মেইন ম্যেনু

গায়ক থেকে ‘জঙ্গি’ হয়ে ওঠা সাফি এখন সিরিয়ায়!

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর ইসলামিক স্টেট (আইএস) -এর পক্ষ থেকে প্রচারিত দুটি ভিডিওতে উপস্থিত তাহমিদ রহমান সাফি বর্তমানে সিরিয়ায় বসবাস করছেন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ গবেষকরা। সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভিডিওটি গুলশানে জঙ্গি হামলার কয়েকদিন আগে রেকর্ড করা বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিওর প্রথম ৯ মিনিটে যিনি ধারা বিবরণী দিচ্ছেন তিনি আর কেউ নন, প্রথম ভিডিওতে আরও হামলার হুমকিদাতা ক্লোজ আপ ওয়ান-এর প্রতিযোগী ও উল্লেখযোগ্য সংগীত শিল্পী তাহমিদ রহমান সাফি।

ভিডিও-র শেষ অংশে গুলশান হামলায় পুলিশের অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। ১৪ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে আরবির পাশাপাশি বাংলাতেও বক্তব্য রাখা হয়েছে। তাহমিদের কণ্ঠে ধারা বিবরণীতে বাংলাদেশের আলেমসমাজের সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে ইসলামি চিন্তাবিদদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে ইসলামি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও শোলাকিয়া মসজিদের ইমামসহ কয়েকজনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বক্তৃতা তুলে ধরা হয়েছে।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সোমবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি আরও বলেন, এই ভিডিওতে সিরিয়ার যে ছবি দেখা গেছে, তা এডিট করে যুক্ত করা হয়েছে।

কিভাবে একজন উদীয়মান তারকা জঙ্গি হয়ে উঠলো, তা জানা যায় সাফির স্বজনদের কাছ থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকে এবং পরবর্তীতে চাকরি সূত্রে জঙ্গিগোষ্ঠীর নজরে পড়ে বদলে যেতে থাকে তাহমিদ। প্রথমে গান গাওয়া বন্ধ করে দেয়, তারপর বন্ধুদের সঙ্গে যাবতীয় যোগাযোগও। এরপরই সপরিবারে সিরিয়ায় পাড়ি জমায় । বন্ধুদের দাবি, এখন মনে হচ্ছে, পুরোটাই পরিকল্পিত ছিল। আগে তার একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থাকলেও পরবর্তীতে স্বনামে আর কোনও অ্যাকাউন্টের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

গত জুলাইতে গুলশানে আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাকারীদের প্রশংসা করে প্রচারিত ভিডিওতে তিন তরুণের একজন এই তাহমিদ সাফি সাবেক নির্বাচন কমিশনার সফিউর রহমানের ছেলে। কেবল তাই নয়, সে শান্তি নিকেতনে পড়েছে। বাংলাদেশের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ক্লোজ আপ ওয়ানের প্রথম আয়োজনে সে শীর্ষ ১৫ কণ্ঠশিল্পীর মধ্যে ছিল।

একজন গায়ক, আধুনিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত ও সচিবের ছেলে কিভাবে জঙ্গি হলো সে প্রশ্নে স্বজনরা বলছেন, তাহমিদের ওরিয়েন্টেশন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সময় থেকে বলে ধারণা করা যায়। তবে গ্রামীণ ফোনে চাকরি সূত্রে সে এমন কিছু মানুষের সংস্পর্শে আসে, যারা তাকে অন্যভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ভিডিওতে ধারা বিবরণী শুনলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই তাহমিদই প্রথম ভিডিওতে বলেছিল, গুলশানে যে হামলা হয়েছে তা ঝলক মাত্র। সে শরিয়া আইনকে নিজেদের মতো করে নেওয়ার ব্যাখ্যা দিয়ে গণতন্ত্র ‘শিরক’ মতবাদ এবং এতে আস্থা রাখতে নেই বলে উল্লেখ করে।

সর্বশেষ বাংলায় প্রচারিত এই ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিশ্ব নেতাদের ছবি ব্যবহার করে তাদের ‘কাফের’ হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়, তাদের প্রতি মুসলিমদের কঠোর হতে হবে।

গুলশানে হামলার কারণ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ভিডিওতে বলা হয়েছে, মুসলিম নারী, পুরুষ ও শিশুদের রক্তে রঞ্জিত ক্রুসেডাররা মুসলিমদের প্রতি চরম উপহাস হিসেবে বাংলাদেশকে তাদের মনোরঞ্জনের স্থান হিসেবে বেছে নেয়। তাই তারা পাঁচজন ঢাকার গুলশানে হামলা চালিয়েছিল।

ভিডিওতে পরের অংশে গুলশান হামলায় নিহত পাঁচ জঙ্গির মধ্যে মোবাশ্বের এবং নিবরাসকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ এবং ভারী অস্ত্রসহ ছুরি হাতে দেখা গেছে। গুলশান হামলার পর সাইট ইন্টেলিজেন্সের প্রকাশিত ছবিতে জঙ্গিদের যে পোশাক ও জায়গা দেখা গিয়েছিলো, সেই একই পোশাকে পাঁচ জঙ্গির বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করা হয়।

ভিডিওতে নিবরাস বলছে, ‘মানুষ আমাদের সম্পর্কে কী ভাবছে, অথবা কী বলছে তাতে আমাদের কিছু যায়-আসে না।’

জঙ্গিবাদ গবেষক নির্ঝর মজুমদার বলেন, ‘আইএস-এর বাংলাদেশ নিয়ে বের হওয়া প্রচারণামূলক দুটি ভিডিও-র লোকেশন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে নির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব যে, সে সিরিয়াতে অবস্থান করছে। সর্বশেষ প্রচারিত ভিডিওটিতে তার কণ্ঠ এবং যে মাধ্যমগুলোতে সেটি প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে আইএস -এর কেন্দ্রীয় মেকানিজমের সাথে তার গভীর সম্পর্কের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়। এছাড়া প্রচারিত ভিডিওগুলোতে তার গুরুত্বের মাত্রার বিষয়টি চোখে পড়বার মতো। কেন্দ্রীয়ভাবে নেতৃত্ব প্রদানের অবস্থানে না গেলে এই মাপের গুরুত্ব পাওয়া সম্ভব নয়।’

প্রসঙ্গত, গত ১ জুলাই রাজধানী গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা চালানো হয়। জঙ্গিদের হামলায় বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জন নিহত হন। জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া দুই পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয় জন নিহত হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এ হামলার জন্য ‘নব্য জেএমবি-কে দায়ী করা হয়েছে।