মেইন ম্যেনু

‘ক্ষুধার যন্ত্রনায় বোন মারা গেল’

লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে অভিনেতা ব্রাইট ও রিচার্ডস হল্যান্ডে শরণার্থী হিসেবে এসেছিলেন। সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন একজোড়া রংচংয়া কাঠের জুতো। যেখানেই যাবার প্রয়োজন হতো, সেখানে ওই কাঠের জুতো পরেই তিনি

যেতেন। কাঠের জুতা পায়ে একজন আফ্রিকান হিসেবে স্বভাবতই তিনি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। যেখানেই তিনি যেতেন সেখানেই মানুষ তাকে দাড় করিয়ে কথা বলতে চাইতো। এই কথা বলতে বলতেই একটা সময় নিজের নতুন ঠিকানা করে নেন ব্রাইট।

সেই সময়ের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে, ‘ওই কাঠের জুতা নিয়েই বারবার মানুষের সামনে আসতে হতো আমাকে। লাইবেরিয়াতে আমি ছিলাম একজন সেলিব্রেটি। কিন্তু একজন শরণার্থী হিসেবে আমি আমার সকল পরিচয় হারিয়ে ফেললাম। আমি তখন আর কিছুই ছিলাম না। কিন্তু ওই কাঠের জুতা জোড়াকে ধন্যবাদ কারণ ওগুলোর কারণেই মানুষ আমাকে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকেনি।’ অথচ ৪৫ বছর বয়সী রিচার্ডস আজ নিউ ডাচ কানেকশনস নামে একটি সংস্থা চালান, যেখানে তরুণ শরণার্থীরা কাজ করে। তিনি ওই শরণার্থীদের নিজেদের স্বপ্ন পূরণের রাস্তা দেখান এবং কিভাবে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে ও জীবনে এগিয়ে যেতে হবে তিনি তাও শেখান। এইতো চলতি বছরের শুরুর দিকেই ডেনমার্কের রাজা ও রানী তাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করলেন।

কিন্তু শরণার্থী হিসেবে নিঃসঙ্গতা আর বিদেশবিভূয়ে থাকার বেদনা রিচার্ডসের আজও রয়েছে। আফ্রিকা থেকে পশ্চিমে আসার পর যে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি তাকে হতে হয়েছিল তা কেবল একজন শরণার্থীই জানেন। লাইবেরিয়াতে তিনি

ছিলেন একজন জনপ্রিয় অভিনেতা। নিজ দেশে বিদ্রোহী পক্ষ চার্লস টেইলরের দলের ভয়ে তাকে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়। তাই বলে তিনি থেকে থাকেননি। শরণার্থী শিবিরে আসার পর সেই কাঠের জুতা পায়ে দিয়েই হাতে ক্যামেরা নিয়ে

তুলেছেন নতুন আসা সব শরণার্থীর ছবি। শরণার্থীরা যেভাবে তাদের ছবি তুলতে চাইতো, সেভাবেই তিনি তুলে দিতেন। তাই আমরা তার তোলা ছবিতে ধোপদূরস্ত কাপড় পরিহিত শরণার্থীর বাইরেও নোংরা ময়লা পোশাক পরিহিত

শরণার্থীদেরও দেখা যায়। ‘আমি তাদের ওই ছবিগুলো তুলে দিয়েছিলাম যাতে সেগুলো তারা দেশে পাঠাতে পারে, যেখানে আজও তাদের পরিবারের কেউ না কেউ রয়ে গেছে।’-রিচার্ডস।

ছবি তুলে তিনি যে অর্থ পেতেন সেটা দিয়ে সপ্তাহান্তে শরণার্থী শিবিরেই আনন্দ উৎসবের আয়োজন করতেন রিচার্ডস। সেখানে শরণার্থী তরুণ তরুণীদের পক্ষ থেকে অনেকই গান গাওয়া থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী নৃত্যও পরিবেশন করতেন। সেই শিবিরেই এক নারী দীর্ঘদিন খেয়াল করছিলেন রিচার্ডসের কর্মকাণ্ড। শেষমেষ ওই নারী তাকে একটি বহুজাতিক সংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজনে সামিল করেন। প্রথমে তিনি ডোরম্যান হিসেবে কাজে লাগলেও মাত্র এক বছরের মাথায় তিনি নিজেই একজন শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত হতে শুরু করেন।

ব্রাইট রিচার্ডসের ভাষায় শুনতে গেলে, ‘হঠাৎ করেই একদিন দর্শকদের সামনে দাড়াতে হলো আমকে। আর তখনই আমি বিশ্বাস করতে শুরু করলাম আমি হল্যান্ডে একজন অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করতে পারি। লাইবেরিয়া থেকে পালিয়ে

আসার পর থেকেই মানুষ দেখেছে আমি কেমন। ওটা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শরণার্থীদের নিয়ে বর্তমানে কাজটিই আমার এখন মূল লক্ষ্য। তাদের সাহায্য করা এবং তাদের অবস্থা অনুধাবণ করতে সাহায্য করাই কাজ। এই অভিজ্ঞতা আমার লাইবেরিয়াতেও হয়েছিল। যখন বিদ্রোহীরা নির্বিচারে মানুষকে হত্যা করছিল এবং সেই লাইনে আমিও ছিলাম। এক বিদ্রোহীর কালাশনিকভ আমার দিকে তাক করে ছিল এবং সেখানেই এক লোক আমাকে টেলিভিশনের অভিনেতা হিসেবে চিনতে পারেন এবং আমাকে যেতে দেয়ার জন্য তাদের কাছে তিনি অনুরোধ করতে থাকেন। ওই মানুষটি আমার জন্য অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। আমি আজও জানি না তিনি কে ছিলেন, কিন্তু আমার জীবন তার কাছে ঋণী। সুতরাং আমি অভিজ্ঞতা থেকেই জানি, পরিবর্তন করার জন্য একজন মানুষই যথেষ্ট। এমনকি মানুষের জীন বাঁচানোর মতো ব্যাপারও।’

হল্যান্ডে তিন বছর থাকার পর রিচার্ডস আর্নহেম শহরের ড্রামা অ্যাকাডেমিতে সেই কাঠের জুতো নিয়েই হাজির হন। তার আফ্রিকান ঢংয়ের অভিনয় পারদর্শিতা পশ্চিমা অভিনয়ের সঙ্গে মিশে পায় নতুন এক মাত্রা। তবু সেই অ্যাকাডেমিতেই

তিনি অনেকটা দিন অভিনয় শেখেন। অভিনয়ের সময়ে তাকে একটি বেদনাদায়ক মুহূর্তের অভিনয় করতে বলা হয়েছিল। ‘হঠাৎ করেই স্মৃতিতে আমার ছোটো বোন চলে আসে। অনেক বছর ধরেই ওর কথা আমাকে ভাবায়নি। কারণ আমি

জীবনযাপনে এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে, বেদনার অনুভূতি চেপে ছিল। যে সময়ে আমি লাইবেরিয়া থেকে চলে আসি তখন তার বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর। গৃহযুদ্ধের ওই সময়ে আমাদের না খেয়ে থাকতে হতো। আমার বোন স্রেফ ঘাস খেয়ে

উদরপুর্তি করেছিল। সে জানতো না যে ঘাসেও বিষ থাকতে পারে। ঘাস খাওয়ার পর তীব্র পেটেব্যথায় আক্রান্ত হয় সে। আমি তার জন্য কিছু খাবারের সন্ধানে বাড়ির বাইরে যাই। দুইদিন বাদে আমি যখন ফিরে আসি তখন সে মারা গেছে এবং কবর দেয়া হয়ে গেছে।’