মেইন ম্যেনু

কূটনৈতিক যোগাযোগ ভেঙে পড়েছে বিএনপির

সম্প্রতি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল বাংলাদেশ সফর করে যান। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেন প্রভাবশালী এই কূটনীতিক। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার কোনো বৈঠকের কর্মসূচি ছিল না। একই সময়ে বাংলাদেশ সফর করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ বিন নাসের বিন খলিফা আল থানি। তিনি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করেন। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে তার কোনো বৈঠকের কর্মসূচি ছিল না। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির ভালো সম্পর্ক থাকলেও তিনি বেগম জিয়ার সঙ্গে বৈঠক না করেই চলে যান। নিশা দিশাই ফিরে যাওয়ার তিন দিন পর বাংলাদেশ সফরে আসেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর। তার সঙ্গেও চেয়ারপারসন কিংবা বিএনপি নেতাদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে ক্রমেই ছিটকে পড়ছে বিএনপি। বৈদেশিক নীতির সঙ্গে কাজ করা নেতারা সরে যাওয়ায় দলের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রভাবশালী রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিএনপির নেটওয়ার্ক ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। ঢাকার কূটনৈতিক মিশনের কর্মকর্তারাও বলাবলি করছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হচ্ছে না। এ নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ডেও হতাশা বিরাজ করছে। জানা যায়, চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক বহুদিনের। বেশ কয়েক দিন আগে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করলেও বিএনপি-প্রধানের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের কোনো কর্মসূচি রাখেননি।

এ নিয়ে বিএনপির ভেতরও নানা কথা শোনা যায়। এর কিছুদিন পরই বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূতের কাজ করা ছয়জন প্রভাবশালী কূটনীতিক সফরে আসেন। তারাও বিভিন্নজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে চলে যান। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে কোনো কর্মসূচি রাখেননি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘চীনের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই। এখনো সেই সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে।’ তবে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী ও সাবেক কূটনীতিকদের সঙ্গে বিএনপি-প্রধানের দেখা-সাক্ষাৎ না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা চীনের প্রতিনিধিরাই বলতে পারবেন। আমি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ জানা যায়, বিএনপির কূটনৈতিক মিশনে কাজ করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান, ড. এম ওসমান ফারুক, আবদুল আউয়াল মিন্টু, সাবিহ উদ্দিন আহমেদ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আ ন ম এহসানুল হক মিলন, চেয়ারম্যানের ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটির আহ্বায়ক শফিক রেহমান, সদস্যসচিব মুশফিকুল ফজল আনসারী, তরুণ নেতাদের মধ্যে তাবিথ আউয়াল, শ্যামা ওবায়েদ, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা প্রমুখ।

এ ছাড়া কূটনৈতিক বলয়ে যোগাযোগ ছিল দলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিনের। তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। শফিক রেহমানও জেলের ঘানি টানছেন। আবদুল আউয়াল মিন্টুর বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলার খড়্গ ঝুলছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এম ওসমান ফারুক যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ প্রভাবশালী দেশগুলোতে বিএনপির কূটনৈতিক মিশনে যোগাযোগ রাখেন তিনি। বিগত সরকারবিরোধী টানা তিন মাসের আন্দোলনের সময় যুক্তরাষ্ট্রে থেকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহলে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হওয়ার ঘোষণা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থা। এর পর থেকেই চুপসে যান সাবেক এই শিক্ষামন্ত্রী। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। দলের কর্মকাণ্ডেও তাকে চোখে পড়ছে না।

শুধু ওসমান ফারুকই নন, বিএনপির ফরেন পলিসি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের প্রত্যেকেই নানামুখী চাপে রয়েছেন। কেউ জেলে, কেউ বাইরে থাকলেও চলাফেরা করছেন সতর্কভাবে। বিদেশিরাও ক্রমেই বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ না থাকার কথা বলছেন প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকরাও। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়েছে এটা বলা ঠিক হবে না। তবে চাপে আছে। শুধু বিএনপি নয়, সারা দেশের জনগণই চাপের মধ্যে রয়েছে। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব পেশাজীবী কেউই আজ নিরাপদ নন। দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা নেই। মানুষের জীবনের নেই নিরাপত্তা। এর প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়ছে। বিএনপির দক্ষ কূটনীতিকদের মধ্যে একজন ছিলেন শমসের মবিন চৌধুরী।

গত বছর ২৮ অক্টোবর বিএনপির রাজনীতি থেকে বিদায় নেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দল ত্যাগের ঘোষণা দিলেও নানামুখী চাপে তিনি বিএনপি ছাড়েন বলে জানা গেছে। শমসের মবিন চৌধুরী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। সেনাবাহিনী থেকে তিনি পররাষ্ট্র দপ্তরে নিয়োগ পান। দ্বিতীয় মেয়াদে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় তিনি পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া কূটনীতিক হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও ছিলেন। ২০০৮ সালে বিএনপি চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হন। ২০০৯ সালে বিএনপির কাউন্সিলে তিনি দলের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। বিএনপির বর্তমান কূটনৈতিক যোগাযোগ প্রসঙ্গে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, ‘বিএনপিতে কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে কাজ করার লোক নেই এটা বলা যাবে না। তবে বর্তমানে তাদের কার্যক্রমে দক্ষতার কিছুটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আমি বিভিন্ন দূতাবাসে গেলে তারাও বলছে, বিএনপির কোনো খবর পাচ্ছি না। নিশা দেশাই ও কাতারের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে চলে গেলেও বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ না হওয়াটা একটা তাত্পর্য বহন করে।

এ ছাড়া বন্ধুত্ব থাকা চীনের সঙ্গেও বিএনপির যোগাযোগ কমে গেছে। কয়েকজন কূটনীতিক ও সাবেক একজন উপপ্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। তারাও বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেননি। আমি এখন দলে নেই। বিএনপির নেতারাই এসব বিষয়ে ভাববেন বলে আমি মনে করি।’ শমসের দল থেকে চলে যাওয়ার পর ড. আবদুল মঈন খানের নেতৃত্বে কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। গত ঈদে খালেদা জিয়া দেশের বাইরে থাকায় ঢাকার বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের নিয়ে নিজ বাসায় শুভেচ্ছা বিনিময় করেন মঈন খান। ওই সময় ঢাকায় এক বিদেশি হত্যাকে কেন্দ্র করে মঈন খানকে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর থেকেই নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে ফেলেন ড. মঈন খান।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বিএনপির গণআন্দোলনের সময় গুলশানে হামলার শিকার হন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান। হামলার পর থেকেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে মাঝেমধ্যে দেখা গেলেও আগের মতো সক্রিয় নেই সাবেক এই আমলা। ওই সময় চলা আন্দোলনে গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এ সময় বিএনপির কূটনৈতিক বিষয় দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক নেতা সাবিহ উদ্দিন আহমেদও সেখানে আটকা পড়েন। বেশ কিছুদিন কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকার পর হঠাৎ একদিন সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েন। বিএনপি না করার মুচলেকা দিয়ে তিনি সেখান থেকে সরে পড়েন বলে আলোচনা রয়েছে।

এর আগে গুলশান কার্যালয়ের অদূরে তার গাড়িও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তিনি এখন সতর্কভাবে চলাফেরা করছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুসম্পর্ক রাখা শফিক রেহমানকেও সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়। তার নেতৃত্বে বিএনপির কূটনৈতিক উইংয়ের নেতারা ঢাকার বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে মতবিনিময় করতেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগে করা একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। দুই দফা রিমান্ডেও নেওয়া হয় তাকে। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিএনপি এখন অনেক দূরে এটা অস্বীকার করা যাবে না। দলের উচিত হবে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে নতুনভাবে তত্পরতা শুরু করা। নইলে আগামী নির্বাচনেও বিএনপিকে এর খেসারত দিতে হবে।-বিডি প্রতিদিন