মেইন ম্যেনু

গ্রীস সঙ্কট : বীরপুত্রদের সরব প্রস্থান?

৫ই জুলাই। গ্রীকরা সম্ভবত ইউরোজোন থেকে বেড়িয়ে গেল। সতস্ফূর্ত গণভোটের মধ্য দিয়ে। বীরপুত্রদের সরব প্রস্থান। এ অচলবস্তার অন্যতম প্রধান কারণ দীর্ঘদিন ধরে চলা অর্থনৈতিক মন্দার সুরাহা না হওয়া, ঋণ পরিশোদের কোন যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত সমাধা না হওয়া।

সর্বমোট এক কোটি দশ লাখ গ্রীক নাগরিকদের জন্য প্রায় ২২ লাখ কোটি ৭২ লাখ টাকার ঋণের বোঝা চেপে বসেছে। মাথাপিছু দাড়ায় প্রায় বিশ লাখ টাকা। অর্থাৎ একেকজন গ্রীক নাগরিককে গড়ে ২০ লাখ টাকার ঋণ শোধ করতে হবে।

গ্রীস ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার দারপ্রান্তে। এ অবস্থায় ঋণদাতা ইউরোপীয় মোড়ল রাষ্ট্রগুলো ‘ব্যয় হ্রাস করে দেনা পরিশোধ’ করার নীতিগত প্রস্তাব পেশ করে। অর্থাৎ গ্রীক জনসাধারণের জীবনযাত্রার দৈনন্দিন ব্যয় কমিয়ে গ্রীসের রাষ্ট্রীয় ঋণ খালাস করা। এতে পুঁজিপতিদের দেয়া ঋণের উচ্চহারে সুদ যেমন আদায় হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রীসকেও ইউরোজোনে রেখে আরো বহুদিন শোষণ করা যাবে। ঠিক গ্রামের মুদি দোকানীদের মত বাকীতে সদাই ‘দিয়ে দিন এনে দিন খাওয়া’ মানুষদের বান্ধা কাষ্টমার বানিয়ে ফেলা। অথবা ক্ষুদ্র ঋণের মত–অল্প অল্প করে অনেক দিনে চৌগুন লাভ আদায় করে নেয়া। তাই ইউরোপীয়রা এত বেশি বেসামাল হয়ে পড়ছে– গ্রীস যাতে ছিটকে না পরে। গ্রীসের বুদ্ধিমান সরকারও এ সুযোগে গণভোট আয়োজন করে তাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে নিয়েছে। বারাবারি রকমের ঋণখালাসী প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে।

ক্রমেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের দুষ্ট চরিত্র উন্মোচিত হয়ে যাচ্ছে। ইউরোপীয়দের আঞ্চলিক অখণ্ডতার বুলি মস্তবড় জালিয়াতি, আজকে প্রমাণিত হচ্ছে। মুনাফাচোষা মোড়ল রাষ্ট্র আর কর্পোরেট চক্রের ব্যবসায়িক ছল-চাতুরী ছাড়া আর কিছুই নয়। ফলাফল গ্রীস আজ সর্বস্বান্ত। ব্যাঙ্কগুলো দেউলিয়া। ঋণ খালাসেও অক্ষম রাষ্ট্রটি। অন্যদিকে সাধারণ গ্রীকদের জীবনমান তলানিতে ঠেকেছে। এ অবস্থায় ই ইউ নেতাদের পরামর্শ কিনা গ্রীসকে আরো কৃচ্ছ/সংযম সাধন করতে হবে। অর্থাৎ গ্রীসকে আরো ফকির হতে হবে, কম খরচে হতে হবে। কিভাবে? আপনারা জার্মানি-ফ্রান্সে বসে গাজা সেবন করতেই পারেন, তাই বলে গ্রীকরা দুমুঠো দুবেলা ভাত খাওয়ার সাথে নিশ্চয় আপস করবেনা। ইউরোপীয় ঋণদাতাদের এই অমূলক প্রস্তাবকে গ্রীক অর্থমন্ত্রী, ইয়ানিস ভারুফাকিস ‘অর্থনৈতিক জঙ্গিবাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ইউরোপের ২৮টি দেশের মধ্যকার অর্থনৈতিক মত-পার্থক্য দূরীকরণ, অভিন্ন শ্রমনীতি প্রণয়ন করে সাধারণ ইউরোপীয়দের জীবনমানের অগ্রগতিকে সর্বোচ্চ প্রাধন্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে। একীভূত মুদ্রানীতি (ইউরো), কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (জার্মানি থেকে পরিচালিত), উন্মুক্ত ইউরোপীয় সীমান্ত–কী সুবিধা ইউরোপের মানুষদের জন্য! চাইলেই গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পরা যায় ইউরোপ ভ্রমণে, একদেশ থেকে অন্যদেশ, কোনো ভিসা জটিলতা নাই। একটু খেয়াল করে দেখলে এই সুবিধাগুলোর বিপদজ্জনক অসুবিধা ও দৌরাত্ম্য। আড়ালে ভয়াবহ দুষ্ট মতলব লুকিয়ে আছে। উন্মুক্ত সীমান্তের অর্থ হচ্ছে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ আমার দেশে বিদেশীরা এসে আমার কর্মসংস্থান দখল করে নিতে পারবে। ধরুন, কোনো বিশেষজ্ঞ ফরাসী/জার্মান তাদের স্বদেশ ছেড়ে এসে অপেক্ষাকৃত দুর্বল অর্থনীতি, ইতালি বা গ্রিসের কর্মসংস্থানের বাজারে প্রতিযোগিতা করা, চাকুরী ডাকাতি করে নিয়ে যাওয়া। জার্মানি বা ফ্রান্স উন্নত দেশ, উন্নত অবকাঠামো, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, দক্ষ ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণ। তাই স্থানীয় গ্রিক ও ইতালীয়রা টিকে থাকতে পারেনা, চাকুরীচ্যুতি হয়, নূতন চাকুরী খুব একটা জোটেও চায় না। দিনে দিনে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ে। কারণ তারা নিজেদেরকে ইংরেজ বা জার্মানদের মত করে তৈরী করতে পারেনা, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাও নাই। তবে কতজন বেকার গ্রীক জার্মানীতে চাকুরী পেয়েছে, সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ চাকুরী পেলে নিশ্চয় গ্রীসে ২৬ ভাগ বেকার থাকতনা। এ তো গেল ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা। সবচে ভয়ঙ্কর দিকটা হল–দুর্বল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও কম্প্যানির কব্জায় বন্দী। যেমন ধরুন গ্রীসের প্রতিষ্ঠানগুলো চালাচ্ছে জার্মানরা। সুতরাং চাকুরীর নিয়োগে চলে আরেকধাপ বৈষম্য। অর্থাৎ প্রভাভশালী ঐ জার্মানী ও তার কম্প্যানি স্বদেশীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই অধিকাংশ সময়ে নিয়োগ দেয়। ঐদিকে বড় আরেকটা জালিয়াতি হচ্ছে ই ইউ অন্যান্য বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে ‘মুক্ত ব্যবসায়িক’ চুক্তি করে খাল কেটে কুমির নিয়ে এসেছে। এখন বহিরাগতরাও তুমুল প্রতিযোগিতাময় কর্মসংস্থানের বাজারে ঢুকে পড়ছে, সীমান্তহীন ইউরোপে। অবস্থা যা দাড়ায়, গ্রীকরা আরো চাকুরী হারাচ্ছে, বেকারত্ব আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে চালকের আসনে থাকা জার্মানি ও ফ্রান্স কিন্তু ঠিকই লাভবান হচ্ছে, তাদের বানিজ্য সম্প্রসারিত হয়েছে, চুক্তিভুক্ত বিদেশী দেশগুলোতে। তাদের অর্থনৈতিক শোষণ এখন বিশ্বজোড়া। আর বিনিময়ে তারা দুর্বল ইতালি বা গ্রিসকে বিক্রি করে দিয়েছে বিশ্ব দরবারে, বৈশ্যিক শোষনের গ্যাড়াকলে। সমগ্র ইউরোপ অভিন্ন বাজারে পরিণত হয়েছে। অভিন্ন প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ ব্রিটেনে যেই কাঠালটি দশ টাকা বিক্রি হয়, গ্রীসেও ফলটি দশ টাকায়ই বিক্রি হবে। কিন্তু শিল্পোন্নত ব্রিটিশদের কাছে দশ টাকা মূল্য পরিশোদ করা তুচ্ছ ব্যাপার, হাতের নাগালে, আর কৃষিভিত্তিক গ্রীকদের কাছে হয়ত দশ টাকা দুই দিনের সাংসারিক খরচ। অভিন্ন মুদ্রানীতির সমস্যাটা এতদিনে অত গভীরে চলে গেছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে।

ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো গ্রীকদের অভয় দিলেও জার্মানি যাতে জনগনের ট্যাক্সের টাকায় গ্রীসকে কোনো প্রকার অর্থসাহায্য না দেয়, এ দাবি জানিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ করেছে শত শত জার্মান নাগরিক। সংকটাপন্ন অন্যান্য দেশগুলোও গ্রীসের ইউরোপ ছাড়ার পদক্ষেপে বেগ পেতে পারে। তাদের মধ্যে পর্তুগাল, ইতালি ও যুক্তরাজ্য অন্যতম। প্রসঙ্গতই এ ঘটনায় জার্মান মুলুক সবচে বেশি উদ্বিগ্ন ও অস্বস্থিতে আছে।

এ গণভোটের মধ্য দিয়ে শুধু পুঁজিবাদ নয়, পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামো আজ প্রশ্নবিদ্ধ ও বিপদাপন্ন। পশ্চিমারাও তাই বেপরোয়া। আবোল-তাবোল বকছে। গার্ডিয়ান পত্রিকা হ্যা ভোটের পক্ষে সবচে বড় বুদ্ধিভিত্তিক ও অনলাইন প্রচারণা-প্ররোচনা চালিয়েছে বলে মনে হয়। হ্যা ভোটের পক্ষের ব্যক্তিদের মন্তব্যই নির্বাচিত হয়েছে পত্রিকাটিতে, না ভোটের পক্ষের মন্তব্যকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম গ্রীসের কেবলা/মক্কা পরিবর্তনকে ব্যাখ্যা করেছে এভাবে-গ্রীসের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাম্যবাদীদের আখড়া, মার্ক্স্-বাদের চর্চা চরমে। গ্রীসে আওয়াজ উঠেছে সংবাদ ও সাংবাদিক হবে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত। ভিন্নমতাবলম্বীদের সহ্য করতে হয় সরাসরি প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ। আর প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাজ সেই উগ্র কমিউনিস্ট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের একজন ছিলেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বরাবরই গ্রীক সঙ্কটকে কিছুটা এড়িয়ে গেছে, যাতে ইস্যুটা বিশ্বব্যপী খুব একটা গুরুত্ব না পায়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বৈশ্বিক পুঁজিবাদী মহলকে গ্রীসের নবগঠিত সরকারের বিরুদ্ধে এবার ভোট (শাস্তি) দেয়ার উস্কানি দিয়ে বিরাট এক কলাম লিখে ফেলছে। মার্কিন মুলুকের প্রভাভশালী দু’টো পত্রিকাই ‘চরমপন্থী অর্থমন্ত্রী’ ইয়ানিস ভাকুফারিসকে যথেষ্ঠ দেখে নিয়েছে। সমালোচনা করেছেন ‘গ্রীক ট্র্যাজিডির খলনায়ক’ বলে, অথবা ‘উদারবাদী মার্ক্সিস্ট’ বা ‘নাস্তিক ধর্মগুরু’ নামক বিভ্রান্তিকর উপাধি দিয়ে।

গ্রীসের সঙ্কট বিষয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রপাগান্ডা উদ্দেশ্যমূলক ও অনেকটা বানোয়াট। চলমান বিশ্বব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সার্থে তাদের এই দৌড়-ঝাপ। গায়ের জোরে চাপিয়ে দিতে চায় তাদের ‘ওয়ান সাইজ ফিট ফর অল’ নীতি। পালা-বদলানোর সময় ঘনিয়ে আসছে। আস্ফালিত পুঁজিবাদের বড় এক ধাক্কা খাওয়ার গল্প। খুব একটা মন্দ না!
ক্ষুধার রাজ্যে গ্রীস রাশিয়াময়, পুঁজিবাদের চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।

সময়ই বলে দিবে মানব সভ্যতার প্রাচীনতম জনপদটির ভাগ্যে কি লেখা আছে? সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো অথবা আলেকজান্ডারদের উত্তরসুরিদের এই সমকালীন ট্রাজেডির শেষ কোথায়?

লেখক: দৈনিক দ্য বাংলাদেশ টুডের ফীচার সহ-সম্পাদক। ইমেইল: [email protected]