মেইন ম্যেনু

কোন দিকে বিএনপি : সামনে না অদৃশ্যে ?

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর দলটি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে কয়েকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বি শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। জনগণের মাঝে দলটির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণীত হয়। অনেকেই মনে করেন বিরোধী দল থেকে সরকারী দলে পরিণত হওয়ার জন্য শুধুমাত্র কয়েক মাস পরের সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা বাকি ছিল। কিন্ত ’সেই’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি এবং যার ফলে ওলটপালট হয়ে যায় বিএনপির সব হিসাব নিকাশ। জনগণের ভোট চলে যায় নির্বাসনে; বিধ্বস্ত হয়ে যায় বিএনপি। তবে বিস্ময়কর যে এত বিশাল জনপ্রিয়তা থাকার সময়ে প্রতিষ্ঠার ৩৮তম বার্ষিকীতে এসে দলটি এখন অস্বাভাবিকভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দলটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না। কারণ দলটি এখন দীর্ঘতম সময় সরকারের বাইরে থাকার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দুরাবস্থায় রয়েছে।

বিশেষ প্রক্রিয়ার এবং সুদুর প্রসারী পরিকল্পনার দশম সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির শিকার হয়ে বিএনপি এখন সাঁতার না জানা মানুষের মত অথৈ জলে হাবুডুবু খাচ্ছে। ভোটহীন যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে তা মুলত বিএনপিকে টার্গেট করেই। যদিও এই টার্গেটে চুড়ান্ত প্রতিপক্ষ করা হয়েছে জনগণ বা ম্যান্ডেটকে, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে বিএনপি। যতদিন এ অবস্থা বিরাজমান থাকবে, বিএনপি ততবেশি দিশাহারা হয়ে যাবে। বিএনপির জন্য এখন পরিস্থিতি এমন যে রাজনীতি করতে হলে হয় জীবন হাতে নিয়ে রাজপথে আসো, জেল খাটো, ঘর ছাড়ো আর না হয় রাজনীতিটাই ছেড়ে দেও। দশম সংসদ নির্বাচনের সময় থেকে দুটো বিষয় স্পষ্ট হয়েছে: বিএনপি রাজনীতি করতে পারবে না এবং জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবে না। শুধু এ অবস্থা চলমান থাকলেই বিএনপিকে দৃশ্যত ‘অচল’ হয়ে থাকতে হবে।

তবে প্রশ্ন হতে পারে বিএনপি আজ যে বিপর্যয়ে পড়েছে তা কি এড়ানো যেত না ? এটা নিশ্চিত ছিল যে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি অংশ গ্রহণ করতো এবং আজকের এ পরিণতি ভোগ করতে হতো না। সংসদ নির্বাচনের ছয় মাস আগে অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনই তার প্রমাণ। কিন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকায় বিএনপি অনিবার্য আশঙ্কা থেকে সে নির্বাচন বয়কট করে। নেমে পড়ে নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলনে। সে আন্দোলনের কারণেই ১৫৩ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। বাকি আসনগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি সেদিনের মিডিয়ায় হাসি তামাশার খোরাক হয়েছিল। এরপরও যদি বলা হয় যে বিএনপি ভোট ঠেকাতে পারেনি তাহলে গণতন্ত্র ও নির্বাচনকে জনগণের সাথে সম্পর্কহীন হিসাবেই বিবেচনা করতে হয়। যে পরিকল্পনায় ম্যান্ডেটকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে ধরা হয়েছিল সে পরিকল্পনার প্রাথমিক বাস্তবায়নে বিএনপির এ পরিণতি অনিবার্য ছিল।

মুলত রাজনীতি থেকে বিএনপিকে মাইনাস করে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এখন খোদ রাজনীতিকেই মাইনাস করা হয়েছে। ম্যান্ডেটের তো প্রশ্নই আসে না। তাই বিএনপি এখন অঘোষিত নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল। বিগত সংসদ নির্বাচনের পর যেভাবে উপজেলা নির্বাচন, ঢাকা ও চট্রগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ওটাই এখন এদেশের নির্বাচনের মডেল। আর এ মডেল চলমান রাখা সম্ভব যদি বিএনপিকে নিষ্ক্রিয় কিংবা নিশ্চিহ্ন করে রাখা যায়। ইতোমধ্যে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বিএনপি এখন কর্মসূচিবিহীন অথচ বিবৃতিসর্বস্ব একটি রাজনৈতিক দলের নাম ছাড়া কিছু নয়। যত বেশি সক্রিয় কিংবা প্রথম সারির নেতা তত বেশি মামলা। শুধু বিরাজমান এ পরিস্থিতি ধরে রাখতে পারলেই বিএনপিকে বিলুপ্ত করে দেওয়া সম্ভব সেরুপ ভিশন প্রতিপক্ষের মনে তৈরি হতেই পারে।

বিএনপির শক্তির প্রধান উৎস জনগণ। সেই জনগণের উপর ভর করেই বিএনপি সরকারে ফিরে আসতে চেয়েছিল। কিন্ত সেই জনগণকেই ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে দশম সংসদ নির্বাচনে। সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি । আগামীতে সবগুলো আসনে ভোট না হলেও সরকার গঠনে আইনগত সমস্যা হবে না। আবার যে নির্বাচনে জনগণের ভোট জয় পরাজয়ে কোনো প্রভাব রাখবে না সেরুপ নির্বাচনে বিএনপির সুদিন ফিরবে না। অন্যদিকে বিএনপির অংশগ্রহণ করা না করাতে নির্বাচন ও সরকার গঠনেও কোনো সমস্যা হবে না। এভাবে যদি বিএনপিকে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা প্রতিদন্দ্বিতার বাইরে রাখা যায় কিংবা জনমতের প্রতিফলন এড়ানো ভোট সম্ভব হয় তাহলে রাজনীতির সাথে সাথে দলটিও অদৃশ্যমান হয়ে যাবে।

এখন এ অবস্থায় কি করতে পারে বিএনপি? হয় সামনে আসা, না হয় দৃশ্যের বাইরে যাওয়া। বিলুপ্তি কখনোই সম্ভব হবে না কারণ বিএনপির যে জনসমর্থন তা প্রতিপক্ষের দিকে চলে যায়নি। রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কারণেই তা যাবে না। কিন্তু এই বিশাল জনসমর্থন দিয়ে বিএনপি কি করবে যদি দেশে ভোটের রাজনীতি ফিরে না আসে? আবার ভোটের রাজনীতি এদেশে আপাতত আর ফিরবে না যদি বিএনপি ফেরাতে না পারে। কারণ বিএনপির প্রতিপক্ষ ততদিনই এভাবে টিকে থাকবে যতদিন ভোট না ফেরে। লড়াইটা এখন সুস্পষ্ট। একপক্ষ জনগণবিহীন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পক্ষে এবং অন্য পক্ষ জনগণের ভোটের পক্ষে। একপক্ষে রাষ্ট্রের সকল শক্তি; অন্যপক্ষে শুধু নিরব জনমত।

রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে রাষ্ট্রের জনগণ টিকতে পারে না। তা কখনোই কাঙ্খিত নয়। অন্যদিকে রাজপথ ছাড়াও রাজশক্তির অপব্যবহার বন্ধ করা কিংবা দখলমুক্ত করা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় যে জনগণকে ভোট দেয়ার জন্য ঘর থেকে বের হতে হয়নি সেই ঘুমন্ত জনগণকে ভোটের মাঠে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানোর মত পরিস্থিতি তৈরি না করা পর্যন্ত বিএনপির পুনরুত্থান সম্ভব নয়। যদিও বিএনপির প্রতিপক্ষ এখন দলটির ’বিলুপ্তি’ ছাড়া আর কিছুই ভাবছে না। শেরে বাংলা নগরের মাজারটিও স্থানান্তরের হুমকিতে আছে।