মেইন ম্যেনু

“ক্যান্সারের রিপোর্ট যেন ভুল না হয়, মানুষের মনে এই ভালোবাসা দেখে চলে যেতে চাই…”

‘ইউনিভার্সিটিতে থাকতে একবার জ্বরজ্বর ভাব দেখে ব্লাড টেস্ট করালাম। বায়োকেমিস্ট্রির ছাত্র হিসেবে জানতাম, হোয়াইট ব্লাড সেলের নরমাল সর্বোচ্চ রেঞ্জ ১১০০০। রিপোর্ট হাতে নিয়ে হোয়াইট ব্লাড সেল কাউন্ট দেখি ১১১০০০। মাথা চক্কর দিয়া মাটিতে পড়ে গেলাম। বন্ধু মুখে পানি ছিটাইয়া জিগাইল, কি হইছে? কইলাম, দেখছ না ১১১০০০? এক লাখের উপ্রে। আমি শেষ, আমার লিউকেমিয়া (ব্লাড ক্যান্সার)!!

বন্ধুর থেকে খবর পেয়ে মা পুরো গ্রামে ২০ গরু খাওয়াইয়া দিল। পরদিন আবার রি-চেক করতে কাঁপতে কাঁপতে ব্লাড টেস্ট করতে গেলাম। টেকনিশিয়ান হাত থেকে আগের রিপোর্টটা নিয়ে কলম দিয়া ১ একটা কেটে দিয়ে কইল ‘পেন মিসটেক’। ঐদিকে ২০ গরু শেষ, আরেকটু হইলে আমিও শেষ।

আরেকটা শুনেন, Akhter ভাইয়ের বাপের টিউমার বায়োপসি করে কইল ক্যান্সার, সময় শেষ। পিজি, আনোয়ারা নামিদামি সবাই বোর্ড বসিয়ে একই সিদ্ধান্ত দিল। কেমো দিয়ে বেচারার মাথার গায়ের লোম সব ফেলে দিল। কয়েক মাসেও মৃত্যুর দেখা নাই। পরে আখতার ভাই সেই সেম্পল অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে পরীক্ষা করে দেখল, ক্যন্সার নাহ। ওনার বাপ মাশাল্লাহ বহু বছর পর নরমাল মৃত্যু বরণ করলেন।

তাই কালকে আরও কয়েকজায়গায় টেস্ট করতে দেবো। আমার প্রোস্টেট এবং কিডনির মারাত্মক সমস্যা থাকতে পারে, তবে মন বলছে ক্যান্সার না।’

কথাগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষের, বিশেষ করে প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশীদের অত্যন্ত প্রিয় মানুষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসূফের। তিনি বিমানবন্দরে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাত্রীসেবার ধারণা পাল্টে দিয়েছেন। একটা সময় মানুষের ধারণা ছিল, এই বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করা মানে লাগেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় কোন না কোন হয়রানি হবেই। কিন্তু মুহাম্মদ ইউসূফ দাঁড়িয়ে গেলেন এসবের বিরুদ্ধে। একদিনে হয়নি। এক একটি দিন গেছে, আর মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। হয়রানির শিকার যে কোন মানুষ বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গেলে সাথে সাথে তার সমাধান পান। যাত্রীদের লাগেজ হাতিয়ে নেয়া চক্রকেও আইনের হাতে সোপর্দ করতে করতে কোণঠাসা করে ফেলেছেন। তাই বিমানবন্দরে লাখ লাখ প্রবাসীর আস্থার নাম ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউসূফ। সেই ম্যাজিস্ট্রেটেরই যখন ক্যান্সারের খবর শোনা যায় তার নিজের মুখ থেকে তখন লাখো হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

সেই রক্তক্ষরণ থামাতে ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফের নিজেকেই আবার সান্ত্বনা নিয়ে হাজির হতে হলো। ক্যান্সারের আশঙ্কা নিয়েই যেন অন্যদের সাহস দিতে এসেছেন তিনি।

‘আমার ধারনা আমার ক্যান্সার হয়নি। একটা রিপোর্ট কি বলল, আর তাতেই আমি মরে যাবো? আর যদি ক্যান্সার হয়ও, ডোন্ট অরি, আমিই ক্যান্সারকে মেরে ফেলবো। তার সাথে কি আছে? আমার সাথে আপনাদের ভালবাসা আছে। সুখের বিষয় হল, প্রোস্টেট ক্যান্সার মানুষকে মারতে পারে না। আইএসের মত এত নির্মম না 🙂 পাকিস্তানিদের মত হুমকি ধামকি দেয়াই হেতের দৌড়।তাছাড়া এই রিপোর্ট আমি অথেনটিক মনে করিনা।’

কিন্তু সেবা দিয়ে যে লাখো মানুষের ভালোবাসা তিনি অর্জন করেছেন, তারা তো আর এসব কথাতে আশঙ্কামুক্ত হতে পারে না। তারা ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফকে বাঁচাবে। প্রবাসে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশী যে যার জায়গা থেকে তার জন্য এবার একটা কিছু করতে চায়। মানুষের সেই উপচে পড়া ভালোবাসায় আবারো নিজের অবস্থান ঘোষণা করতে হলো ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফকে। বললেন,

‘যেহেতু আমার এখনও ডায়াগনোসিস ও পুনঃডায়াগনোসিস চলছে, সেহেতু এ পর্যায়ে কোন ধরণের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন নেই। চিকিৎসা পর্যায়ে চিকিৎসাব্যয় নির্ধারণের পর যদি তা আমার সাধ্যের বাহিরে হয়, জানাবো। আপাততঃ দোয়া প্রয়োজন। অর্থের প্রয়োজন নেই।’

কিন্তু মানুষের উৎকন্ঠা দূর করতে পারেননি তিনি। সবাই যে যার মতো করে তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করছেন। উদগ্রীব হয়ে আছে যদি তার জন্য কিছু করা যায় সেই আশায়। শনিবার গভীর রাতে শারীরিক অবস্থা নিয়ে কথা হলো ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফের। তিনি জানালেন, গত ঈদের কয়েকদিন আগে থেকে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। সব লক্ষণ বিবেচনা করে ডাক্তার পিএসএ টেস্ট করেন। দেখা গেলো প্রোস্টেট এর মাত্রা অনেক বেশি। এর মধ্যে কোমড়ের ভেতরের অংশে ব্যথা বেড়ে গেলো। ডাক্তার ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফকে বায়োপসি করতে বললেন। তার প্রোস্টেট ফেলে দিতে হবে। কারণ, এটা থাকলে ক্যান্সার হাড়ে ছড়াতে পারে।

কিন্তু এসব আশঙ্কায় ভয় পাবার পাত্র নন ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফ। কারণ তিনি নিজেও একজন বায়োকেমিস্ট। তার শারীরিক বিভিন্ন লক্ষণ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন তিনি। তারপর বসলেন একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে। ডাক্তারের সাথে রোগের লক্ষণ নিয়ে ঘন্টা তিনেক ধরে আলোচনা চললো। ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফ ডাক্তারকে বললেন, তার রক্তক্ষরণের সমস্যা ক্যান্সারের কারণে নাও হতে পারে। কারণ, এর আগে তার একবার বাইপাস সার্জারী করা হয়েছে। তার প্রভাবে এটা যদি ক্যান্সার না হয়ে ‘টিবি’ হয়, তাহলে রক্তক্ষরণ হতে পারে। তার কথা শুনে মনে হয় ক্যান্সারের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে নেমেছেন ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফ। এরই মধ্যে এমআরআই-সহ ২৩টি টেস্ট করতে দেয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুর যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বিশ্বাস করেন, ক্যান্সারকে জয় করে সেখান থেকে বীরের বেশেই ফিরবেন তিনি।

ক্যান্সার যদি নাও হয় তবুও এই চিকিৎসা শেষ করে আসতে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা খরচ হবে। টাকা-পয়সা যোগাড় হলেই, সন্তানদের পরীক্ষা আর ছুটির বন্দোবস্ত করে ২৮ জুলাই বা তার আগেই সিঙ্গাপুর যেতে চান ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফ। এত মানুষ তাকে সহযোগিতা করতে চাচ্ছে কিন্তু তিনি নিচ্ছেন না কেন? এর উত্তরে ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফ বললেন-

‘লাগলে আমি সরাসরি চাইবো। এখন টাকা-পয়সা উঠালে অনেক কথা হবে। পরে সবাইকে অনেক অবদান রাখতে হবে। ৭/৮ লাখ টাকা খরচ হওয়ার পরও যদি আমার ক্যান্সারই নিশ্চিত হয় এবং সেখানে থাকতে হয়- তখন কেউ যদি আমাকে বাঁচাতে চায় তাহলে প্রয়োজনে তখন সহযোগিতা নেয়া যেতে পারে। খরচ কমানোর জন্য এখানে কিছু পরীক্ষা করে নিচ্ছি। এখন টাকা নেবো, পরে দেখা গেলো টাকাটা লাগলো না- তখন কি করবো!‘

প্রোস্টেট ক্যান্সার বা ক্যান্সারের আশঙ্কা নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ইউসূফের এসব কথা শুনতে শুনতে তাকে নিয়ে হাজারো মানুষের উৎকন্ঠার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন-

‘বিমানবন্দরে আমি তো শুধু আমার দায়িত্বটাই পালন করেছি। অনেকে আমাকে চিনতোও না। আমার এই ক্যান্সারের খবর জানার পর হাজারো মানুষ আমাকে মেসেজ পাঠায়, মন্তব্য করে, একাউন্ট নম্বর চায়। আমেরিকা থেকে একজন ফোন করে বলেছেন, দেশে এসে আমাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাবেন। একজন ফোন করে জানালেন, আমার সুস্থতার জন্য রোজা করতে শুরু করেছেন তিনি। এমন ঘটনা ঘটছে শত শত, হাজার হাজার। আমি তো এসব পড়ি আর কাঁদি। মানুষ এত ভালোবাসে! এখন মনে হচ্ছে, আমার ক্যান্সারের রিপোর্ট যেন ভুল না হয়। আমার ক্যান্সারই হোক। এই ভালোবাসা থাকতে থাকতেই চলে যেতে চাই। যদি বেঁচে যাই তাহলে এই ভালোবাসা আবার কমে যায় কি না!’

সৌজন্যে : প্রবাস কথা