মেইন ম্যেনু

কুড়িগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা হত্যার প্রতিবাদে মুক্তিযোদ্ধাদের ৭দিনের আল্টিমেটাম

খ্রীষ্টান ধর্মীয় নিয়মে হোসেন আলীর দাফন, পুলিশের তদন্তে অগ্রগতি নেই

কে,এম, গোলাম রব্বানী,কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি: কুড়িগ্রাম শহরের গাড়িয়াল পাড়ায় ধর্মান্তরিত মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীর হত্যার ব্যাপারে সদর থানায় তার ছেলে রাহুল আমিন আজাদ বুধবার ভোরে অজ্ঞাতদের আসামী করে একটি মামলা করেছেন। ইসলামকি স্টেট (আইএস) এ হত্যা কান্ডের দায় স্বীকার করলেও তদন্তে দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি নেই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা গুলোর। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ৮ জনকে আটক করে জিঙ্গাসাবাদ করেছে পুলিশ। এদের ৩জনকে ১৫৪ ধারায় আটক দেখিয়ে বুধবার কোর্টে সোপর্দ করা হয়েছে। বাকীদের পুলিশ হেফাজতে রেখে জিঙ্গাসাবাদ করা হচ্ছে বলে অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ রুহানী নিশ্চিত করেছেন।

কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন দিক সামনে রেখে তদন্ত অব্যাহত রেখেছেন। বুধবার সকাল থেকে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন), টিএফআই (টাস্কফোর্স ইন্টোগেশন ইউনিট), কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটসহ পুলিশের বিভিন্ন গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা এলাকা পরির্দশন করে তদন্ত শুরু করেছেন। তবে বলার মত কোন অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি জানান। তিনি আইএস এর দাবিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। কারণ ঐ ওয়েব সাইডটি আইএস এর নিজস্ব নয় তাই বিশ^াস যোগ্য নয়। পুলিশ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।

বুধবার বিকালে সাড়ে ৫টায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উদ্যোগে জেলার ৯টি উপজেলায় হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে একই সঙ্গে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এই কর্মসুচি থেকে প্রশাসনকে ৭দিনের সময় বেঁধে আল্টিমেটাম দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে খুনিরা গ্রেপ্তার না হলে লাগাতার কর্মসুচি দেয়ার ঘোষনা দেয়া হয়।

কুড়িগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু, সদর উপজেলা কমান্ডার আব্দুল বাতেন, মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল আলম দুলাল, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল ভৌমিক, অ্যাডভোকেট আহসান হাবীব নীলু, জেলা সিপিবি নেতা আক্তারুল ইসলাম রাজু, বাসদের ফুলবর রহমান, মোনাব্বের হোসেন মিন্টু, ছাত্র ইউনিয়নের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুজন মোহন্ত প্রমুখ। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু এ আল্টিমেটাম ঘোষনা করেন।

কুড়িগ্রামে র্ধমান্তরিত খ্রস্টিান হোসেন আলীকে হত্যার দায় স্বীকার করেেছ ইসলামকি স্টেট (আইএস)। তারা বলেছেন, এটা অন্যদের জন্য একটি শিক্ষা। র্বাতা সংস্থা রয়র্টাস এ খবর দিয়ে বলেছেন, জঙ্গি র্কমকান্ডের ওপর নজরদারিকারী যুক্তরাষ্ট্রের গোয়ন্দো সংস্থা এসইটিই (সাইট) ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ এ তথ্য দিয়েছে।

সাইট ইন্টেলিজেন্স বলেছে, টুইটারে আইএস জানায়, অন্যদের শিক্ষা দেয়ার জন্য এই র্ধমপ্রচারককে হত্যা করা হয়েছে। রয়র্টাসের খবরে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে দু’জন বিদেশীকে হত্যা, সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর হামলা, র্ধমীয় বিভিন্ন গ্রুপের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেেছ আইএস। কিন্তু পুলিশ বলছে, এসব হামলার নেপথ্যে রয়েেছ স্থানীয় জঙ্গি গ্রুপ জামায়াতুল মুজাহিদিন।

মঙ্গলবার বিকাল ৬টায় নিহত বীর মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীর মরদেহকে রাস্ট্রীয় মর্যাদা জানানো হয় আশরাফিয়া প্রাথমিক স্কুল সংলগ্ন একটি চাতালে। এ সময় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম, ওসি জমির উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকুসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় মোগলবাসা ইউনিয়নের চর সিতাইঝার এলাকার নয়ারহাট গ্রামে। সেখানে গ্রামবাসী ও স্বজনদের উপস্থিতিতে খৃষ্টান ধর্মের নিয়ম মেনে দাফন করা হয়। এ প্রক্রিয়া সম্পাদন করেন কুড়িগ্রাম জেলার পাস্তর (ধর্ম জাজক) রেভারেন্ট ফোরকান আল মসিহ। তার সঙ্গে ছিলেন ঢাকা থেকে আসা একটি প্রতিনিধি দল।

রেভারেন্ট ফোরকান আল মসিহ বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলাী ১৯৯৯সালে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহন করেন। সর্বশেষ তিনি তার সাথে সহকারী পাস্তর হিসাবে কাজ করছিলেন। এ ঘটনায় আমাদের ধর্মের সবাই আতংকিত অবস্থায় রয়েছে। সবাইকে সাবধানে চলাফেরার জন্য সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করি সরকার প্রকৃত খুনিদের দ্রুততম সময়ে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবে। এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগীতা থাকবে।

উল্লেখ্য,প্রতিদিনের ন্যায় মঙ্গলবার সকাল ৭টায় হাঁটাহাঁটি করতে বের হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলী। বাড়ী থেকে প্রায় আড়াই শ’ গজ দূরে আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন কুড়িগ্রাম-জিগামারী ঘাট পাকা সড়কে হাঁটছিলেন তিনি। এসময় রাস্তায় লোকসমাগম কম ছিল। হঠাৎ কুড়িগ্রাম শহরের দাদা মোড় হয়ে একটি মোটর সাইকেল তার পাশে এসে জোরে ব্রেক কষে। মোটর সাইকেলে ৩জন আরোহীর মধ্যে দুজনের মাথায় ছিল হেলমেট। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই হেলমেট পরিহিত দু’যুবক আল্লাহু আকবার ধ্বনীতে পথচারী মুক্তিযোদ্ধা হোসেন আলীর গলায় কোপ মারে। এতে গলার বেশীর ভাগ অংশ কেটে যায়। সামনের দিকে উত্তর মুখি হয়ে রাস্তার উপর নিথর দেহ পড়ে যায়। হত্যাকারীরা মৃত্যু নিশ্চিত করে আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে তালতলা হয়ে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের পিছনের রাস্তা হয়ে শহরের ভিতর দিয়ে পালিয়ে যায়। হত্যার দৃশ্য দেখায় প্রত্যক্ষদর্শী কনফিডেন্স কোচিং সেন্টারের শিক্ষককে লক্ষ্য করে একটি ককটেল বিস্ফোড়ন ঘটায়। ককটেলের স্প্রিন্টারে আঘাতে ঐ কোচিং সেন্টারের টিনের বেড়া ঝাঝড়া হয়েগেছে। এসময় রাস্তায় হৈচৈ শুনে লোকজন ছুটে আসলে ককটেল ছুড়ে পালিয়ে যায়। যাবার সময় তারা পার্শ্ববর্তী কলেজ পাড়ার তালতলায় জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সফিকুল ইসলাম সাকিবের বাড়ির গেটের সামনে ছাত্রাবাসের ছেলেরা পথ রোধ করার চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য আবারো ককটেল ছোড়ে এবং দুটি বড় ছোড়া উচিয়ে ভয় দেখিয়ে পালিয়ে যায়। পরে অ-বিষ্ফোরিত ককটেল দুটি সেনাবাহিনীর একটি দল কুড়িগ্রামে এসে নিস্ত্রিয় করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে ৪ থেকে ৫ মিনিটের ছিল এই অপারেশন। ঘটঁনার পর থেকে হোসেন আলীর ভাড়াটিয়া যুবক লাপাত্তা রয়েছেন।

কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ রুহানী জানান, এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় কুড়িগ্রাম সদর থানায় একটি মামলা হয়েছে। নিহতের পুত্র রাহুল আমিন আজাদ এ হত্যা মামলার বাদি। পুলিশ ৮জনকে আটক করে। এর মধ্যে ৩জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। ৫জন এখনও পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।