কে বলেছে’ তার কোনও হদিস কেউ জানে না। তা হলে? পুজো-আর্চা নয়, এটিকে বরং আচার বা সনাতন প্রথা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়। ব্যাস! ব্যুৎপত্তি কই?

কথিত আছে অজস্র গপ্পো। যেমন কৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার রাজ্যের কাছে দস্যু নরকাসুর বধ করে ফেরার সময় ভগিনীর কথা মনে পড়ায়, সেখানে গিয়ে হাজির হন বহু যুগ পড়ে। সুভদ্রা তো আনন্দের ঠেলায় মহা ঘটা করেই তিলক পরিয়ে, মোচ্ছবের আয়োজন করে দাদাকে অভ্যর্থনা করলেন।

বহু-প্রচলিত যম-যমুনার কাহিনি প্রায় সকলেই শুনেছেন। সুতরাং অলমতি বিস্তরেণ। ‘মহাবীর’ও হঠাৎ এমনই কোনও কারণে তাঁর বোন সুদর্শনার পাড়ায় গিয়ে, তাঁর কথা ভেবেই পৌঁছে গেলেন ভগিনীগৃহে। যথারীতি ফোঁটা-মোচ্ছব ইত্যাদি সম্পন্ন হল। এই হল ভাইফোঁটার কথা। এ বার আর একটি সূত্র মনে করিয়ে দিই, যেখানে বউ দিয়েছে বরকে ফোঁটা। ‘মহাভারত’ মনে করুন। চক্রব্যূহ ভেদ করতে যাওয়ার ঠিক আগে অভিমন্যুকে স্ত্রী উত্তরা আরতি করে, জয়ের ফোঁটা পরিয়ে দিয়েছিলেন।

এখন আমার জিজ্ঞাসা থাকছে এই রকম। আজকের এই ঊর্ধ্বশ্বাস জীবনে ভাইয়েরা সকালবেলায় কাজ বা চাকরি করতে বেরোয়। বর্তমানে সংসার সামলাতে বহু বোনকে বা স্ত্রীকেও তো ঘর থেকে বেরিয়ে রোজগার করে খেতে হয়। এঁরা যখন হা-ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফেরেন, এঁদেরও তো যুদ্ধজয়ের ‘সাবাসি’ দিতে হয়। পথঘাট-দুর্ঘটনা-বিপদ-আপদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে যেমন যেতে হয়, তেমনই ফিরতেও সেই একই দিনযাপনের যুদ্ধ!

image2

তা হলে আমরা আজকের মানুষ যদি নবরূপে এক নতুন আচার বা সংস্কৃতি পালনের নিয়ম করি—দু’এক হাজার বছর পরে সেটিকেও কেন কিংবদন্তি হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যাবে না? অর্থাৎ ঘরে ঘরে বোনেরা যেমন ভাইদের তিলক বা ফোঁটা লাগায়, সেই একই নিয়মেই ভাইয়েরাও বোনদের বা বরেরাও তো স্ত্রীদের ফোঁটা দিতে পারে? সুতরাং এর পর থেকে ‘বোনফোঁটা’ বা ‘বউফোঁটা’ উৎসব শুরু হোক না কেন ঘরে ঘরে! দিন ধার্য করে ভাইয়েরা বোনেদের ও স্বামীরা স্ত্রীদের ফোঁটা দেওয়া শুরু করুন—ঘরে ঘরে বউ বা বোনের দল পথে বেরোনোর আগে বা পরে, সকালে বা সন্ধ্যায়, নিত্যদিনের যুদ্ধযাত্রার আগে কিংবা যুদ্ধজয়ের শেষে ঘরে ফেরার পরে—

ধার্য হোক বোনফোঁটার দিন!

ধার্য হোক বউফোঁটার দিন!!

সূত্র: আনন্দবাজার