মেইন ম্যেনু

গ্রাম্যবধুর আবিষ্কৃত কলার ফাইবারে ‘কলারসী’ শাড়ির বিশ্বজয়

বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন সূত্র আবিস্কারের ঘটনা তো অনেকই শুনেছেন। এবারে নিতান্তই গ্রাম্যবধু মালন বালার সূত্র আবিস্কারের ঘটনাটা একটু পড়ুন মন দিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা কারিগরি শিক্ষা ছাড়াই কলা গাছের ফাইবার দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ‘কলারসী’ শাড়ি, সেই শাড়ির জয়জয়কার এখন বিশ্বজুড়ে-

আজ থেকে প্রায় বছর কুড়ি আগের ঘটনা। উত্তর দিনাজপুরের ইটাহার থানার পতিরাজপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের চৌদুয়া গ্রাম। এই গ্রামেই বেশ কয়েক ঘর রাজবংশী পরিবারের সাথে বসবাস করেন মালনবালা সরকার। নিতান্তই ঘরোয়া, আটপৌরে অন্যান্য রাজবংশী রমনীদের মতো মালনবালাও প্রতিদিন বাড়ির গরু- ছাগলের পরিচর্যা,হাঁস পালন এবং অন্যন্য সংসারের যাবতীয় কাজ একা হাতেই সামাল দিতেন। কিন্তু আচমকাই জীবনে এসে গেল এক আশ্চর্য পরিবর্তন। এ যেন বিশ্ব বিখ্যাত বিঙ্গানী স্যার আই জ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষন সূত্র আবিস্কারের মতোই ঘটনা। গাছ থেকে আপেল পরা দেখে আচমকাই যেমন বিঙ্গানী নিউটনের মাথায় যেমন এসে গিয়েছিল মাধ্যাকর্ষণ সূত্র, ঠিক তেমনি মালনবালার সূত্র আবিস্কারের ঘটনাটাও নিতান্তই আকস্মিক।

বছর কুড়ি আগের এক গ্রীষ্ম কালের দুপুর। সংসারের অন্যান্য কাজ সেরে উঠতে উঠতে খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল মালন বালা সরকারের। উঠোনে বাঁধা ছাগলগুলিকে তখনও খাবার দেওয়া হয়নি। তাই তাড়াতাড়ি বাড়ির কাছের কলা বাগানের থেকে কলা পাতা কাটতে গেলেন মালনবালা। হঠাৎ ই তার চোখে পরলো কলা পাতার সরু সরু আঁশের দিকে। কলা গাছের আঁশতো তিনি আগেও দেখেছেন। কিন্তু সেদিন কেন যেন অন্য রকম লাগছিল। মাথায় বিদ্যুৎ গতিতে খেলে গেল এক অন্য রকমের বুদ্ধি।

কলার খোলগুলিকে কেটে নিয়ে এলেন বাড়ির উঠোনে। এরপর ছুড়ি দিয়ে, ঝিনুক দিয়ে ঘষে ঘষে তার থেকে বের করতে লাগলেন কলা গাছের সুতো (তন্তু)। ইংরেজিতে যাকে বলাহয় ‘ব্যানানা ফাইবার’ বা ‘ব্যানানা টিসু’। নিতান্তই নতুন এক শিল্পসৃষ্টির ভাবনায় উতলা হয়ে ওঠে মালনবালার সাদামাটা মন। তিনি প্রথমে এই সুতোগুলিকে শুকিয়ে রোদ্রে শুকিয়ে নেন ভালো করে। বাড়িতে তাঁত যন্ত্র বসিয়ে সুতোগুলিকে ডাঁই করে পাতেন তাঁত যন্ত্রটিতে। ব্যাস, তাঁতের কান্দরের নিপুন টানে ফুটে উঠতে থাকে হরেক রকম নকশা। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে নেচে ওঠে মালনবালার মন।

জেলাজুড়ে মালনবালার আবিষ্কৃত এই ব্যানানা ফাইবার ধিরে ধিরে লোকমুখে পরিচিত হয়ে ওঠে মালনবালার সূত্র হিসেবে। এরপর তৈরি হতে থাকে গৃহ শয্যার নানা সুদৃশ্য জিনিস। পাশাপাশি শুরু হয় ধোকড়া বানানোর কাজ। কলাগাছের সুতো দিয়ে বানাতে থাকেন দরজা- জানালার শৌখিন পর্দা, টেবিল কভার, ডাইনিং টেবিলের সুদৃশ্য ম্যাট। গ্রাম্য আট পৌড়ে পঞ্চাশার্ধ মালনবালার স্বপ্ন ডানামেলতে চায় বিশ্ব সংসারের অসীম আকাশে। নিজের হাতে তৈরি গৃহ শয্যার নানান জিনিস নিয়েই ১৯৯০ সালে পাড়ি দেন চেন্নাই শহরে। চেন্নাইয়ের বিভিন্ন কলাকুশলীর সংস্পর্শে থেকে তাদের কাছ থেকে শেখেন আরো নতুন নতুন অত্যাধুনিক নকশা।

মালনবালা জানিয়েছেন, মানিক কলা বা মালভোগ কলা গাছের সুতো খুবই সুক্ষ বা চিকন হয়ে থাকে। ইটাহারের পতিরাজ পুর, কালিয়াগঞ্জের ফতেপুর ও দক্ষিন দিনাজপুরের কুশমন্ডি থানার মিঠকুন্ডি ও রুয়া নগর থেকে প্রচুর ব্যানানা ফাইবার নিয়ে আসা হয়। কলা গাছের সুতো বের করে অনেক মানুষ জীবকার নতুন দিশাও খুঁজে পেয়েছেন। পাশাপাশি পঞ্চাশোর্দ্ধ মালনবালাও খুঁজে পান এক নতুন অজানা পথ চলার আনন্দ। স্বগর্বে পার হতে থাকেন চলার পথে উন্নতির এক একটি মাইলস্টোন ।

ব্যানানা ফাইবারের হস্ত শিল্প এবং মার্সিরাইজড কটন সুতোর তৈরি পদ্ম ও ধোকড়া প্রভৃতি শিল্প কাজ নিয়ে প্রতি বছর অংশ নিতে থাকেন ডি আই সি আয়োজিত জেলাস্তরীয় শিল্প মেলা এবং নাবার্ড আয়োজিত শিল্প মেলায়। এরপর জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেলা, পাটনা, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুর হস্ত শিল্প মেলায়। এই সময়ে মালনবালার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ‘ক্রাফট কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া ‘।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রনে ঢাকায় আয়োজিত সার্ক মেলায় অংশ নেন মালনবালা সরকার। সেই প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মুখোমুখি ভারতের উত্তর দিনাজপুরের এঁদো গাঁয়ের মালন বালা সরকারের। তবে এসময়ে দাঁড়িয়ে মালনবালা জানান, একটু সরকারি উদ্যোগ ও সহযোগীতা পেলে চলার পথটা আরও অনেকটা দীর্ঘায়িত করা যেত। কারন, এই কলা গাছের সুতো দিয়ে তৈরি খেলনাগুলির বিদেশে ভীষন চাহিদা রয়েছে। আরও অনেক মানুষকে এই কাজ শিখিয়ে ব্যবসার পরিধি বিস্তার করা যেতে পারে। উপযুক্ত প্রশিক্ষন ও ব্যাঙ্ক ঋণ পেলে এই ব্যানানা ফাইবারের হস্ত শিল্পের মাধ্যমেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে জেলার হস্ত শিল্পীরা।

আর তাই এখন পাড়াগাঁয়ের এঁদো গলি পথ পেড়িয়ে স্বপ্নের অনন্ত আকাশে ডানা মেলার অপেক্ষায় দিন গুনছেন মালনবালা সরকার।