মেইন ম্যেনু

‘ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নতি দেখে আমি মুগ্ধ’: স্টিভ ওয়াহ

অস্ট্রেলিয়ার তো বটেই, অনেকের চোখে তিনি সর্বকালেরই অন্যতম সেরা অধিনায়ক। কারও চোখে তিনি ক্রিকেট দার্শনিক। তবে স্টিভ ওয়াহ এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। ব্যস্ত নিজের চ্যারিটি আর লেখালেখি নিয়েও। বেঙ্গালুরুর রিটজ-কার্লটন হোটেলে সেই স্টিভ ওয়াহর মুখোমুখি উৎপল শুভ্র। দীর্ঘ আলাপচারিতায় বড় ওয়াহ নিজের খেলোয়াড়ি জীবনের বাইরেও কথা বলেছেন সর্বকালের সেরা দল, টেন্ডুলকার-লারা, ওয়ার্নের সঙ্গে তিক্ততা ও বাংলাদেশ নিয়ে—

উৎপল শুভ্র: আপনার মতো ক্রিকেটারদের বেশির ভাগই যেখানে ধারাভাষ্য হোক বা কোচিং, ক্রিকেটের সঙ্গেই থাকেন, সেখানে আপনি কিনা হয়ে গেলেন ব্যবসায়ী…

স্টিভ ওয়াহ: যখন খেলতাম, তখন থেকেই ব্যবসা, চ্যারিটি, বই লেখা ক্রিকেটের বাইরের এমন সব বিষয়ে আমার আগ্রহ ছিল। তখন থেকেই আমি ক্রিকেট-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। আমার পরিবার আছে, তিনটি সন্তান আছে। এ কারণেই ঠিক করেছিলাম, আমি ক্রিকেটের সঙ্গে থাকব না। নইলে খেলা ছেড়ে লাভ কী হলো? আমি পরিবারকে সময় দিতে চাই, আমার চ্যারিটি নিয়ে কাজ করতে চাই। অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে আমার চ্যারিটি নিয়ে ব্যস্ত হতে চেয়েছি। ব্যবসা করার আগ্রহটাও ছিল। তবে ক্রিকেটের কথা যদি বলেন, এমসিসি ও অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের হয়ে কিছু কাজ করেছি। মেন্টর হিসেবেও। ক্রিকেট থেকে একেবারে হারিয়ে গেছি, তা বলা যাবে না।
শুভ্র: সর্বকালের অন্যতম সেরা একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আপনি, আপনার নিজের দৃষ্টিতে কী উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি) রেখে গেছেন?
স্টিভ ওয়াহ: আমি ঠিক জানি না, একে লিগ্যাসি বলা যায় কি না, আমি অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়দের অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠায় অনেক বড় ভূমিকা রেখেছি। সফরে যেন ক্রিকেটাররা পরিবারের সান্নিধ্য পান, এটাও নিশ্চিত করেছি। শুধু খেলার কথা যদি বলেন, সেটি হবে সব সময় জেতার জন্য খেলা, ইতিবাচক খেলা। দর্শক-সমর্থকদের কথা ভেবেছি। সবার মধ্যে এই বোধটা জাগিয়েছি, ব্যাগি গ্রিন মাথায় দিতে পারাটা একটা সৌভাগ্য।
শুভ্র: ১৯৯৯ বিশ্বকাপে আপনারা নতুন কিছু জিনিস শুরু করেছিলেন। জার্সিতে নম্বর দেওয়া, ক্যাপের পেছনে নম্বর দেওয়া। প্রতি ম্যাচের আগে দলের সবাইকে কবিতা লিখতে বলা। ফাইনালের আগে লিখেছিলেন আপনি, প্রথম লাইনটা বোধ হয় ছিল, ‘চলো, শোয়েব আখতারের পশ্চাদ্দেশে লাথি মেরে শুরু করি।’ এর সবই তো ছিল গতানুগতিক চিন্তাভাবনার বাইরে!
স্টিভ ওয়াহ: (হাসি) ঠিক কবিতা বলব না, অনুপ্রেরণামূলক কিছু লেখা আর কী! আইডিয়াটা ছিল আমাদের ফিটনেস ট্রেনারের। তো আমি ভাবলাম, শুধু অধিনায়ক কেন, সবাই সবাইকে অনুপ্রেরণা দিই। আর জার্সি-ক্যাপে কে দেশের কত নম্বর টেস্ট বা ওয়ানডে ক্রিকেটার, সেটি তো এখন সব দেশই করে। এটা আমার অনেক গর্বের বিষয়। এ ছাড়া অভিষিক্তদের আয়োজন করে ব্যাগি গ্রিন দেওয়াটাও আমিই ঘটা করে শুরু করেছিলাম। আরেকটি বিষয় মানুষ ভুলেই গেছে, হাতের উল্টো দিক দিয়ে স্লোয়ার বল করা। এটা তো আমারই আবিষ্কার।
শুভ্র: আমার মনে আছে। ১৯৮৭ বিশ্বকাপে ডেথ ওভারে স্লোয়ার বল করে আপনি মাত করে দিয়েছিলেন। আপনাকে ‘আইসম্যান’ বলা শুরু হলো তখনই…
স্টিভ ওয়াহ: হ্যাঁ, এখন তো প্রায় সবাই স্লোয়ার বল করে। তাদের অনেকেই জানে না, আমিই এটি প্রথম করেছি। এটাও আমার জন্য অনেক গর্বের। কারণ সবাই আমাকে ব্যাটসম্যান হিসেবেই দেখে, কিন্তু বোলার হিসেবেও আমার অবদান আছে।
শুভ্র: আপনি ব্যাগি গ্রিনের মহিমার কথা বললেন। কিন্তু ইয়ান চ্যাপেলের মতো কেউ কেউ এটাকে আদিখ্যেতা মনে করেন। চ্যাপেল তো এমনও বলেছেন, নিজের ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ কোথায় ছুড়ে ফেলেছেন, তা জানেনও না…
স্টিভ ওয়াহ: আমি তাঁদের কথাকে পাত্তা দিই না। আমার ক্যারিয়ারজুড়েই এমন কয়েকজন সব সময় নেতিবাচক কথা বলে গেছেন। আমি জানি না তাঁদের সমস্যাটা কী, ঈর্ষা নাকি অন্য কিছু। হয়তো আমি তাঁদের কাছ থেকে খুব বেশি উপদেশ চাইনি। আমি সব সময় নিজের মতো চলেছি, নিজেই নিজের পথ তৈরি করতে চেয়েছি। আমি চেয়েছি কোনো ভুল করলে সেটি যেন আমার নিজেরই ভুল হয়, অন্য কারও করা ভুল যেন নতুনভাবে না করি। এটা সবার ভালো না-ও লাগতে পারে। আমার ধারণা, ব্যাগি গ্রিন সব সময়ই বিশেষ কিছু হয়ে থাকবে। আমার সময় তো বটেই, এখন নতুন ছেলেরাও সেই ধারা বজায় রেখেছে। গর্ব করার মতো একটি ট্র্যাডিশন তৈরি করেছি আমি। অন্য দলগুলো কীভাবে এটি দেখে, তা-ও জানি। তাদের নিজেদের এ রকম কিছু নেই, এ নিয়ে তারা অবশ্যই হতাশ।
শুভ্র: এটির বোধ হয় একটা প্রতীকী অর্থও আছে। আমি দেশের জন্য খেলছি, নিজের সেরাটা ঢেলে দিতে হবে, এসব মনে করিয়ে দেয়…
স্টিভ ওয়াহ: অবশ্যই। এসব প্রতীক, রং, নাম সবকিছু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর মানে আপনি বড় কিছুর অংশ। আপনি দলবদ্ধ হয়ে কিছু করলে সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, আর এর সঙ্গে একটি প্রতীক যুক্ত হলে সেটি আরও শক্তিশালী হয়ে যায়। প্রতিপক্ষের কাছে আপনাকে আরও দুরূহ মনে হয়। আপনি কিসের জন্য খেলছেন, এসব প্রতীক দিয়েই তা বোঝা যায়।
শুভ্র: এবার আপনার দল নিয়ে শুনতে চাই। মার্ক টেলরের সময়ই অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের এক নম্বর দল। নিজে দায়িত্ব পেয়েই প্রথমে কী করেছিলেন? বড় অধিনায়কেরা তো দলে তাঁর নিজের ছাপ রাখতে চায়…
স্টিভ ওয়াহ: আমি প্রথমেই ডেড রাবারে হেরে যাওয়ার অভ্যাসটা দূর করতে চেয়েছি। দেশে তো বটেই, দেশের বাইরেও প্রতিটি ম্যাচই জেতার লক্ষ্য ঠিক করেছি। এর আগে সবাই বলত, আপনি সব টেস্ট জিততে পারবেন না। আমরাই প্রশ্ন করলাম, কেন নয়? কেউ পারবে না বললেই মেনে নিতে হবে নাকি! নিজেরাই একটা বেঞ্চমার্ক সৃষ্টি করতে চেয়েছি। চেয়েছি, সবকিছুই একটু ভিন্নভাবে করতে। এসব পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন জন বুকানন। আমিই তাঁকে কোচ হিসেবে চেয়েছিলাম। কারণ আমি জানতাম, দলে অনেক নতুন খেলোয়াড় আসবে। পরের ধাপটায় যেতে তাঁকেই আমাদের দরকার ছিল।
শুভ্র: আপনার দলে তো অনেক গ্রেট খেলোয়াড় ছিলেন। আর গ্রেট প্লেয়ার মানেই ইগো। এত তারকার ইগো সামলানোটাই কি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল?
স্টিভ ওয়াহ: হ্যাঁ, অবশ্যই। এর আগেও অনেক দারুণ সব দল ছিল, যারা এটা পারেনি বলে সফল হয়নি। চ্যালেঞ্জের বড় একটা অংশই ছিল সবাই সন্তুষ্ট, এ ব্যাপারটি নিশ্চিত করা। সবার মনোযোগ এক দিকেই আছে কি না। মাঝেমধ্যে নিজের ইগোকেও পাশে সরিয়ে রাখতে হয়। দলের সিনিয়রদের সহযোগিতা খুব দরকার হয়। আমি যেটা করেছি, দলে একজন না, দশজন সহ-অধিনায়ক সৃষ্টি করেছিলাম। ওরা ছিল আমার চোখ ও কান। দলে কোনো সমস্যা হলে যেন সেটা আমার নজর না এড়ায়। দল সামলাতে হলে অন্যদের সহযোগিতা লাগবেই। কিন্তু দিন শেষে আপনাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কঠিন সিদ্ধান্তগুলো জানাতে হবে।
শুভ্র: কাকে সামলাতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়েছে?
স্টিভ ওয়াহ: আমি এ প্রশ্নের উত্তর দেব না। আমি দলের খেলোয়াড়দের দুই ভাগে ভাগ করতাম। একটা দল যাদের দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। আরেকটা দল যাদের কম। কারও কারও ক্ষেত্রে একটু বাড়তি মনোযোগ কিন্তু লাগেই। এটাই ভালো, একটা দলে সব ধরনের খেলোয়াড়ই থাকতে হয়। সবাই এক রকম হলে হবে না, এমন কিছু খেলোয়াড় থাকা উচিত, যারা আপনাকে প্রশ্ন করবে। এটা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই সত্যি, সবাই আপনাকেই সমর্থন করবে না। তবে বিভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনা একটা জায়গায় এসে মিলতে হবে। শেষ পর্যন্ত সবাই একই জিনিস চাইছে কি না, সেটাই আসল কথা।
শুভ্র: আপনার ক্যারিয়ারের শুরু তো অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ঘোর দুঃসময়ে। সেই সময়ে একের পর এক পরাজয়ের অভিজ্ঞতা কি আপনার অধিনায়কত্বে কোনো সাহায্য করেছে?
স্টিভ ওয়াহ: অবশ্যই। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিল। টেস্ট ক্যারিয়ারে আমার প্রথম জয় পেয়েছি ১৩তম টেস্টে। ২৬ টেস্ট পর প্রথম সেঞ্চুরি পেয়েছি। আমার প্রথম চার বছর ভয়াবহ কেটেছে। তখন আমরা এমন হেরে চলেছি যে, সমর্থকেরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। ওই সময়টা আমি কখনো ভুলিনি। চাইনি, সেটি আবার কখনো ফিরে আসুক। আমি তাই কখনোই আত্মতৃপ্তিতে ভুগিনি, কখনোই কোনো ঢিলেমি আসেনি আমার মধ্যে। কখনো কখনো ভালো হতে চাইলে সবচেয়ে খারাপটা দেখে নেওয়া ভালো, ক্যারিয়ারের শুরুতে আমি তা যথেষ্ট দেখেছি।
শুভ্র: এবার ব্যাটসম্যান স্টিভ ওয়াহ নিয়ে কথা বলি। অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকদের মুখে শুনেছি, তরুণ বয়সে আপনি নাকি খুব মেরে খেলতেন। টেস্ট ক্যারিয়ারের শুরুতেও ওভাবেই খেলতেন। কিন্তু আমরা যে স্টিভ ওয়াহকে দেখেছি, তিনি তো অন্য রকম। পুল-হুক বলতে গেলে করতেনই না…
স্টিভ ওয়াহ: এটিকে বলতে পারেন, কমন সেন্স প্রয়োগ করার ব্যাপার। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পেস অ্যাটাকের তুঙ্গ ওই সময়টায় পুল-হুক করতে গেলে হয় আপনি আহত হবেন বা খুব দ্রুত আউট হয়ে যাবেন। আমি তাই ওসব খেলা ছেড়ে দিয়েছিলাম। প্রথম দিকে আমি দর্শকদের কথা ভেবে খেলতাম। দ্রুত রান নিতাম, ছক্কা মারতাম। কিন্তু ওভাবে খেলে বড় রান পাচ্ছিলাম না। তবে ক্যারিয়ারের শেষ দিকে কিন্তু আমি আবারও সেই তরুণ বয়সের মতো খেলতে শুরু করেছিলাম। মাঝে মাঝে ভাবি, পুল শট খেলাটা চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল, কারণ শটটা আমি ভালোই খেলতাম। তবে একটি রুটিনে ঢুকে পড়লে তা বদলানো খুব কঠিন। বিশেষ করে পুল-হুক বাদ দিয়ে যখন রান করতে শুরু করলাম, তখন আর খেলায় খুব বেশি পরিবর্তন আনতে চাইনি।
শুভ্র: আমি আপনাকে যেমন পছন্দ করতাম, তেমনি মার্ক ওয়াহকেও। অবশ্যই ভিন্ন কারণে। আপনাকে ব্যাটিংয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আর হার না-মানা মানসিকতার জন্য। মার্কের ক্ষেত্রে মনে হয় কারণ বলার দরকার নেই। কিন্তু আপনার কি কখনো মনে হয়নি, ইশ্‌, যদি মার্কের মতো ব্যাটিং করতে পারতাম! মার্ক ওয়াহর ব্যাটিং দেখে মনে হতো, ব্যাটিং এত সহজ!
স্টিভ ওয়াহ: না, মার্কের ব্যাটিং আসলে সহজ ছিল না। দেখতেই মনে হতো সহজ। ছোটবেলায় আমরা দুজন যখন একসঙ্গে খেলতাম, তখন কিন্তু আমিই বেশি দ্রুত রান করতাম। আমি খেলার ধরন বেশি পাল্টেছি। কে জানে, মার্কেরও মনে হয়ে থাকতে হতে পারে, ‘ব্যাটিংয়ের ধরন একটু পাল্টালে আমি হয়তো আরও বেশি রান করতে পারতাম। তা হয়তো দৃষ্টি সুখকর হতো না, কিন্তু রান তো…। শেষ দিকে ও কিন্তু একটু পরিবর্তন এনেছিল। আরেকটু আগে তা করলে হয়তো আরও কিছু রান পেত। তবে তখন সে আর একই ব্যাটসম্যান থাকত না। আমার ব্যাটিং অবশ্যই ওর মতো দৃষ্টিনন্দন ছিল না। তবে দিন শেষে কিন্তু কথা একটাই—রান এল কি না। আর একটা দল আক্রমণাত্মক আকর্ষক ক্রিকেট খেলতে চাইলে সব ধরনের ক্রিকেটারই দরকার।
শুভ্র: ধরুন, আশির দশকের ওই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিপক্ষে আপনার দলের খেলা হলো, কে জিতত?
স্টিভ ওয়াহ: দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো। ম্যাচগুলো খুব ক্লোজ হতো। তবে এটা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। কোথায় খেলা হচ্ছে, পিচ কেমন। ৯০ মাইল গতিতে চারজন ফাস্ট বোলার বল করছে, হেলমেট ছাড়া তাঁদের খেলা যা-তা কথা নয়। আর তখন তো বাউন্সার দিতেও কোনো বাধা ছিল না। আমার ধারণা, হেলমেট-যুগে ও বাউন্সার বাধ্যবাধকতার সময়ে আমরাই জিততাম। আর ওসব কিছু না থাকলে ওয়েস্ট ইন্ডিজকেই হয়তো এগিয়ে রাখতে হবে।
শুভ্র: আপনি তো ক্রিকেটের ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্র। আপনাকে যদি ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ৩টি দল বেছে নিতে বলি…লোকে ১৯২১ সালের ওয়ারউইক আর্মস্ট্রংয়ের টিমের কথা বলে, ১৯৪৮ সালে স্যার ডনের ‘দ্য ইনভিন্সিবলস’ আসে, আশির দশকের ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এর পর আপনার দল…
স্টিভ ওয়াহ: খুব কঠিন প্রশ্ন। আশির দশকের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আমি দেখেছি, টানা পনেরো বছর অপরাজিত ছিল তারা। ২২ বছর আমরা ওদের হারাতে পারিনি। অবিশ্বাস্য এক রেকর্ড! তত দিনে নিরপেক্ষ আম্পায়ার চলে এসেছে, তার পরও আমরা অনেক দিন তাদের হারাতে পারিনি, এতেই প্রমাণ হয় তারা কতটা ভালো ছিল। এই দলটি নিশ্চয়ই সেরাদের মধ্যেই থাকবে। ১৯৪৮ সালের অস্ট্রেলিয়ার কথা বললেন…১৯২১ সালের অস্ট্রেলিয়ান দল…কে জানে! এগুলোর মধ্যে বেছে নেওয়া খুব কঠিন। এই বিচারের ভারটা তাই অন্যদের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি। তবে এটা বলতে পারি, আমি যে দলটিতে খেলেছি, সেটি যেকোনো দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারত।
শুভ্র: ব্যাটসম্যান হিসেবে আপনার খেলা সবচেয়ে কঠিন স্পেল কোনটি?
স্টিভ ওয়াহ: পার্থে (কার্টলি) অ্যামব্রোস ও (ইয়ান) বিশপ। লেংথ থেকে বল ফণা তুলে উইকেটের ৩০ মিটার পেছনে চলে যাচ্ছিল। সম্ভবত প্রথমবারের মতো ব্যাট করতে নেমে আমার মনে হয়েছিল, আমি কীভাবে রান করব! অ্যামব্রোস তখন নিজের সেরা সময়ে, পার্থের ওই বাউন্সি পিচ, অন্য প্রান্তে বিশপ…পিঠের ইনজুরিতে না পড়লে যে হতো সর্বকালের সেরাদের একজন।
শুভ্র: নির্দিষ্ট কোনো উইকেট বা বিশেষ কোনো দিনে নয়, সব মিলিয়ে আপনার খেলা কঠিনতম বোলার কে?
স্টিভ ওয়াহ: খুব, খুব কঠিন প্রশ্ন। অ্যালান ডোনাল্ড দারুণ ছিল, আকরাম ও ইউনিস—দুর্দান্ত এক কম্বিনেশন। আমি যখন শুরু করি, ম্যালকম মার্শাল তখনো দুর্দান্ত। হয়তো সেরা সময় পার করে এসেছেন, তার পরও। অ্যামব্রোস…একজন কার কথা বলি, আবদুল কাদিরও দারুণ এক বোলার ছিলেন। প্রথম দিকে তাঁর বলে আমি হাবুডুবু খেয়েছি, কিছুই বুঝতে পারতাম না। তবে যদি একজনকে বেছে নিতেই হয়, আমি বলব অ্যামব্রোস।
শুভ্র: ঠিক জানি না, আমার সঙ্গে একমত হবেন কি না, অনেকে শেন ওয়ার্নকে যে লেগ স্পিনকে পুনর্জন্ম দেওয়ার কৃতিত্ব দেন, আমার মতে তা আবদুল কাদিরের প্রাপ্য। ওয়ার্ন লেগ স্পিনকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া লেগ স্পিনকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন কাদির…
স্টিভ ওয়াহ: হ্যাঁ, তাঁর আরও কৃতিত্ব প্রাপ্য। সে ছিল গ্রেট বোলার। আপনি ঠিকই বলেছেন, কাদির ছিল জাদুকরের মতো, বল অনেক টার্ন করাতে পারত, মুহূর্তের মধ্যে ঘুরিয়ে দিতে পারত ম্যাচ। অন্যদিকে বল ঘুরিয়ে মুরালি যেমন অফ স্পিনকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে কোনো একজন বোলার যদি খেলাটা পুরো বদলে দিয়ে থাকে, সেটি হলো শেন (ওয়ার্ন)। আবদুল কাদিরের পর ও লেগ স্পিনকে নতুন একটা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তবে আবদুলও অসাধারণ এক বোলার ছিলেন।
শুভ্র: আপনার কী মনে হয়, ব্যাটসম্যান হিসেবে আপনি প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি? শচীন টেন্ডুলকার বা ব্রায়ান লারার সঙ্গে তো আপনার নাম সেভাবে বলা হয়নি…
স্টিভ ওয়াহ: ইন্টারেস্টিং! টেন্ডুলকার ও লারা যখন তাদের সেরা সময়ে, আমার রেকর্ডও ওদের সমতুল্য ছিল। কখনো কখনো হয়তো আরও ভালো। ৯৫ টেস্টে আমি বিশ্বের নাম্বার ওয়ান ব্যাটসম্যান ছিলাম। ওরা যখন খেলছিল, তখন প্রায় দুই বছর আমি র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। তার পরও লোকে ওদের কথাই বেশি বলত হয়তো ওদের খেলার ধরনের কারণে। তবে আমি রান করতে পেরেই খুশি ছিলাম। আমি ওদের সময়ে খেলতে পেরে খুশি। ওরা নিজেদের দলের জন্য যা করত, আমিও আমার দলের জন্য ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম।
শুভ্র: একটা ক্লিশে প্রশ্ন করি, টেন্ডুলকার-লারার মধ্যে আপনার কাকে পছন্দ ছিল?
স্টিভ ওয়াহ: আবারও একটি কঠিন প্রশ্ন। ওরা দুজনই ছিল দুর্দান্ত। দুজনই গ্রেট প্লেয়ার। এমনকি প্রতিপক্ষ দলে থাকলেও ওদের ব্যাটিং উপভোগ করতে আপনি বাধ্য। আমার ধারণা, কঠিন সময়েই নিজের সেরাটি বের করে আনার ক্ষমতা ছিল লারার, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিজের খেলাটাকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে যেত, তবে টেন্ডুলকারও তা-ই। আমি আসলে এভাবে কাউকে বেছে নেওয়ার ব্যাপারটি পছন্দ করি না।
শুভ্র: গত কিছুদিন বাংলাদেশের খেলা দেখেছেন, খোঁজখবর রাখেন?
স্টিভ ওয়াহ: হ্যাঁ, গত এক যুগে বাংলাদেশের উন্নতি দেখে আমি মুগ্ধ। তবে আমি চাই, ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টির বদলে ওরা টেস্ট ক্রিকেটে আরও মনোযোগ দিক। বাংলাদেশকে উন্নতি করতে চাইলে অবশ্যই টেস্টে ভালো করতে হবে। তরুণদের বোঝাতে হবে, টেস্ট ক্রিকেটই আসল ক্রিকেট, টি-টোয়েন্টি না। আর এটা জানানোর দায়িত্ব অধিনায়ক কিংবা সিনিয়রদের।
শুভ্র: ২০০৩ সালে বাংলাদেশের যে ক্রিকেটাররা অস্ট্রেলিয়া সফর করেছিলেন, তাঁরা আপনার ব্যাপারে মুগ্ধ হয়ে ফিরেছিলেন। আপনি বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে গিয়ে ওঁদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, টিপস দিয়েছিলেন…
স্টিভ ওয়াহ: কেউ আমাকে ক্রিকেট নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে আমি সব সময় উত্তর দিই। আমি নিজের চেষ্টায় সফল হয়েছি, তাই কেউ যখন আমার সাহায্য চায়, সেটিকে আমার প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে দেখি। বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে আমার ভালো সময় কেটেছিল। কেয়ার্নসে প্রথম ইনিংসে ওরা খুব ভালো খেলেছিল। ডারউইনে পরের টেস্টেও খারাপ না। ওদের একটু সাহায্য করতে পেরে ভালো লেগেছিল।
শুভ্র: এই যুগে খেলতে পারলে কি ভালো লাগত? আপনার সময় তো টি-টোয়েন্টি ছিল না, এমনকি মনে হয় যদি টি-টোয়েন্টি খেলা যেত…
স্টিভ ওয়াহ: অবশ্যই। এটি দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ। নিজেকে অনেক বেশি প্রকাশ করা যায়। অর্থনৈতিক দিক থেকেও ভালো। সবচেয়ে বড় কথা, এটি বিনোদনের মতো, পরিবারের সবাই মিলে উপভোগ করা যায়।
শুভ্র: আপনি বোধ হয় জানতেন, এই প্রসঙ্গটা আসবেই। বিষয় শেন ওয়ার্ন, আপনার সম্পর্কে তো যা-তা বলে যাচ্ছে…
স্টিভ ওয়াহ: সব সময়ই এ ধরনের কেউ না কেউ থাকে। অবসর নেওয়ার পর ওর মুখে খই ফুটছে, এই যা। আমাদের সম্পর্ক কিন্তু স্বাভাবিকই ছিল। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা ছিল না। আমরা ছিলাম সুখী এক দল। আমাদের দারুণ সব স্মৃতি আছে। আমি সেসব নিয়েই থাকতে চাই।
শুভ্র: শেন ওয়ার্ন তো তাঁর সময়ে সেরা অস্ট্রেলিয়া দলেও আপনাকে রাখেননি। অবিশ্বাস্য!
স্টিভ ওয়াহ: (শ্লেষ মেশানো হাসি) আমি জানতাম না সে নির্বাচক হয়েছে! প্রথম আলো