মেইন ম্যেনু

কেউ উঠতে চান না লতিফ সিদ্দিকীর সেই বাড়িতে!

সদর দরজা খোলা। নিরাপত্তা প্রহরীর ছোটো কামরা খালি। যে কেউ চাইলে ঢুকে পড়তে পারে। সোজা এগিয়ে গেলে বাড়ির পেছন দিকটায় দুজনের দেখা মিললো। রান্নার গোছগাছ করছেন গৃহিণী। তার পাশেই জলচকি পেতে বসা লোকটি জানতে চাইলেন ‘কী চাই?’

‘কথা বলতে চাই’
‘কী কথা বলেন?’ বলতে বলতে উঠে এলেন ।
‘বলছিলাম এ বাড়িতে কেউ কি থাকেন?’
‘না, কেউ নেই। আমি আর আমার বউ ছাড়া কেউ নেই। চারজন নিরাপত্তা প্রহরী আছেন, বাইরে থাকেন। একজন ঝাড়ুদার ভোরে এসে কাজ সেরে চলে যান।’

রাজধানীর হেয়ার রোডের ২০ নম্বর বাড়িটির নাম নদীর নামে। ধলেশ্বরী। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী থাকতেন এখানে। পবিত্র হজ, তাবলীগ জামায়াত নিয়ে কটুক্তি ও প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার দায়ে মন্ত্রিত্ব ও দলীয় পদ হারান তিনি। পরে সংসদ সদস্য পদটিও ছেড়ে দেন। অগত্যা সরকারি বাসভবনটিও ছাড়তে হয়েছিল তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীকে। সেই থেকে খালি পড়ে আছে হেয়ার রোডের বাড়িটি।

বাড়িটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা জামাল বললেন, ‘গত ১৩ মাস ধরে এখানে আছি। কতজন এসে দেখে গেল। কিন্তু কেউ এল না। দীর্ঘদিন খালি পড়ে থাকায় কেমন ভুতড়ে ভুতড়ে লাগে।’

জামাল জানান, গেল বছর বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক বাড়িটি ঘুরে গিয়েছিলেন। কিন্তু উঠবেন বলেও শেষে আর উঠেননি। এসেছিলেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের স্ত্রীও। তিনি দেখে প্রথমে পছন্দ করলেও পরে না করে দেন।

এরপর দীর্ঘদিন কেউ বাড়িটিতে উঠার আগ্রহ দেখাননি। এবছরের মার্চে আবার এসেছিলেন কামরুল ইসলাম মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন বাড়িটি দেখতে। কিন্তু মেয়ের আপত্তি। বললেন, ‘বাবা বাড়িটি অনেকদিন খালি। এখানে আসবো না।’

হেয়ার রোডের শেষ দিকটায় বাড়িটির নিরিবিলি পরিবেশ ভেদ করে মাঝেমধ্যে ডেকে উঠছে ইষ্টিকুটুম, দোয়েল। বাড়ির ভেতরে দুপাশে বাগান। নানা রঙের ফুল। আছে রসালো ফলে গাছও। আমের ভারে গাছগুলো ঝুঁকে আছে।

‘মানুষের কোনো চরিত্র নেই। আম খাবি তো খা, তলায় কুড়লেই তো অনেক। গাছে কেন উঠতে হবে?’ বললেন বাড়ির কেয়ারটেকার। সন্ধ্যায় দেয়াল টপকে লোক ভেতরে ঢুকে পড়ে তাও জানালেন। তাহলে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ কী? উত্তরে বোঝা গেল, কেউ থাকে না, তাই নিরাপত্তাও ঠুনকো।

বলতে বলতে আবু সাঈদ নামে একজনকে দেখে ধমকে উঠলেন জামাল, ‘আপনি কাল গাছে কেন চড়েছিলেন? কোন সাহসে এই কাজ করলেন?’ আমতা আমতা করে আবু সাঈদ বললেন, ‘আমি কেন গাছে উঠবো? আপনি ভুলে দেখেছেন।’ দুজনের বাকবিতণ্ডা চলতে থাকলো। বেরিয়ে আসার পথে অপর একটি বাসার একজন নিরাপত্তা প্রহরীকে বলতে শুনলাম, ‘আরে ভাই খাইলে সরকারি গাছে ফল খাইছে। এত ঝগড়াঝাটির কী আছে?’

২০০৯ সালে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী থাকাকালে বরাদ্দ পেয়েছিলেন বাড়িটি লতিফ সিদ্দিকী। দশম সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের পর মন্ত্রণালয় বদল হয়েছে। মন্ত্রী হয়েছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু বাসা বদল করেননি। কাণ্ডটা ঘটলো গেল ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর।

নিউ ইয়র্কে এক সভায় পবিত্র হজ ও তাবলীগ জামায়াত নিয়ে কটুক্তি করে বসলেন। প্রধানমন্ত্রীপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়েও আপত্তিকর কথা বলেন তিনি। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানায় লতিফ সিদ্দিকীর শাস্তির দাবি উঠলো। তার এই কাণ্ডে বিব্রত সরকার ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর তাকে সরিয়ে দিল মন্ত্রিসভা থেকে। হারালেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্যপদও। পরে তিনি ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সংসদ সদস্য পদও ছেড়ে দেন তিনি।

এরপর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় কারাগারে যান লতিফ সিদ্দিকী। বেশ কয়েক মাস কারাগারে থাকার পর ২০১৫ সালের ২৯ জুন মুক্তি পান তিনি।

২০০৯ সালে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার আগে লতিফ সিদ্দিকী থাকতেন ধানমন্ডির ১২/এ রোডের ৬৮ নম্বর বাসায়। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। ছোট মেয়ে হেয়ার রোডের বাসায় থাকতেন। আরেক মেয়ে থাকেন কানাডায়। একমাত্র ছেলে থাকেন বনানীতে। ঢাকাটাইমস