মেইন ম্যেনু

আদিকাল থেকেই রেলওয়ের জমিতে বসবাস করলেও ভাগ্যে জোটেনি একখন্ড জমি

গোয়ালন্দের ডোম সম্প্রদায়ের সন্তানরা পড়ালেখায় এগিয়ে চাকুরী না পাওয়ায় হতাশ

আমরা তো আপনাগো মতো মানুষ, রক্ত, চেহারা, সবই এক রকম। তবে ডোম বলে তুচ্ছ, তাচ্ছিল করে কেন, বাজারের দোকানে চা খেতে গেলে চা দিতে চায় না। ভিন্ন গ্লাস কিনে দিয়ে তাও দাড়িয়ে চা খেতে হয়। কাজ কর্ম নেই দু,বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়। সবার মতো আমাগো আত্বীয়ও স্বজন আসে , তহন বাজারে গিয়ে নজ্জায় পড়তে হয়। চুল কাটতে চায় না বিধায় দুরের কোথায় যেয়ে চুল কাটতে হয়। পড়ালেহা করলেও চাকরী হয় না, তাই পড়ালেহার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে সন্তানরা।

চিকিৎসা নিতে হাসপাতাল ছাড়া কোন উপায় নেই তবুও হাসপাতালে আমাদের মনে হয় তুচ্ছ, তাচ্ছিলো করে, ঔষুধ দেয় না, ভালো ভাবে দেখে না এভাবেই আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন, রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ পৌর সভার রেলওয়ে কোলনীর ডোম সম্প্রদায়ের এক গৃহবধু ঝর্না ডোম।

গোয়ালন্দ রেলওয়ে ষ্টেশনের কোল ঘেষে আদিকাল থেকে রেলওয়ের সরকারী জমিতে খুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করে আসছে ৬টি ডোম পরিবার। স্বাধীনতার ৪২ বছরেও তাদের ভাগ্যে জোটেনি একখন্ড জমি। এদের মধ্যে ৪জন গোয়ালন্দ পৌরসভায় ১৮শত টাকা বেতনে চাকুরী করে।

কেউ আবার লেখাপড়া শিখে পরিবারের সদস্যদের মুখে দু,বেলা খাবার পৌছে দিতে পাড়ি জমিয়েছে ঢাকায়। তবে ডোম পরিবার গুলো জানে না সরকার থেকে ভিজিডি, ভিজিএফ, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়। এখানে বসবাসকারী সন্তোষ ডোম পৌর সভায় ১৮ শত টাকা বেতনে চাকুরী করে। তার স্ত্রী তারা ডোম বাড়ীতে থাকে। তাদের সন্তান ২জন স্কুলে যাবার মত বয়স হয়নি। দুলাল ডোম বাড়ীতে থাকে আর স্ত্রী মুন্নী ডোম ১৮শত টাকা বেতনে পৌরসভায় কাজ করে। তাদের একমাত্র সন্তান মুন্না ডোম গোয়ালন্দ আইডিয়াল একাডেমীর ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়ালেখা করে।

উত্তম ডোম পৌরসভায় কাজ করে। স্ত্রী সুমি ডোম বাড়ীতে থাকে আর একমাত্র সন্তান স্কুলে যাওয়ার সময় হবে এবছর। পলাশ ডোম বেকার। তার স্ত্রী মিনা ডোম পৌরসভায় কাজ করে। ২সন্তান। বড় পুত্র জয় কিন্ডার গার্টেনের বেবি শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। রংলাল ডোম ও তার স্ত্রী সাধনা ডোম এখন বেকার। তাদের ৩ ছেলে ও ২মেয়ে। ছেলে রাজা ওরফে সাগর ডোম ঢাকার একটি হাসপাতালে ৫হাজার টাকা বেতনে চাকুরী করে। আর মানিক ও বাদশা ডোম ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করে বাদ দিয়েছে। ২ মেয়ে একজনের বিয়ে হয়েছে আর অন্যজন ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করে এখন বাড়ীতে রান্নার কাজ করে। রতন ডোম ও তার স্ত্রী ঝর্না ডোম। তাদের ঘরে ২ ছেলে ও ৩ মেয়ে। ছেলে হিরা ডোম একটি প্রকল্পে মাষ্টারোলে চাকরী করে। বিশাল ডোম আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেনীতে পড়ালেখা করে। মেয়ে একজন বিয়ে হয়েছে আর অন্য ২জন শান্তনা গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে। অন্তরা ডোম ব্র্যাকের ৫ম শ্রেনীতে পড়ার পর বাদ দিয়েছে অর্থাভাবে।

রংলাল ডোম, সন্তোষ ডোম, দুলাল ডোম, উত্তম ডোম জানায়, বাপ-দাদার আমল থেকে গোয়ালন্দ রেল ষ্টেশনের জায়গার উপর বসবাস করে আসছি। কয়েকজন মাত্র ১৮শত টাকা বেতনে পৌরসভায় কাজ করে সংসার চালানো কষ্ট কর হয়ে দাড়ায়। ভালো ঘর উঠাতে না পারায় ছোট ছোট কুড়ে ঘরে বসবাস করি। একবছর পুর্বে রেলওয়ের একটি পরিত্যক্ত ঘরে পৌরসভার মেয়র কয়েকখানা টিন দিয়ে ৬টি পরিবারকে থাকার সামান্য ব্যবস্থা করে। ওখানেই গাদাগাদি করে থাকতে হয়। একটি মাত্র ল্যাট্রিন ও টিউবয়েল বসানো হয়েছে ৬ পরিবার মিলে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে।

সকাল হলেই ল্যাট্রিনে যাওয়া নিয়ে লাইনে দাড়িয়ে থাকতে হয়। সরকার থেকে কোন প্রকার ভিজিডি, ভিজিএফ, মাতৃত্বকালীন ভাতা দেওয়া হয় তাদের জানা নেই। নির্বাচন আসলে অনেক লোকই তাদের কাছে ভোট নিতে আসে, কিন্তু নির্বাচনের পর কেউ খোজ নেয় না। তাদের যে কোন অনুষ্ঠান নিজেরাই উপভোগ করে। তুচ্ছ তাচ্ছিল করার ফলে কোথায় অন্যকোন কাজ করতে না পারায় আয় না থাকায় অনেক কষ্টে দিনতিপাত করতে হয়।

ইচ্ছা থাকলেও ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করাতে হীমসীম খেতে হয়। অনেক সময় লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। অন্যান্যেদের মতই বেতন ঠিকমত দিতে হয়। আমাদের ছেলে মেয়েদেরকে তেমন কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় না। প্রতিটি ছেলের লেখাপড়ার জন্য কমপক্ষে মাসে ১৩-১৪শত টাকা ও চিকিৎসা বাবদ ৮-৯শত টাকার মত খরচ হয়।

মুন্নী ডোম, তারা ডোম, ঝর্না ডোম, সাধনা ডোম ,সুমি ডোম, মিনা ডোম জানায়, বসবাসের ঘরের পাশ দিয়ে সরু রাস্তা থাকার কারনে মানুষ চলাচলের সময় ধাক্কা লাগে। পানি ফেলানো, গোসল করা, পানি আনা, বাথরুম করা সহ অনেক সমস্যা হয়। রেলের জমিতে বসবাস করার কারনে অনেক সময় রেলের লোকজন এসে উঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেয়। বাইরের লোকজন আমাদের সাথে না মেলামেশার কারনে নিজেরা এক হয়ে বসবাস করি।

সরকারী কোন সহযোগিতা দেয় বলে আমাদের কেউ জানে না। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলেও ডোম বলে অবহেলা করে। সরকার যদি আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাসহ একখন্ড জমির ব্যবস্থা করতো তাহলে জীবনের চাওয়া টুকু সার্থক হতো। তা না হলে বর্ষা মৌসুমে জায়গায় পানি জমে হাটু বা মাজা পানি হয়ে বসবাস করতে পারি না। আমরাও সমাজের অন্যন্যে ১০জন মানুষের মত মাথা উচু করে বেঁচে থাকতে চাই।

স্কুলগামী শান্তনা ডোম, বিশাল ডোম, জয় ডোম জানায়, স্কুলে তারা ভালো ফলাফল করে। কিন্তু তাদের সাথে অনেকেই মিশতে চায় না। শিক্ষকরা ভালো ব্যবহার করে। আগে মিশতে না চাইলেও অনেকে ভালো ব্যবহার করার কারনে শিক্ষা গ্রহন করে সমাজ টাকে বদলে দিতে চাই। যাতে মানুষের মাঝে কোন ভেদাভেদ না থাকে। তাহলেই বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারবো।

এখন গোয়ালন্দের ডোম পরিবারগুলোর প্রানের দাবীতে পরিনত হয়েছে একখন্ড জমি। সরকার প্রতিবছর ভুমিহীনদের জমি বন্দোবস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সমাজের ও রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে এ ডোম পরিবার গুলোর দাবী কি পুরন হবে না। তারা জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিদের কাছে পদক্ষেপ গ্রহনের দাবী জানিয়েছেন।



« (পূর্বের সংবাদ)