মেইন ম্যেনু

‘গুলি না চালিয়ে এমন অভিযান বিশ্বে বিরল’

‘ঢাকার আশকোনায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের জঙ্গিবিরোধী অভিযানটির বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ এবং কৌশলগত পদ্ধতিতে অভিযান পরিচালনা করে সাফল্য পাওয়ার ঘটনা বিশ্বে একেবারেই বিরল। বিশ্বের সব দেশেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্র গোলাবারুদ দিয়ে এইসব সমস্যার সমাধান করা হয়। কেননা, জঙ্গি দমনে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতেই সবাই অভিযান পরিচালনা করে থাকে। এক্ষেত্রে কো-লেটারাল ড্যামেজ ছাড়া কোনো গত্যান্তর থাকে না।’

শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর দক্ষিণখানের পূর্ব আশকোনায় নারী জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের প্রধান ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার ছানোয়ার হোসেন। সামনে থেকে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া এ পুলিশ কর্মকর্তা আশকোনায় কাছ থেকে দেখা এসব ঘটনা ও অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তার এক ফেসবুক স্টাটাসে।

ফেসবুকে তিনি লিখেছেন ‘প্যারিস, বোস্টন, গুলশান, কল্যাণপুর প্রভৃতি অভিযানে একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হলেও গতকাল এই প্রচলিত পদ্ধতি অবলম্বন করা আমাদের কাছে মনমতো হয়নি। তিন জন নারী, তিন জন শিশু এবং এক জন কিশোর বালকের বিপরীতে বিশাল বাহিনী নিয়ে অস্ত্রশস্ত্র তাক করার মতো অদক্ষ এবং কাপুরুষ আমরা নই। তাই মাঝরাতে আস্তানা ঘেরাও করার পরও দীর্ঘ সময় নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কিছু কৌশল প্রয়োগ করে এই অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। নিশ্চিত মৃত্যুর আতঙ্কে ভোগা জঙ্গিদের কাছাকাছি গিয়ে কথা বলার মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।’

‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনার নানা পদ্ধতির উপর আমাদের প্রশিক্ষণ থাকলেও সব থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতেই আমরা গতকাল বেশি সফলতা পেয়েছি। সে দিক বিবেচনা করলে গতকালের অভিযানটি শুধু মাত্র বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা।’

তিনি আরো লেখেন, ‘দেশের অনেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহনীর সদস্য বিভিন্নভাবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করছে গতকালের অভিযানে গৃহীত কৌশলগত ধাপগুলো জানার জন্য। যে সকল কারণে এটি একটি বিশেষ অভিযান হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। ১. দুই জন খুব গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি সদস্যের স্ত্রী যারা জঙ্গি মতবাদের উপর সর্বোচ্চ বিশ্বাস তাদেরকে আত্মসমর্পণের জন্য সম্মত করানো। ২. সুইসাইডাল ভেস্ট (বোমা) পরিহিত নারী জঙ্গিদের সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নিগোশিয়েশন চালিয়ে যাওয়া। ৩. ডায়ালগের ক্ষেত্রে জঙ্গিদের পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নেওয়া। ৫. কোনো প্রকার গোলাগুলি ছাড়াই প্রায় ১৬ ঘন্টাব্যাপী (২৩ ডিসেম্বর রাত ১১.৩০টা থেকে ২৪ ডিসেম্বের বিকেল ৩.৩০টা পর্যন্ত) একটানা ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়া। ৬. সর্বশেষ নারী জঙ্গি সদস্য সবাইকে ধোকা দিয়ে গুটিকয়েক পুলিশ সদস্যকে সুইসাইডাল বোমায় হতাহত করার পরিকল্পনা করে। সে ০৭ বছরের একটি মেয়ে শিশুকে (অপর এক জঙ্গির মেয়েকে) হাত ধরে পুলিশের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আমরা শিশুটিকে একা এগিয়ে দিতে অনুরোধ করি এবং তাকে দু’হাত মাথার উপরে তুলে এগিয়ে আসার আহবান জানালে একসময় সে বোতাম টিপে সুইসাইডাল ভেস্টটি ব্লাষ্ট করে। কংক্রিট দেয়ালের আড়ালে অবস্থানরত আমরা প্রায় এক ডজন কাউন্টার টেররিজম পুলিশ (সোয়াটসহ) অল্পের জন্য বেঁচে যাই। অত:পর সোয়াট সদস্যরা মেঝেতে পরে থাকা মারাত্মকভাবে আহত মেয়েশিশুটিকে ট্যাকটিল্যাক ফার্স্টএইড দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। এই মেয়েটিকে সেই নারী জঙ্গি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। যাইহোক, মোস্তাফিজ- সাকিবের উইকেট পেলে আর তামিম- কায়েসদের সেঞ্চুরি করলে যদি কোটি মানুষের হৃদয় কেড়ে নিতে পারে, তবে এই কাউন্টার টেররিজম পুলিশের ঝুঁকিপূর্ণ সাফল্যও কোটি কোটি মানুষের মন জয় করবে বলে আমাদের বিশ্বাস (যদি না কারও চোখের কোনো রঙিলা চশমায় দেশের সবুজকে কালো মনে হয়)।

দেশকে, দেশের মানুষকে ভালবেসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করা আমাদের এই কাজে শুধু দেশপ্রেম আর পেশাদারিত্ব ছাড়া কিছুই নেই।’