মেইন ম্যেনু

কেন বব ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়া উচিত হয়নি

‘আমেরিকার চিরায়ত সঙ্গীত ঐতিহ্যে কাব্যিক ধারা প্রচলনের’ স্বীকৃতিস্বরুপ কিংবদন্তী মার্কিন সঙ্গীতশিল্পী ও গীতিকার বব ডিলানকে এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এ পুরস্কার ঘোষণার পর চারদিকে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একজন গীতিকারকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়ার ঘটনায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন।

তবে বড় একটি পক্ষ আছে, যারা সঙ্গীত ও কবিতাকে আলাদা করে দেখতে নারাজ। নোবেল কমিটির এ সিদ্ধান্ত তাদের কাছে যথার্থই মনে হয়েছে। অপরদিকে ডিলানের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের বিপক্ষে তাদের যুক্তিগুলো তুলে ধরে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস। নিবন্ধটি লিখেছেন পত্রিকাটির স্টাফ এডিটর আনা নর্থ।

নিবন্ধের শুরুতেই আনা নর্থ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, ‘বব ডিলান সাহিত্যে নোবেল পাওয়ার উপযুক্ত নন’।

তিনি লিখেছেন, ‘বব ডিলান জীবনে অনেকগুলো গ্র্যামি জিতেছেন, ১৯৯১ সালে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৮৮ সালে সুপ্রিমস, বিটলস, বিচ বয়েজের সাথে ‘রক এন্ড রোল’ এর হল অব ফেমে তার নাম ‍উঠেছে। বব ডিলান নিঃসন্দেহে এ সবের যোগ্য। তিনি অসম্ভব প্রতিভাবান একজন শিল্পী, আন্তর্জাতিক মানের একজন গীতিকার, আমেরিকান সংস্কৃতির প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।’

‘কিন্তু একজন লেখককের জায়গায় একজন গীতিকারকে সাহিত্যে নোবেল দেওয়াটা নোবেল কমিটির হতাশাজনক সিদ্ধান্ত।’

‘এটা ঠিক যে বব ডিলান একজন প্রতিভাবান শিল্পী ও গীতিকার। তিনি কবিতা-গল্পের বইও লিখেছেন। তিনি নিজের আত্মজীবনীও প্রকাশ করেছেন। তার গানের কথাকে কবিতা হিসেবে ভাবার সুযোগ আছে। কিন্তু তিনি লিখেছেন সঙ্গীতকে উদ্দেশ্যে করেই এবং তার সেসব লেখাগুলোকে সঙ্গীত থেকে আলাদা করাটা সত্যিই দুরূহ।’ আনা নর্থ তার নিবন্ধে লিখেছেন।

‘বব ডিলান একজন মহান শিল্পী এবং গীতিকার। সমস্যাটা হলো নোবেল কমিটি যখন একজন গীতিকারকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেয়, তখন একজন লেখককে সে পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হয়।’

আনা নর্থ তার নিবন্ধে আরও উল্লেখ করেন, ‘সারা বিশ্বেই এখন বই পড়ার হার ‍উদ্বেগজনকভাবে কমছে। সাহিত্য পুরস্কারগুলোও তাই অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় সাহিত্য পুরস্কার প্রতিষ্ঠিত কোনো লেখকের বইয়ের বিক্রি রাতারাতি বাড়িয়ে দিতে পারে, অনুরাগী পাঠক তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তার চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে- একজন ঔপন্যাসিক বা কবিকে সাহিত্যে নোবেলের মতো বড় একটি পুরস্কার দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, এটা স্বীকার করে নেওয়া যে তার নাটক, কবিতা, গল্প এসবের এখনো গুরুত্ব আছে।’

‘জনপ্রিয় গানেরও স্বীকৃতির প্রয়োজন আছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, বব ডিলানের গান তো ইতোমধ্যেই অনেক পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে। সঙ্গীতের বড় বড় বহু পুরস্কার আছে বব ডিলানের ঝুলিতে। গানের বড় বড় পুরস্কারগুলো একজন লেখক পাবেন, এটা তো কেউ কল্পনা করে না। জ্যাডি স্মিথ (বর্তমান সময়ের বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক) কিংবা ম্যারি গাইটস্কিলকে (বর্তমান সময়ে বিখ্যাত মার্কিন ঔপন্যাসিক) তো কেউ ‘রক এন্ড রোল’ এর হল অব ফেমে দেখতে চায় না। তাইলে বব ডিলানকে কেন সাহিত্যে নোবেল দেওয়া হবে?’

নিবন্ধে বলা হয়েছে, ‘নোবেল কমিটি হয়তো নিজেদের একক সিদ্ধান্তে ডিলানকে সাহিত্যে নোবেল দেয়নি। এ ক্ষেত্রে তারা আরও অনেক কিছু বিবেচনা করে থাকতে পারে। গানের একজন জীবন্ত কীংবদন্তিকে এমন সম্মানে ভূষিত করার মাধ্যমে তারা হয়তো এ পুরস্কারে নতুন সংস্কৃতি চালু করতে চেয়েছেন, যাতে তরুণরা বিষয়টিতে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে পারে।’

‘কিন্তু একজন সত্যিকারের লেখককে এ পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমেও নোবেল কমিটি তাদের উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারত। তারা জেনিফার এগান, তেজু কোল অথবা অ্যানি কারসনের মতো ভিন্নধর্মী লেখককে এ পুরস্কতার দিতে পারত, যারা লেখালেখির মধ্য অনেক নতুনত্ব আনতে সক্ষম হয়েছেন। তারা উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকেও একজন লেখককে এ পুরস্কারের জন্য বাছাই করতে পারত, কারণ দুর্ভাগ্যজনকভাবে উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে এখনও কেউ সাহিত্যে নোবেল পায়নি। নোবেল কমিটি এমন কাউকে সাহিত্যে নোবেল দিতে পারত, যিনি বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে অনলাইনে তার পাঠক অনুরাগী সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। যেমন ওয়ারসান শায়ারের কথা বলা যায়। তিনি লন্ডন ভিত্তিক একজন সোমালিয়ান লেখিকা। ২০১৪ সালে তিনি লন্ডনের প্রথম তরুণ কবির খেতাব অর্জন করেছেন।’

‘আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, নোবেল কমিটি এমন একজনকে এ পুরস্কারটি দিল, যার সাহিত্য বাদে অন্য ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিচিতি আছে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এমন একজনকে দেওয়া হয়েছে, যিনি গানের মানুষ এবং সঙ্গীতের প্রায় সব বড় বড় পুরস্কারই আছে তার অর্জনের খাতায়। বব ডিলানের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কোনো দরকার নেই বরং বিশ্ব সাহিত্যের একটি নোবেল পুরস্কার বড়ই দরকার। এ বছর আমরা সেটি পাইনি।’ নিবন্ধে বলেছেন আনা নর্থ।