মেইন ম্যেনু

কোনো দিন কোনো শিক্ষক জানতে চাননি

রিমি রুম্মান, নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে : স্কুল জীবনের কথা মনে করে আতঙ্কিত হই আজও। বন্ধের পর স্কুল খুলবে সেই আতঙ্কে কী ভীষণ ভীতসন্ত্রস্ত দিন কাটাতাম। অন্যদের কথা জানি না। তবে আমার এমনটি হতো। মনে আছে ক্লাস টুতে পড়ার সময় আমার পচা হাতের লেখার খাতাটি ম্যাডাম ক্লাসভর্তি সকলকে উঁচু করে দেখিয়ে বলেছিলেন, তোমরা কি কেউ বুঝতে পার এখানে কি লেখা আছে? সকলে একযোগে হো হো করে হেসে ওঠে। আর ছোট্ট আমি সেদিন লজ্জা–অপমানে আরও ছোট হয়ে গিয়েছিলাম। সেই সংকোচে নিজের ভেতরেই একরকম হীনমন্যতা কাজ করত। অন্যদের সঙ্গে মিশতে আড়ষ্ট হয়ে থাকতাম। পেছনের বেঞ্চিতে চুপটি করে বসে থাকতাম।

খ্রিষ্টান মিশনারি স্কুল শেষ করে যখন মাতৃপীঠ গার্লস হাই স্কুলে ভর্তি হলাম, সেখানেও ছিল ভয়াবহ আতঙ্ক। রওশন ম্যাডাম পড়া না পারলে বেত নিয়ে সামনে আসতেন। কখনো ডান হাত, কখনো বাঁ হাত মেলে ধরতে হতো। হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতো ভয়াবহভাবে। বুকের ভেতরটায় যেন কেউ খামচি দিয়ে ধরেছে। চোখ মুখ খিঁচে থাকতাম। অতঃপর ম্যাডাম তাঁর শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ঠাস ঠাস মারতেন। কয়েকদিন সেই হাত ফুলে থাকত। ব্যথায় গোঙাতাম সকলের অগোচরে। কখনো বা বারান্দায় রোদে দাঁড় করিয়ে রাখতেন এক পায়ে। পা যদি এক পলকের জন্যও মেঝেতে লাগত, অমনি উঠে এসে ঠাস ঠাস।

যেহেতু পড়া পারিনি বলে মার খাওয়া, তাই বাড়িতেও কাউকে বলা যেত না, এ অমানবিক নির্যাতনের কথা। সব শিশুর তো আর একই সমান মেধা কিংবা পড়া বোঝার ক্ষমতা থাকে না। আমি সেই কম বোঝা কিংবা দেরিতে বোঝা টাইপের ছাত্রী ছিলাম। তাই স্কুল জীবন আমার কাছে দুঃসহ যন্ত্রণাময় একটি জীবন ছিল। খুব দুঃখ কষ্ট নিয়ে আজ শিক্ষক দিবসে বলতেই হচ্ছে, ক্লাসের অন্যতম খারাপ ছাত্রীটির পাশে পরম মমতা ও নির্ভরতায় কোনো শিক্ষক এগিয়ে আসেননি। কোনো দিন কোনো শিক্ষক জানতে চাননি কেন পড়া পারছি না, কিংবা কি সমস্যা।

সেদিনের শিশু আমি আজ দুই সন্তানের মা।

এখানে নিউইয়র্কের স্কুলগুলোয় প্যারেন্ট-টিচার কনফারেন্স হয় বছরে তিনবার। প্রতিবার রিপোর্ট কার্ড হাতে নিয়ে ছেলের শিক্ষকদের সঙ্গে সেই সব মিটিংয়ে আমি তার হাতের লেখা নিয়ে আলোচনা করি। সপ্তম ক্লাসে পড়া বড় ছেলে রিয়াসাত, যার হাতের লেখা এত ছোট, যা পড়া ও বোঝা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব। খানিক বিরক্তি, উদ্বেগ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করি কেমন করে সে রাইটিংয়ে ৯৮% নম্বর পায়! কিন্তু শিক্ষকেরা প্রতিবারই আমায় আশ্বস্ত করেন এই বলে যে, এখন টাইপিংয়ের যুগ, হাতের লেখা নিয়ে এত চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া আমাদের বুঝতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তুমি যদি এটি নিয়ে তাকে মানসিক চাপে রাখ, তাহলে সে মূল বিষয়টি লিখতে ভুল করবে কিংবা অমনোযোগী হবে।

বছরের দুই মাস যখন স্কুলগুলোয় গ্রীষ্মের ছুটি থাকে, সেই সময়টাতে প্রতিটি পরিবার নিজেদের সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় করে যার যার মতো করে বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। কেউ শহরের ভেতরেই আনন্দ বিনোদনে সময় কাটায়। কেউবা দূরের শহরে। এই যে এত হই হুল্লোড়, লেখাপড়াবিহীন ঘুরে বেড়ানো, এর মাঝেও আমার ছয় বছরের ছোট্ট রিহান মাঝে মাঝেই উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করে যায় অবিরত, আমি স্কুলে যাব না? কখন আবার স্কুলে যাব? আমি আমার স্কুল মিস করি, টিচার মিস করি…।

এমন প্রশ্নে আমি আমার পেছনে ফেলে আসা সময়ের কথা ভাবি। আমার এমন একটি শৈশব প্রয়োজন ছিল, এমন কিছু স্মৃতি বড় বেশি প্রয়োজন ছিল, যেখানে আজ গর্ব করে বুক ফুলিয়ে বলতে পারতাম, আমি আমার স্কুল মিস করি, আমি আমার শিক্ষকদের মিস করি।

শিক্ষকদের ছায়ায়, পরম মমতায়, নির্ভরতায় ভালো থাকুক আমাদের শিশুরা।