মেইন ম্যেনু

ঘাড়ের ব্যথায় লেজার চিকিৎসা

মানুষের শারীরিক সমস্যার মধ্যে ঘাড়ের ব্যথা অন্যতম। নানা কারণে সব বয়সী মানুষই এ সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। মূলত মেরুদণ্ডের হাড় বা ডিস্কের সমস্যা দেখা দিলে তীব্র ঘাড় ব্যথা অনুভূত হয়।

মানুষের মেরুদণ্ড ছোট ছোট অনেকগুলো হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এই হাড়গুলোর প্রতিটিকে আলাদা আলদাভাবে কশেরুকা (ভাটিব্রা) বলা হয়। প্রতি দুটি কশেরুকার মাঝে চাপ শোষণকারী ডিস্ক থাকে যা মেরুদণ্ডের এক হাড় থেকে অন্য হাড়কে আলাদা রাখে ও নড়াচড়া করতে সাহায্য করে। আবার দু’টি শক্ত হাড়ের মাঝে থাকে নরম হাড় (ইন্টারভার্টেব্রাল ডিস্ক) যা স্প্রিং বা শক এবজরভারের মতো কাজ করে। এসব হাড় কিংবা ডিস্কের সমস্যা থেকেই দীর্ঘমেয়াদী ঘাড় ব্যথা দেখা দেয়।

সাধারণত ভারি জিনিস উঠানো, আঘাত, শরীরের বিশেষ অবস্থায় ঝাকি খাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ডিস্কের স্থানচ্যুতির (প্রোলাপ্স) কারণে সংলগ্ন মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) অথবা স্নায়ুমূল (নার্ভরুট) অথবা উভয়ের উপরেই চাপ পরতে পারে।

ঘাড়ে (সারভাইকাল) উৎপন্ন স্নায়ুগুলো ঘাড় থেকে হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে। কাজেই ঘাড়ের ডিস্ক প্রোল্যাপ্সে প্রাথমিক পর্যায়ে ঘাড়ের ব্যথার পাশাপাশি ডান বা বাম হাত বা উভয় হাতে ব্যথা অনুভূত হতে পারে। লাম্বার ডিস্ক প্রোল্যাপ্সের মত এখানেও হাত ঝিন-ঝিন, শিন-শিন করে, হাতের বোধশক্তি কমে যায়। এক পর্যায়ে হাত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এমনকি হাত-পা উভয়ই দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

মেরুদণ্ডের নরম হাড় বা ইন্টারভার্টেব্রাল ডিস্ক গঠনগতভাবে নিউক্লিয়াস প্যালপোসাস (কেন্দ্রমধ্যস্থিত জেলির মতো পদার্থ) এবং অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস (চারপাশের শক্ত ফাইবার বা আঁশ ও ছোট ছোট রক্তানালী) দিয়ে তৈরি। মানুষের দাঁড়ানো অবস্থায় বা ওজন বহনকালে কেন্দ্রে থাকা জেলির উপর চাপ পড়ে কিন্তু শক্ত অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস সেই চাপ নিয়ন্ত্রণ করে ডিস্কের গঠন ঠিক রাখে। কিন্তু বেশি ওজন বহনে বা অনিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ায় নিউক্লিয়াস প্যালপোসাসের উপর মাত্রাতিরিক্ত বা অসম চাপ পড়লে সেই অতিরিক্ত চাপ অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে নিউক্লিয়াস প্যালপোসাস অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস এবং কখনও কখনও অ্যানিউলাস ফাইব্র্যোসাস ছিড়ে কোন একদিকে বের হয়ে আসে। ফলে মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড) অথবা স্নায়ুমূল (নার্ভরুট) অথবা উভয়ের উপরেই চাপ পড়ে।

১৯৩৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিতে পিঠের চামড়া, মাংস ও হাড়ের মাঝখান দিয়ে কেটে বেরিয়ে আসা বা প্রোল্যাপসড নিউক্লিয়াস প্যালপোস্যাসের অংশটুকু তুলে এনে স্নায়ূ বা স্নায়ু রজ্জুর চাপকে প্রশমিত করা হয়। এছাড়া নিয়মিত ফিজিওথেরাপি গ্রহণের মাধ্যমে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। গবেষণা বা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, পারকিউটেনিয়াস লেজার ডিস্ক ডিকম্প্রেশনের (পিএলডিডি) মাধ্যমে নির্দিষ্ট মাত্রার ও নির্দিষ্ট ধরনের লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে অতি সহজেই নিউক্লিয়াস প্যালপোসাসের অংশবিশেষ বাষ্পায়িত করে এর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব। ফলে স্থানচ্যুত (প্রোলাপ্সড) ডিস্ক পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে এবং স্পাইনাল কর্ড ও নার্ভরুটের উপর থেকে চাপ কমে রোগী স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

এছাড়া লেজারের অপটো-থারমো মেকানিক্যাল স্টিমুলেশনের মাধ্যমে ছিড়ে যাওয়া অ্যানিউলাস ফাইব্রোসাসের পুরো ক্ষমতা রিপেয়ার বা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই পদ্ধতিতে হাড়, মাংস ও চামড়া কাটার যেমন প্রয়োজন হয় না, তেমনি রোগীকে অজ্ঞান করারও প্রয়োজন হয় না। ফলে, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগীর ক্ষেত্রেও লেজার সার্জারিতে তেমন কোন সমস্যা দেখা দেয় না। আর হাড়-মাংস না কাটার ফলে লেজার প্রয়োগের স্থানও দূর্বল হয় না এবং কোন ক্ষতচিহ্নও (স্কার) থাকে না, যে কারণে ভবিষ্যতে এই অংশে স্কারের টানের কোন ব্যথা অনুভূত হয় না।

উন্নত বিশ্বে ডিস্ক প্রোল্যাপ্সের বেশির ভাগ রোগীরই এখন আর কেটে অপারেশন করা হয় না। সারভাইক্যাল/লাম্বার ডিস্ক প্রোলাপ্সের বেশীর ভাগ রোগীই পারকিউটেনিয়াস লেজার ডিস্ক ডিকম্প্রেশনের (পিএলডিডি) মাধ্যমে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, এই চিকিৎসায় যে ধরনের বা যে মাত্রার লেজার রশ্মি ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাতে কোনো রকম পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকে না বললেই চলে। আমেরিকার ফেডারেল ড্রাগ অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন ইতোমধ্যেই পিএলডিডিকে নিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশেও হাড় ও মাংস না কেটে ঘাড় ব্যথাসহ মেরুদণ্ডের সমস্যার চিকিৎসা অত্যন্ত সফলভাবে করা হচ্ছে।



« (পূর্বের সংবাদ)