মেইন ম্যেনু

‘ক্ষুদ্রঋণ কেবল দারিদ্র্যই বাড়ায়’

দারিদ্র্য বিমোচন নয়, ক্ষুদ্র ঋণ গরিব মানুষের ঘাড়ে দেনার বোঝা চাপিয়ে তাকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের পথে নিয়ে যায় বলে মন্তব্য করেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের একজন শীর্ষ নৃবিজ্ঞানী।

যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, “ক্ষুদ্রঋণ পাগলামির সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়টি হল, এই ঋণ কোনো কাজের না হলেও ঠিকই টিকে আছে।”

জেসন হিকেলের ওই নিবন্ধের শিরোনাম ‘ক্ষুদ্রঋণের ভ্রান্তি’। এতে তিনি বলেছেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে যে টাকা গ্রহীতাদের দেওয়া হয়, তার বেশির ভাগটা তাদের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতেই খরচ হয়ে যায়।

“যেমন ধরুন, দক্ষিণ আফ্রিকা- সেখানে ক্ষুদ্রঋণ হিসাবে দেওয়া অর্থের ৯৪ শতাংশই চলে যাচ্ছে দৈনন্দিন খরচে। তার মানে হল, ঋণগ্রহীতারা ওই টাকা খাটিয়ে কোনো আয় করতে পারছে না, যা দিয়ে তারা ধার শোধ করবে।

“এর ফলে পুরনো ধার শোধ করতে তারা নতুন করে ঋণ নিচ্ছে, পরতে পরতে ডুবে যাচ্ছে দেনায়।”

এ প্রসঙ্গে ডিএফআইডির একটি গবেষণা এবং ডেভিড রুডম্যানের লেখা একটি বই থেকে উদ্ধৃত করেছেন হিকেল।

ওই বইয়ে রুডম্যান বলেছেন, “ঋণগ্রহীতাদের অবস্থার উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণের প্রভাব হিসাব করতে গেলে গড়ে সবচেয়ে ভাল যে ফল পাওয়া যায়, তা হল শূন্য।”

ডিএফআইডির অর্থায়নে বিস্তৃত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিচালিত এক সমীক্ষাতেও পাওয়া যায় একই চিত্র।

এর উপসংহারে বলা হয়, “ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প শেষ পর্যন্ত একটি ‘বালির প্রাসাদ’; এ ঋণ ভাল ফল দিয়েছে- এমন স্পষ্ট নজির কোথাও নেই।”

গার্ডিয়ানের নিবন্ধে হিকেল লিখেছেন, নতুন ব্যবসা খোলার জন্য কাউকে ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া হলে সেই নবীন উদ্যোক্তা বাজারে ‘চাহিদা সঙ্কটের’ মুখোমুখি হন।

“তাদের পণ্যের যারা সম্ভাব্য ক্রেতা, তারাও গরিব। তাদের পকেটে সামান্য যে কয়টা টাকা থাকে, তাও মৌলিক চাহিদা পূরণেই চলে যায়। এর মধ্যে একজনের ব্যবসা দাঁড়িয়ে যাওয়ার মানে হল, অন্য কারও ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, কর্মসংস্থান আদতে বাড়ছে না; আয়ও না।”

হিকেলের মতে, ক্ষুদ্রঋণের পক্ষে যত ধরনের ফলাফল দেওয়া সম্ভব, তার মধ্যে এটাই ‘সবচেয়ে ভাল’।

“সবচেয়ে খারাপ যে ফল হতে পারে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা হয়, তা হল, সেই ঋণগ্রহীতার উদ্যোগ ব্যর্থ হবে এবং তিনি পুরনো দেনা শুধতে আবারও ধার নেবেন; এভাবে ঋণের চক্করে পড়ে আরও বেশি দারিদ্র্যে ডুববেন।”

হিকেল বলছেন, কেবল ঋণদাতার পক্ষেই ক্ষুদ্রঋণ থেকে লাভবান হওয়া সম্ভব।

“ক্ষুদ্রঋণের খেলায় ঋণদাতাই একমাত্র বিজয়ী। এদের কারও কারও দেওয়া ঋণের সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বছরে ২০০ শতাংশে পৌঁছায়। এ ধরনের লোকদের এক সময় আমরা বলতাম ‘সুদখোর মহাজন’, কিন্তু আজ তাদের বলা হয় ‘ক্ষুদ্রঋণ দাতা’। ওই নামটি ব্যবহার করেই তারা নিজেদের মহিমান্বিত করে চলেছেন।”

অনেকটা চাঁছাছোলাভাবেই এ নৃবিজ্ঞানী বলছেন, আজকের পৃথিবীতে ক্ষুদ্রঋণ ‘সামাজিকভাবে স্বীকৃত’ একটি ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যার কাজ হল গরিব মানুষের কাছ থেকে ‘সম্পদ নিংড়ে নেওয়া’।

সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়ার পরও ক্ষুদ্রঋণ কেন উন্নয়নের একটি পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, তার সম্ভাব্য কারণও ব্যাখ্যা করেছেন হিকেল।

“এর কারণ হল, ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে একটি সুন্দর সমাধানের কথা বলে, যাতে দাতা-গ্রহীতা দুই পক্ষই জিতবে। ক্ষুদ্রঋণ সেই প্রতিশ্রুতি দেয়, যাতে আমরা, এই ধনী বিশ্ব, বিনা খরচে দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষের গরিবি ঘোচাতে পারব। এবং তাতে বিশ্বে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে কোনো হুমকি তৈরি হবে না।

“সোজা কথায়, শ্রেণি সংগ্রামের হুজ্জত ছাড়াই একটা বিপ্লবের প্রতিশ্রুতি আমাদের দিচ্ছে এই ক্ষুদ্রঋণ। তাছাড়া গরিব মানুষকে বাঁচানোর পাশাপাশি এতে আমাদের নগদ লাভ থাকছে। এই প্রলোভন অপ্রতিরোধ্য।”

হিকেলের মতে, ক্ষুদ্রঋণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণেরও ‘অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার’।

“এটা সেই নব্য উদারপন্থি উন্নয়ন কৌশল… যেখানে আমাদের নতুন নায়ক হলেন ব্যাংকার; আর ঋণ হল আমাদের ত্রাণ। ঘটনাচক্রে, মানুষকে বশে রাখার জন্য দারুণ এক ওষুধ এই ঋণ।”

ক্ষুদ্রঋণের কড়া সমালোচক মিলফোর্ড বেইটম্যান এর আগে দেখিয়েছেন, এই প্রবণতার মূল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেই নিয়ন্ত্রণকৌশলে, যা দেশটি লাতিন আমেরিকায় প্রয়োগ করেছিল।

হিকেল বলছেন, যে পরিস্থিতি দারিদ্র্যের জন্ম দেয়, সে বিষয়গুলো যতদিন না চিহ্নিত করা হবে, ততদিন ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব না।

“ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো যাতে টিকতে পারে, তার পরিকাঠামো আমাদের তৈরি করতে হবে। এজন্য ভর্তুকি দিতে হবে, রাষ্ট্রের সহায়তা লাগবে, কোনো উদ্যোক্তা ব্যর্থ হলে তাকে উদ্ধারের জন্য সাহায্য করতে হবে। অথচ নব্য উদারপন্থা আমাদের এ বিষয়গুলো বর্জন করতে শেখাচ্ছে।”

ক্ষুদ্রঋণের বদলে হিকেল বরং সরাসরি অর্থ সহায়তার পক্ষে। তিনি বলছেন, নগদ অর্থ সহায়তা যে দারিদ্র্য বিমোচনে অনেক বেশি ভাল ফল দিতে পারে, তার নজির অনেক দেশেই আছে।

“যেখানে ক্ষুদ্রঋণ ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে নিঃশর্ত আর্থিক সহায়তা অনেক বেশি ফলদায়ক হয়েছে। শুধু তাই নয়, এটাই যে দারিদ্র্য বিমোচনের সবচেয়ে কার্যকর পন্থা, তাও প্রমাণিত হয়েছে।”

নামিবিয়া, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়াসহ বহু দেশে পরীক্ষামূলক নগদ সহায়তা গরিবি ঘোচাতে অনেক বেশি সাফল্য পেয়েছে বলে জানান হিকেল।

“মৌলিক চাহিদা পূরণের ঘাটতি মেটাতে, স্বাস্থ্য খাতের উন্নতিতে এবং ছোটখাট ব্যবসা শুরুর করার ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা অনেক বেশি সহায়ক হয়েছে, কেননা তাতে মানুষের পকেটে টাকা আর বাজারে চাহিদা বাড়ে, নতুন উদ্যোক্তারা সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেন।”