মেইন ম্যেনু

ঘোর অমানিশায় বেগম রোকেয়ার জন্মভূমী রংপুরের পায়রাবন্দ

নারী জাগরণের অগ্রদূত, বাঙ্গালি মুসলামান নারী মুক্তির পথরেখা সৃষ্টিকারী মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া। অবরোধ বাসিনীদের নিয়ে প্রচেষ্টাকারী, সমাজ সংস্কারক, নারী সমাজের অহংকার বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দের খোর্দ্দ মুরাদপুর গ্রামে জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তার পিতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার, মাতার নাম রাহাতুন্নেছা সাবের চৌধুরানী। খাঁন বাহাদুর সাখাওয়াত হোসেন সাহেবের সাথে অল্প বয়সে বিয়ে হয় রোকেয়ার। মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি স্বামী হারান।

তার জীবনদশায় অবরোধ বাসীনি, অর্ধাঙ্গী, সুলতানার স্বপ্ন, মতিচূর ছাড়াও অসংখ্য বই লিখেছেন বেগম রোকেয়া। ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি কোলকাতায় মারা যান। কোলকাতার শোদপুরে সমাহিত করা হয় রোকেয়াকে। হাত ছাড়া হয়ে যায় তাদের লাখেরাজ। শুধু সামান্য ইটের ধ্বংসাবশেষ অবশিষ্ট রয়েছে। বর্তমানে ঘোর অমানিশায় রোকেয়ার জন্মভূমি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ।

তৎকালীন নারী কল্যান সংস্থার সভাপতি কবি সুফিয়া কামাল বেগম রোকেয়ার বসতভিটা সংলগ্ন ৩০ শতক জমি দান সূত্রে ক্রয় করেন। পরবর্তীতে ধ্বংসস্তুপ গুলো রক্ষার জন্য একটি বেষ্টনীর ব্যবস্থাসহ সেখানে একটি ডাক বাংলো স্থাপিত করা হয়। বর্তমানে বেহাল দশায় পরিণত হয়েছে ডাকবাংলোটি ।

১৯৭৪ সাল থেকে রোকেয়াকে স্বরণ করে রোকেয়া দিবস পালন করে পায়রাবন্দবাসী। সরকারীভাবে ১৯৯৪ সাল থেকে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ঘনঘটা করে দিবসটি পালন করা হয়। সেই সাথে ৯-১১ ডিসেম্বর তিন দিন ব্যাপী বসে রোকেয়া মেলা।

পথিকৃত বেগম রোকেয়ার চিন্তা চেতনাকে জাগ্রত করতে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের ভিত্তি প্রস্তরের উদ্বোধন করেন। প্রায় সোয়া ৩ একর জমিতে পৌণে চার কোটি টাকা নির্মান ব্যায় হয় স্মৃতি কেন্দ্রের। যা ২০০১ সালের ১লা জুলাই উদ্বোধন করার পর রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় উপ-পরিচালক সহ ১৩ জন কর্মকর্তা কর্মচারীকে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

যা মাত্র ২ বছর চলতে না চলতেই তত্বাবধায়ক সরকার আমলে বন্ধ হয়ে যায় । রোকেয়ার জীবন কর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলীর অনুবাদ, সংস্কৃতি চর্চা ভেস্তে যায়। নিয়োগকৃত কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা না পেয়ে শুরু হয় মানবেতর জীবন-যাপন।

বন্ধ হয়ে যাওয়া স্মৃতি কেন্দ্রে আশীন হয়ে বসে বিকেএমইএ নামের পোষাক শ্রমিক তৈরীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এর পর ২০০৮ সালে পোষাক শ্রমিক তৈরীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তৎকালীন সেনা প্রধান মঈন-উ-আহমেদ।

পরে মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার স্মৃতি রক্ষার্থে গড়ে তোলা স্মৃতি কেন্দ্রের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য ব্যহত করে সেখানে বিকেএমইএ এর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ এবং উচ্ছেদ করার জন্য হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী হাইকোর্টে একটি রীট করেন। এরই প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিকেএমইএ এর কারখানা বন্ধের আদেশ দিলে ওই বছরের ১ মে বিকেএমইএ এর কারখানা উচ্ছেদ করে মিঠাপুকুর উপজেলা প্রশাসন ।

সংস্কৃতি মন্ত্রনালয় ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মধ্যে স্মৃতি কেন্দ্রটি টানা হেচড়ার ফলে একদিকে স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় অন্যদিকে কষ্টের প্রহর গুণতে থাকে সেখানকার নিয়োগকৃত উপ-পরিচালক সহ নিয়োগপ্রাপ্তরা।

এক পর্যায়ে উপ-পরিচালক আব্দুল্যা-আল-ফারুক সহ অন্যান্যরা হাইকোর্টে একটি রীট করেন। যার রীট নং ৯২২৬/২০০৮। এরই ফলশ্রুতিতে চলতি বছরের ১৭ মে হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে উপ-পরিচালকসহ ৬ জনের চাকুরী রাজস্বখাতে নেয়ার নির্দেশ দেয় সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়কে। রায়ের ছয় মাস অতিবাহিত হলেও বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি তালাবদ্ধ রয়ে গেছে। বাস্তবায়ন ঘটেনি রায়ের। এদিকে, বন্ধ রয়েছে বেগম রোকেয়ার জন্মভূমিতে হস্ত ও কুটির শিল্প কার্যক্রম ।

স্থানীয় মানুষের দাবী ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একীভূত করে সরকারী ভাবে পরিচালনা করার। কিন্তু সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে জানান স্মৃতি সংসদের সাধারন সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল। তিনি আরও বলেন, মনে হয় শুধু রোকেয়া দিবসের জন্যই স্মৃতি কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে। দিবসটি পার হলেই এর খবর কেউ রাখেনা। স্মৃতি কেন্দ্রটি চালু করার জোর দাবি জানান তিনি।

বেগম রোকেয়ার ভাতিজি অবসর শিক্ষক রনজিনা সাবের জানান, আমাদের সরকারীভাবে কোন খোঁজ খবর নেয়া হয় না। তিনি বেগম রোকেয়ার বেহাবশেষ কোলকাতা থেকে পায়রাবন্দে আনায়ন সহ স্মৃতি কেন্দ্রটি অবিলম্বে চালু করার জোর দাবি জানান।

বেগম রোকেয়ার স্মৃতি কেন্দ্রে উপ-পরিচালক আব্দুল্যা-আল-ফারুক জানান, মন্ত্রি মহোদয় হাইকোর্টের রায়টি বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিক রয়েছে। এটি ধ্রুত বাস্তবায়ন হবে বলে আমরা আশা করছি।