মেইন ম্যেনু

গরিবদের জন্য অর্ধেক দাম, পাবে ভর্তুকি কার্ড : শহরের এক ব্যবসায়ী

শহরের ব্যবসায়ী ভক্তিপদ বাবুর দাবি, তার দোকানে এমনিতেই বাজারদরের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমদামে জিনিস বিক্রি করা হয়। যারা তার দোকানের ভর্তুকি কার্ড পেয়েছেন তাদের আরো পঞ্চাশ শতাংশ ছাড়ে মাসে একবার জিনিস দেবেন ভক্তিপদ বাবু।

এবেলার এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানা গেছে।

প্রতিবেদনে জানা গেছে, বেলেঘাটার ধনদেবী খান্না রোডের মাতৃ ভাণ্ডারের সঙ্গে আর পাঁচটা মুদি দোকানের এমনিতে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্ত ফারাক গড়ে দিয়েছেন দোকানের মালিক ভক্তিপদ দাশ। সরকারি রেশন দোকান, ফেয়ার প্রাইস শপ থাকলেও দরিদ্র মানুষের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়।

বিশেষত: চাল, ডাল, তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ক্রমশ যাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। এখানেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন মাতৃ ভাণ্ডারের মালিক ভক্তিপদ বাবু।

কারণ গরিব মানুষদের কাছে সস্তায় ভালো মানের জিনিস পৌঁছে দিতে নিজস্ব রেশন ব্যবস্থা চালু করেছেন তিনি। বাজারদরের থেকে অর্ধেক দামে ভক্তিপদ বাবুর দোকান থেকে চাল, ডাল, তেল, আটার মতো জিনিস পায় প্রায় একশ’টি দরিদ্র পরিবার।

ভর্তুকি কার্ড নিয়ে ভক্তিপদ বাবুর দোকানে ভিড় জমান গ্রাহকরা। ভক্তিপদবাবুর দাবি, তার দোকানে এমনিতেই বাজারদরের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমদামে জিনিস বিক্রি করা হয়।

যারা তার দোকানের ভর্তুকি কার্ড পেয়েছেন, রেশন কার্ডের আদলে ভর্তুকি কার্ড পিছু প্রতি মাসে একবার ৩ থেকে ৪ কেজি চাল, ৫০০ গ্রাম ডাল, ১ কেজি তেল, ২ কেজি আটা, ৫০০ গ্রাম চিনি, ১ কেজি নুন এবং এক প্যাকেট বিস্কিট— এই সাতটি জিনিস অর্ধেক দামে দরিদ্র পরিবারগুলোকে দেন ভক্তিপদ বাবু।

বেলেঘাটায় মোট তিনটি দোকান রয়েছে তার। এ তিনটি দোকান থেকে প্রায় একশ’টি পরিবার এ সুবিধা পায়। পরিবার পিছু এক অথবা একাধিক কার্ড বরাদ্দ করা রয়েছে। কিন্তু কারা এই ভর্তুকি কার্ডের সুবিধে পান?

ভক্তিপদ বাবু জানিয়েছেন, মাস দু’য়েক আগে নিজের পরিকল্পনার কথা বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন তিনি। বিশেষ ফর্ম তৈরি করা হয়। এরপরই প্রায় দু’হাজার আবেদন জমা পড়ে।

প্রাথমিক বাছাইয়ের পর বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারগুলির আর্থিক অবস্থা দেখে ভর্তুকি কার্ড বরাদ্দ করেন এ ব্যবসায়ী। মূলত যে দরিদ্র পরিবারগুলোতে শিশু, বৃদ্ধ অথবা প্রতিবন্ধী রয়েছেন, তাদেরকেই ভর্তুকি কার্ড দেয়া হয়।

কিন্তু এমন ভাবনা তার মাথায় এল কীভাবে? ভক্তিপদ বাবুর দাবি, তাদের পারিবারিক অবস্থা একসময় যথেষ্ট স্বচ্ছল ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে তার বাবার কয়লার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।

বাবার মৃত্যুর পরে দু’বেলা ঠিকমতো খাবার জুটতো না। ২০০৯ সালে সামান্য পুঁজি নিয়ে বেলেঘাটার ধনদেবী খান্না রোডে একটি দোকান চালু করেন তিনি।

ভক্তিপদ বাবুর কথায়, প্রথম থেকেই ন্যূনতম লাভ রেখে জিনিস বিক্রি করায় অনেক দূরের এলাকা থেকেও তার দোকানে মানুষ সস্তায় জিনিস কিনতে আসতেন।

কারণ বাজারদরের তুলনায় তার দোকানে জিনিসের দাম এমনতিই ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম বলে দাবি ওই ব্যবসায়ীর। এর পরে ধীরে ধীরে বেলেঘাটার সরকার বাজার এবং জোড়ামন্দির এলাকায় আরো দু’টি দোকান খোলেন তিনি।

বর্তমানে তার অধীনে ১৭জন কর্মী রয়েছেন। গরিব মানুষদের সস্তায় জিনিস দেয়ার ভাবনা অনেকদিন ধরেই মাথায় ছিল। সম্প্রতি ভর্তুকি কার্ডের মাধ্যমে সেই পরিষেবা শুরু হয়েছে।

ভক্তিপদ বাবুর কথায়, ‘খাবারের কী জ্বালা তা প্রত্যক্ষ করেছি। তখনই ঠিক করেছিলাম সময় ঘুরলে মানুষের জন্য কিছু করব।’

নিজের লভ্যাংশ কমিয়েই এ পরিষেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ভক্তিপদ বাবু। কোনো পুর-প্রতিনিধি অথবা কারও সুপারিশ নয়, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিজে আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা খতিয়ে দেখে তবেই ভর্তুকি কার্ড বরাদ্দ করেন তিনি।

সকাল, বিকেল দু’বেলা তাই দোকানের সামনে গ্রাহকদের ভিড় লেগেই থাকে। নিজের লাভ কমিয়ে জিনিস বিক্রির এ উদ্যোগে প্রথমে ভক্তিপদ বাবুর মা, স্ত্রীও আপত্তি জানিয়েছিলেন। এখন অবশ্য তারাও উৎসাহ দেন বলে দাবি করেছেন এ ব্যবসায়ী।

ভক্তিপদ বাবুর দোকান থেকে ভর্তুকি কার্ড পাওয়া নীতা প্রামাণিক, ডলি মুখোপাধ্যায়রা জানালেন, অর্ধেক দামে জিনিস পেলেও তার মান সরকারি রেশন দোকানের তুলনায় অনেক ভালো।

ওরা কেউ কেউ আগে থেকেই ভক্তিপদ বাবুর দোকানের ক্রেতা ছিলেন। পেশায় সবজি বিক্রেতা বিশ্বনাথ পালের কথায়, ‘ওকে দেখে অন্য ব্যবসায়ীদেরও এগিয়ে আসা উচিত।

এখানেই অবশ্য থেমে থাকতে চান না ভক্তিপদ বাবু। দরিদ্র মানুষদের একই পদ্ধতিতে সস্তায় জিনিস পৌঁছে দিতে কর্পোরেট কায়দায় রাজ্যের প্রতিটি জেলায় মাতৃ ভান্ডারের শাখা খুলতে চান তিনি।

জেলা পিছু কুড়িটি দোকান খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার। প্রতিটি জেলায় একটি মূল দোকান থাকবে। সেখান থেকেই শাখা দোকানগুলোতে জিনিস সরবরাহ করা হবে। পরিবহন খরচ কমিয়েই বাজিমাত করতে চান তিনি।

জেলা জেলায় মাতৃ ভাণ্ডারের শাখা খোলার জন্য খুব তাড়াতাড়ি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনও দেবেন ভক্তিপদ বাবু। ফ্র্যাঞ্চাইজি নেয়ার জন্য অনেকেই তার কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে দাবি করেছেন এ ব্যবসায়ী।

তবে এ বিষয়ে সরকারি সাহায্যও চান ভক্তিপদ বাবু। তার অভিযোগ, ‘সস্তায় জিনিস বিক্রি করায় এর আগেও অন্য ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। দোকানের ক্ষতিও করা হয়েছে। ফলে মাতৃ ভাণ্ডারকে রাজ্যের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে নিরাপত্তার আবেদন জানাব।’

রাজ্যের কৃষি বিপণন দফতরের পক্ষ থেকে অনেক জায়গাতেই ন্যায্য মূল্যের দোকান খোলা হচ্ছে। ভক্তিপদ বাবুর কথা জেনে কৃষি বিপণন মন্ত্রী তপন দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, ওই ব্যবসায়ী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পুরো বিষয় খতিয়ে দেখে অবশ্যই প্রয়োজনীয় সাহায্য করা হবে।

বৃহস্পতিবার একটি ক্লাব সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ব্যবসায়ীকে সংবর্ধনাও জানানো হয়।