মেইন ম্যেনু

খুনের নগরী নারায়ণগঞ্জ!

যখনতখন খুন। কখনও একজন, কখনও দুইজন, কখনও বা পাঁচ বা সাত জন। কখনও মরদেহ পাওয়া যায় সড়কের ধারে, কখনও ঝোপঝাড়ে, কখনও নদীতে, কখনও বা মাঁটিতে পুঁতে রাখা অবস্থায়। কারও মরদেহ থাকে বস্তাবন্দি, কারও বা হাত-পা বাঁধা অবস্থায়। ভুক্তভোগীরা হয় যুবক, প্রবীণ, নারী আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিশু।

গত কয়েক বছর ধরে এই হলো নারায়ণগঞ্জের আইন শৃঙ্খলার চিত্র।ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি কেউ রেহাই পাচ্ছেন না খুনিদের হাত থেকে। খুনে কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততারও প্রমাণ মিলেছে।

সারা দেশের অন্য সব এলাকার তুলনায় নারায়ণগঞ্জে সম্প্রতি এভাবে খুনোখুনি কেন বেড়ে গেছে তার কোন ব্যাখ্যা নেই কারও কাছে। এই খুনগুলো যে কোন সংগঠিত শক্তির কাজ এমনও না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিরোধে খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে। পুলিশের তদন্তেও দেখা গেছে, প্রায় সব শিশু খুনের ঘটনা ঘটেছে বড়দের মধ্যে বিরোধে। কারও ওপর ঝাল মেটাতে খুন করা হয় তার ছেলে বা মেয়েকে।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিনবলেন, ‘দেশের সব জায়গায় খুন হয়। নারায়ণগঞ্জ একটি বড় ও জনবহুল এলাকা বলে ঘটনাও হয়ত বেশি ঘটে’। এর কারণ কী- জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, ‘কেন এখানে খুনোখুনি বেশি হয় তা বলতে পারবেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তবে সাত খুনের পর থেকে গত ২১ মাসে এখানে খুনের মামলা কমেছে ১৯ শতাংশ। ডাকাতির মামলাও কমেছে ৬০ শতাংশ’।

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে পড়াচ্ছেন অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ এলাকা। এটা পুরনো শিল্পাঞ্চল হওয়ায় নানা কারণে মানুষের আচরণে রুক্ষতা চলে এসেছে। কোমল মনোবৃত্তি কমে যাওয়ায় অল্পতেই রাগান্বিত হয়ে অপরাধ ঘটায় কেউ কেউ’। তাহলে এ থেকে উত্তরণের উপায় কী- এই প্রশ্নের জবাবে আতিকুর রহমান বলেন, ‘এর তাৎক্ষণিক কোন সমাধান নেই। তবে যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় এবং দ্রুত বিচার হয় তাহলে অপরাধে জড়ানোর আগে মানুষ তার পরিণতির কথা ভাববে’।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে অনেক সময় রাজনৈতিক নিয়োগ হওয়ায় তাদের অনেকে কাউকে তোয়াক্কা করেন না। এসব কারণে নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে এসব সদস্যরা সক্রিয় থাকেন না। অনেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন’।

সরকারকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘নৈতিক চরিত্রের অবক্ষয় রোধ ও টাকা দিলেই সব কিছুর সমাধান হয়ে যাবে এমন চিন্তার পথ বন্ধ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর থেকে যে বিশ্বাস হারিয়ে যেতে বসেছে তা ফিরিয়ে আনতে হবে’।

আলোচিত কিছু খুন

২০ বছর আগে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোলাগুলিতে নারায়ণগঞ্জে ২২ জনের প্রাণহানি ঘটে। তখনকার বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে টানা ২২ দিনের অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে সরকার ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটে। গড়ে প্রতিদিন একটি করে লাশ পড়েছিল। ওই ঘটনার পর থেকেই সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে দেশব্যাপী চিহ্নিত হয় নারায়ণগঞ্জ।

২০১৩ সালের ৮ মার্চ স্কুলছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে হত্যার পর মরদেহ ভাসিয়ে দেয়া হয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। ওই ঘটনায় মামলা হলেও এ নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

একই বছরে ১৯ এপ্রিল রাতে সোনারগাঁয়ের ঝাউগড়া এলাকার নিজ বাড়িতে খুন হন পিরোজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের স্ত্রী,শ্যালক ও বাড়ির দুই গৃহপরিচারিকা। ওই ঘটনায় শামীম আহমেদ নামে এক আসামি সোনারগাঁও থানায় মারা যান।

দুই মাসের ব্যবধানে ১৩ জুন ফতুল্লার দুর্গম চরাঞ্চলে স্কুলছাত্র ইমনকে হত্যা করে মরদেহ নয় টুকরো করে ফসলের মাঠে লুকিয়ে রাখা হয়। ওই বছরইশহরের মাসদাইর আদর্শ স্কুলের ছাত্র সিয়াম,সালমান,রমজান,ফতুল্লার স্কুল ছাত্র নাজমুল, কলেজ শিক্ষার্থী মৌসুমিকে খুন করা হয়।

তবে ‍শিশু-কিশোরদের রক্তে নারায়ণগঞ্জ সবচেয়ে বেশি সিক্ত হয় ২০১৪ সালেই। বছরের শুরুর দিকে মার্চ-এপ্রিল মাসেই চার স্কুলছাত্র খুন হয়। অপরণের পরে মুক্তিপণ আদায়,পূর্বশত্রুতা নিয়ে তাদের প্রাণ দিতে হয়।

জেলায় সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলা অপরাধের ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল।পৌর কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম,আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাত জনকে অপহরণ করা হয়। তিনদিন পর ২৯ এপ্রিল সাত জনেরই মৃতদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠে। বিপুল টাকার বিনিময়ে র‌্যাব-১১ এর সে সময়ের অধিনায়ককে ভাড়া করে এই খুন করানো হয় বলে পুলিশের তদন্তে বের হয়ে আসে।

ওই বছরের ২৮ মার্চ সোনারগাঁওয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেনকে। একইদিনে রূপগঞ্জের স্কুলশিক্ষক মেহেদী হাসানকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

ওই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন ডোবা আর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ব্যবসায়ী,গৃহবধূ,ছাত্রসহ নদী থেকে অর্ধডজন মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। আর অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা অসংখ্য।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে একটি গণপিটুনির ঘটনা সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ডাকাত সন্দেহে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জনতার পিটুনিতে আট সন্দেহভাজন ডাকাত নিহত হয়।

সবশেষ শনিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরে একই পরিবারের পাঁচজনকে জবাই করে হত্যার ঘটনা আবারো নারায়াণগঞ্জকে সামনে নিয়ে আসছে। আর্থিক লেনদেনসহ পারিবারিক কারণে এ হত্যাকাণ্ড হতে পারে মনে করছে পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জ সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার এহসান উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘খুনিরা পেশাদার নয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাতের পর তাদেরকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে’।

একের পর এক হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে নারায়ণগঞ্জ শহরের নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমরা যারা নারায়ণগঞ্জ জেলায় বাস করি তাদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। আশা করি প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জকে নিয়ে ভেবে দেখবেন।’ ঢাকাটাইমস



« (পূর্বের সংবাদ)