মেইন ম্যেনু

কুড়িগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা জালাল’র দূর্দিন

কে.এম গোলাম রব্বানী, কুড়িগ্রাম থেকে: বীর মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদেন। ভারতের সাহেবগঞ্জে ২৮ দিন গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশ হানাদারমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত রণক্ষেত্রে ছিলেন। দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু দু:খের নিশি ভোর হয়নি তার। অন্যের জমিতে বাঁশঝাড়-জঙ্গলে জীর্ণ খুপড়িতে পোকামাকড়ের সাথে পরিবার নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। ভাতা জুটলেও নিজ নামে জমি না থাকায় জোঁটেনি সরকারী বাড়িটি। চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ধুকেধুকে মানবেতর জীবন কাটছে তার।

ভুরুঙ্গামারী-পাথরডুবি সড়কের সদর ইউনিয়নের কামাত আঙ্গারিয়া গ্রাম। সড়কের পশ্চিমে বিশাল এলাকা জুড়ে বাঁশঝাড়। থোকথোক জঙ্গল। বাঁশঝাড়ের ভিতর দিনের বেলা হাটলেও শরীর কাঁটা দেয়। অচেনা কেউ একা হাঁটতে গেলে ভয়ে বুক দুরুদুরু কাঁপবেই। গত বৃহস্পতিবার ওই বাঁশঝাড়ের ভিতর দিয়ে পায়ে হেটে বেশ কিছুদুর যেতে কানে আসলো বাঁশ কাটার ঠকঠক আওয়াজ। আরো কিছুদুর এগিয়ে যেতে দেখা গেল। জীর্ণ কঙ্কালসার বীর মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন বাঁশ কেটে খুঁটি করছেন। অচেনা লোকেও তার কৌতুল নেই। কথার শুরুতে বাঁশ কাটার প্রসঙ্গ উঠতেই বললেন, ঘর ভেঙ্গে পড়ে। বাঁশ খুজি আনলাম। খুটি দিব।

আপনিতো মুক্তিযুদ্ধ করেছেন? এ কথায় অফুরন্ত প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। বলেন, তখন আমাদের বাড়ি পাইকেরছড়া ইউনিয়নের গছিডাঙ্গা গ্রামে। এইসএসসি পাশ করেছি। যুদ্ধ শুরু হলো। বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন। শুনে মনস্থির করে খামারপত্র নবিশ এলাকার মকবুল হোসেন, শামসুল হক মতি (সাবেক কমান্ডার) এদের সাথে সাহেবগঞ্জ সাবসেক্টরে ২৮দিন গেরিলা ট্রেনিং দিলাম। তারপর এসে বাগভাঙ্গারে যুদ্ধ শুরু করি। ক্যাপ্টেন ছিলেন মেজর নওয়াজেশ। কোম্পানী কমান্ডার আরব আলী। ১৪নভেম্বর (১৯৭১) ভুরুঙ্গামারী হানাদার মুক্ত হয়। সেদিনো রণক্ষেত্রে ছিলাম। বলেই ঢুকলেন বাড়িতে।

জালালের বাড়ি বলতে গাদাগাদি করা চার দিকে চারটা খুপড়ি ঘর। তিনটি একচালা টিনের। একটি খড়ের। খড়ের ঘরটির দৈর্ঘ্য ৬হাত। প্রস্থ্য ৪হাত। একচালা টিনের বড় ঘরটি দৈর্ঘ্য ৮ ও প্রস্থ্য ৫হাতের মত। সব কয়টি খুপরির বেড়া পুরোনো টিন ও পাটখড়ির। বাহির থেকে দেখা যায় ঘরের ভিতরের সব স্পষ্ট। ভেতরদিকের পাটখড়ির জীর্ণ বেড়া কাগজ ও ছেড়া কাপড়ের আচ্ছাদন দেয়ার চেষ্টা করেছে। বাঁশঝাড়টি স্থানীয় আবুল হোসেন মাস্টারের। প্রায় ৩০ বছর যাবৎ জায়গাটুকু চেয়ে নিয়ে বাঁশঝাড়ের ভিতর বসবাস করে আসছেন জালাল উদ্দিন। আবুল হোসেন মাস্টার বলেন, জালাল মিয়ার বাড়িতে গেলে কষ্ট হয়। এত কষ্ট করে মানুষ থাকে আমার জানা ছিলনা। অথচ শিক্ষিত লোক মুক্তিযোদ্ধা তার একটা চাকুরী সরকার দিতে পারত।

খড়ের ঘরটির মত আকারে দু’টি টিনের একচালার একটিতে ঢুকে দেখা গেলো একপাশে বিছানা। অপরপাশে মাটিতে খড় বিছানো। দু’টি খুঁটি পোতানো। জিজ্ঞাসার আগেই জালাল উদ্দিন বলেন, এইদিকে আমরা থাকি ওইদিকে গরু দুইটা। পাশের ঘরে থাকেন দুই মেয়ে ও এক ছেলে। অন্যপাশে এলোমেলো অনেক কিছু। খড়ের ঘরের চুলার উপর ছোট্ট পাতিলে রান্না বসিয়েছেন জালালের স্ত্রী জুলেখা বেগম। তার সমাদরের চেষ্টার ভিতর জঙ্গলের ভিতর থাকছেন ভয় হয়না? সদুত্তর তার। ভয় করি কি হয়। জমি নাই। মানষে থাকব্যার দিছে। ভয় খালি ব্যাং, সাপ, পোকার। বাঁশের আড়ার সোউগ পোকা ঘরত-বিছনাত ওডে। এমনে জঙ্গলত ঘর। তাতে বেড়া দিব্যার পাইনা। ঝড়ির দিন আসলে পোকামাকড়ের যন্ত্রণায় থাকা যায়না। একদিন ঝড়িত সুবার যেয়া দেহি কালা সাপ বিছনাত। চেকরাচিকরি। এমন করি থাকি। দীর্ঘশ্বাস মিলে বললেন কপাল খারাপ।

তাদের তিন মেয়ে এক ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে জেসমিন দু’বছর আগে এসএসসি পাশের পর মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটে। চিকিৎসায় সুস্থ্য হলে পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়ে বিয়ে দেয় ডাকায় পোশাক কারখানায় কর্মরত স্থানীয় এক ছেলের সঙ্গে। বর্তমানে মেয়ে তার স্বামীর সাথে ঢাকায় থাকে। একমাত্র ছেলে জিয়াউল হক। তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণি, তার ছোট জয়নব কামাত আঙ্গারিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে এবং সবার ছোট নুপুর ওই স্কুলে ২য় শ্রেণিতে পড়ে। কথার মাঝে বই হাতে ফেরে তিন ভাইবোন। জিয়াউল বলেন, বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। ভাবতে ভাল লাগে। কিন্তু যখন না খেয়ে স্কুলে যাই, খাতা-কলম, কাপর কিনবার পাইনা। বাবা ছোট বোনদের আব্দুর পূরণ করতে পারেনা। তখন মনে হয় বাবার যুদ্ধ করে কী লাভ হয়েছে।

আওয়ামীলীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মাসে প্রথম তিন’শ টাকা ভাতা প্রদানের শুরুতে জালালসহ উপজেলার ৫৪ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পায়। বর্তমানে পাচ্ছে ৮হাজার টাকা। কিন্তু এ টাকায় সন্তানদের পড়ালেখা, সংসার খরচ হয়না। সম্প্রতি সরকার অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি তৈরীর প্রকল্প নেয়। এতেও তার নামে জমি না থাকায় বাড়ি পায়নি। জালাল বলেন, একজনের কাছে বাড়ির বিষয়টি জেনে কমান্ডারের সাথে দেখা করে বলি। তিনি বলেন তোর জমি নাই এজন্য বাড়ির নাম দেয়া হয় নাই।

এ বিষয়ে ভুরুঙ্গামারী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জালালের মত আসল একজন মুক্তিযোদ্ধা এভাবে দু:খে-কষ্টে জর্জরিত থাকবে এটা লজ্জাজনক। বাড়ির বিষয়ে বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে তার নামে কোন জমি নেই। মুক্তিযোদ্ধার নামে ৮শতক জমি থাকলে তার উপর বাড়ি করার বিধান। অন্যের জমিতে বাড়ি তুলে দিলে দু’দিন পর জমির মালিক যদি থাকতে না দেয়। এজন্য সম্ভব হয়নি।

এ ব্যাপারে ভুরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সহকারী কর্মকর্তা (ভুমি) মামুন ভুইয়া বলেন, বিষয়টি জানতাম না। তিনি যদি খাস জমি চেয়ে আবেদন করেন তাহলে- মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অগ্রাধিকার থাকবে। সরকারী সহায়তার সুযোগ আসলে তাকে সহায়তারও আশ্বাস দিন তিনি।