মেইন ম্যেনু

কৃষ্ণকলির গৃহকর্মীর মৃত্যু: ময়না তদন্তে ‘আত্মহত্যা’, মামলায় আপোস

‘মামলা করলেও বোন পাইতাম না, উকিলের কাছে গেলেও পাইতাম না। তাই মামলা করে আর লাভ কি? তাই আপোস করেছি’।

কণ্ঠশিল্পী কৃষ্ণকলির বাসার গৃহকর্মী জান্নাত আক্তার শিল্পীর ময়না তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার বোন রেনু আক্তার এভাবেই তার আক্ষেপের কথা বলেন।

‘ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে ফাঁসি নিয়ে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছে। আমাদের মেনে নেওয়া ছাড়া কি করার আছে?’- বলতে বলতে কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে রেনুর।

তিনি জানান, কৃষ্ণকলির পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ দাফন-কাফনের জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে মরদেহ নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার কালদোয়ার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে এসে দাফন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ময়না তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর জান্নাতের পরিবারকে গ্রাম থেকে ডেকে আনে পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতিতে জান্নাতের পরিবারের সঙ্গে আপোস করেন কৃষ্ণকলি। এ সময় জান্নাতের পরিবারকে টাকা দেওয়া হয়।

কৃষ্ণকলির রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলার বাসায় দেড় মাস আগে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে জান্নাত। গত ২৩ মার্চ ওই বাসা থেকে অচেতন অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান কৃষ্ণকলির স্বামী খালিকুর রহমান অর্ক। সেখানে জান্নাতকে মৃত ঘোষণার পর হাসপাতালের মর্গে মরদেহের ময়না তদন্ত করা হয়।

এ সময় খালিকুর রহমানের মুখে খামচি ও আঁচড়ের দাগ দেখে তাকে আটক করে পুলিশ। পরদিন ২৪ মার্চ সন্দেহজনক ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশ ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানালে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ২৪ মার্চ বিকেলে জান্নাতের মা হালেমা খাতুন বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করেন।

এ মামলার ভিত্তিতে হলে গৃহকর্মী জান্নাতকে হত্যা করা হয়েছে- এ সন্দেহে খালিকুর রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ।

নিহত গৃহকর্মীর মা হাজেরা বেগম সে সময় অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘কৃষ্ণকলি ও তার স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে আমার মেয়ে মারা গেছে। মৃত্যুর আগে বাসার কাজ নিয়ে তারা বিভিন্ন সময় বকাবকি করতেন’।

দু’দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুশীল কুমার বর্মণও জানিয়েছিলেন, কৃষ্ণকলি ও তার স্বামী খালিকুর রহমানের নির্যাতনের শিকার হয়ে জান্নাত আক্তার শিল্পীর মৃত্যু হয়েছে- পরিবারের করা এমন অভিযোগের বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্ত চলছে।

তিনি বলেছিলেন, গৃহকর্তা খালিকুর রহমানের মুখে কালো দাগ রয়েছে। জান্নাতের গলা ও মুখেও আঁচড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে খালিকুর তার মুখের কালো দাগের বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য দেননি। তাই এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

এর আগে জান্নাতের মরদেহের ময়না তদন্ত শেষে ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মোজাম্মেল হকও জানান, নিহত মেয়েটির মুখে ও গলায় দাগ ছিল।

সুরতহাল প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিলো, জান্নাতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও নখের আঁচড় ছিলো যা ধর্ষণ পরবর্তী হত্যার ইঙ্গিত দেয়।

তবে তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ময়না তদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় ছিলেন।

সেই ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পীর মৃত্যু হ্যাঙ্গিংয়ে (ঝুলন্ত) হয়েছে। ধর্ষণ কিংবা অন্তঃসত্ত্বার আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা সুশীল কুমার বর্মন।

তিনি বলেন, জান্নাতের মৃত্যু হ্যাঙ্গিংয়ে হয়েছে বলে উল্লেখিত ময়না তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালতকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষ্ণকলির স্বামী খালিকুর রহমানকে অব্যাহতির দেওয়ার আবেদন জানোনো হযেছে।

তবে হত্যার একাধিক আলামত থাকার পরও কিভাবে ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার বিষয়টি আসলো সেটা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

পুনরায় ময়না তদন্ত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ময়না তদন্ত পুনরায় করার জন্য আমরা মানবাধিকার কমিশনের বরবাবর দাবি জানানোসহ আইনি পদক্ষেপ নেবো।