মেইন ম্যেনু

গর্ভভাড়া দিয়ে চলে তাদের সংসার

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর উল্লাসনগর। এই শহরে একদিকে যেমন আমেরিকার জন্য জিনস প্যান্ট তৈরি হয় বাণিজ্যিকভাবে, তেমনি বাণিজ্যিকভাবে মানবসন্তানও উৎপাদন করা হয়। শুনে অবাক লাগলেও বাস্তবতা এমনই। এই শহরে সেই সব নারীরাই তাদের গর্ভভাড়া দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হন যারা অনেকক্ষেত্রে অশিক্ষিত এবং দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন। কিন্তু এই নারীদের সন্তান ধারনের যোগ্যতা থাকায় তারা সন্তান প্রসব করে পরিবারের পুরুষের পাশাপাশি কিছু অর্থ উপার্জন করতে চান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই নারীদের সঙ্গে তাদের মক্কেলদের সঙ্গে একবার কিংবা দুবার দেখা হয়।

২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে সোনালির সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন তিনি মাত্র ছয় মাসের বিধবা। ঘরের দরজার সামনে শীর্ণকায় সবুজ কুর্তা পরিহিত সোনালি দাড়িয়ে ছিল নিরস মুখ করে। পাশেই তার শাশুড়ি একটি স্টিলের পাত্রে পানি ভরছিলেন। হিন্দিতে বোঝানোর জন্য সোনালি বললেন, ‘আমি গর্ভভাড়া দিলে তিনিই বাড়ির সকল কাজ করেন।’ সোনালি আমাদের তার স্বামীর ছবি দেখায়। রেলওয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তার স্বামীর। আর মৃত্যুকালে রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলেন সোনালি ও তার পরিবার।

ততদিনে সোনালির একটি সন্তান হয়ে গেছে। এবার অর্থের জন্য তিনি এক ইসরায়েলি পরিবারের হয়ে গর্ভভাড়া দিলেন। এই গর্ভভাড়া দিয়ে তিনি পেলেন প্রায় আড়াই লাখ রুপি। কিন্তু ওই প্রাপ্ত অর্থ দিয়েও অভাব মেটেনি সোনালির। তাই দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভভাড়া দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। ২০০৯ সালে পদ্মা নামের এক নারী এই কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল সোনালিকে। আর সেই পদ্মার জন্য তিনি নতুন নারী সংগ্রহ করার কাজও করেন। পদ্মার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে মুম্বাইয়ের ডাক্তার মীনাক্ষী পুরানিকের সঙ্গে। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে পদ্মা এমন ২৫জন নারীকে জোগাড় করেছিলেন যারা গর্ভভাড়া দিতে ইচ্ছুক এবং তারা সকলেই সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন।

প্রায় বিগত দশ বছর ধরে ভারতে গর্ভভাড়া দেয়ার ব্যবসা বেশ ভালো ভাবেই চলছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, প্রতিবছর এই খাতে ভারতের আয় হয় ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। যদিও ভারতের সামাজিক ক্ষেত্রে সারোগেশন বা গর্ভভাড়া দেয়ার বিষয়টি এখনও সম্পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি, তাই ঠিক কি পরিমান অর্থ এই খাতে আসে তা এখনও নিরুপন করা যায়নি। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই গর্ভভাড়াদানকারী নারীরা তাদের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। ২০০২ সালে ভারতে গর্ভভাড়া দেয়ার বিষয়টি বৈধতা পাবার পর থেকে এর উপর কোনো দেখভাল হয়নি। কিন্তু ২০১৫ সালে ভারত সরকার বিদেশিদের জন্য ভারতে অর্থের বিনিময়ে সন্তান উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়।

ভারত সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম কারণ হলো, যে শিশুটি জন্মগ্রহন করে তার নাগরিকত্ব দিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি সন্তান জন্মদানকারী মায়েরা শারিরীক সমস্যার কারণে অনেক সময় মারা যান কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে যান। এমতাবস্থায় বিদেশি খদ্দেরদের পক্ষ থেকে কোনো দায়িত্ব নেয়া হয় না। এবিষয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া কিছু সংবাদ পরিবেশন করেছিল। আর সেই সংবাদগুলোর মধ্যে একটির শিরোনাম ছিল ‘বার্ন সিয়েনা গর্ভ থেকে ভ্যানিলা সাদা শিশুরা বের হচ্ছে’। জয়শ্রী ওয়াদ নামের এক আইনজীবি সরকারের পক্ষে সারোগেশন বন্ধ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভারতীয়দের কিছু বিষয়ে বেশ কষ্ট লাগে। কারণ আমাদের দরিদ্রতার জন্যই তারা নিজেদের গর্ভভাড়া দিচ্ছেন, যাতে পরিবারকে তারা বাঁচাতে পারেন।’

সমালোচকরা বলছেন, বিদেশিদের কাছে গর্ভভাড়া দেয়া বন্ধ করার ফলে গ্রামের নারীদের মধ্যে গর্ভভাড়া দেয়ার প্রবনতা কমবে। প্রথমে ভারতে এটা নিষিদ্ধ করা হলে, পাশ্বর্বর্তী দেশ নেপালে এই শিল্প চলে যায়। কিন্তু সেখানেও এই শিল্প বন্ধ হলে থাইল্যান্ডে স্থানান্তরিত হয় পুরো ব্যবসাটি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত কিংবা এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় আফ্রিকার দেশগুলোর আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় পরবর্তী সময়ে গর্ভভাড়ার বিষয়টি পুরোপুরি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চেপে বসতে পারে। আরেকদল সমালোচক মনে করছেন, ভারতে সারোগেশন বৈধ থাকায় এতদিন যা প্রকাশ্যে হতো, এবার তা গোপনে হবে এবং তাতে মৃত্যুহার বাড়বে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রদেশ গুজরাটের গর্ভভাড়াদানকারী নারীরা কয়েকমাস আগেই এই আইন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করেছিলেন। কিন্তু তাদের পক্ষে বিক্ষোভ করেও কোনো লাভবান হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ গর্ভভাড়া দেয়ার পুরো বিষয়টি এবং কারা এই গর্ভভাড়া দেয় সেটা সামাজিকভাবে কিছুটা গোপন রাখা হয়। আর একটি গোপন বিষয়ের জন্য জনসাধারণের সমর্থন পাওয়া খুব একটা সহজ বিষয় নয়। গর্ভভাড়া দেয়ার ঘটনায় ভারতে ইতোমধ্যে বেশ কয়েক স্থানে পারিবারিক সংঘর্ষ এবং জনরোষের সংবাদও পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপও নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।