মেইন ম্যেনু

চরম নেতৃত্বশূন্যতায় বিএনপি…

ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জেলে যাওয়ার তিন দিন পর খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার রাতে একটি বিবৃতি পাঠায় বিএনপি। সমন্বয়ের অভাব, রেষারেষি আর দলের বিশৃঙ্খল নেতৃত্ব বিবৃতি প্রেরণ বিলম্বিত করে। লন্ডন থেকে বিএনপি-প্রধানের কড়া বার্তা পাঠানোর পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তড়িঘড়ি করে মির্জা ফখরুল ও স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায়ের জেলে যাওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়। বিলম্বিত বিবৃতিই শুধু নয়, সর্বক্ষেত্রেই বিএনপির ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডনে যাওয়ার পর থেকেই বিএনপিতে চরম নেতৃত্বশূন্যতা চলছে। ক্রমেই নেতা-কর্মীরা হতাশ হচ্ছেন। বাইরে থাকা নেতারা নিজেদের গা বাঁচিয়ে চলছেন। বক্তৃতা-বিবৃতিতে সরকারের বিরুদ্ধে ‘শক্তভাবে’ এখন আর কেউ কথা বলতে সাহস পান না। এ নিয়ে লন্ডন থেকে নেতাদের সতর্ক করা হলেও নিজেদের মতো করেই চলছেন সবাই। খুব শিগগিরই খালেদা জিয়া দেশে না ফিরলে বিএনপিতে পুরোপুরিভাবে ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।

দলে নেতৃত্বশূন্যতার বিষয়টি উড়িয়ে দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ। তিনি বলেন, ‘ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) অনুপস্থিতিতে বলা ঠিক হবে না- বিএনপিতে নেতৃত্বশূন্যতা চলছে। সম্প্রতি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর রায় জেলে গেছেন। আমরা সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আশা করছি, আগামী ১০ নভেম্বর দেশে ফিরবেন চেয়ারপারসন। তিনি ফিরলেই দলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আরও জোরালো হবে। দলের সব কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলবে।’

দলের চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মোফাজ্জল করিম অবশ্য বলেছেন, দল সুশৃঙ্খলভাবে চলছে না। তিনি বলেন, ‘অতীতের চেয়ে বিএনপি এখন সাংগঠনিক কাঠামোয় দুর্বল হয়ে পড়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে দলটি পরিচালিত হচ্ছে না। শীর্ষ নেতৃত্বকে এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে গোছাতে হবে। বেশ কিছু দিন ধরেই দলের মধ্যে সংহতির অভাব রয়েছে। দলের মধ্যে নানা মত থাকতেই পারে। কিন্তু কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবেই দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’

বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা বলছেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপি-প্রধানের দেশে ফেরা এখন জরুরি। নইলে মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা আরও হতাশ হয়ে পড়বেন। শমসের মবিনের মতো অনেকেই চাপ সইতে না পেরে দল থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে দল ভাঙার তৎপরতা। খালেদা জিয়া দেশে ফিরে শক্ত হাতে লাগাম টেনে না ধরলে ওয়ান-ইলেভেনের মতো বিএনপি থেকে ‘সুবিধাবাদী’ একটি অংশ বেরিয়ে যেতে পারেন। বাইরে থাকা সংস্কারপন্থিদের একটি গ্রুপ ছাড়াও সরকারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে নানা তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাদের।

জানা যায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আর এ গণি, এম শামসুল ইসলাম ও সারওয়ারী রহমান অসুস্থতার কারণে বাসা-হাসপাতালেই দিন কাটাচ্ছেন। পুত্রশোকে কাতর ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ১ মাস ১০ দিন দেশের বাইরে অবস্থান করেন। গত বৃহস্পতিবার দেশে ফিরলেও চুপচাপ রয়েছেন।
মামলার হুলিয়া নিয়ে আড়ালে রয়েছেন তরিকুল ইসলাম, মির্জা আব্বাস ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া।
গ্রেফতারের কোনো ঝুঁকি না থাকলেও লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং নজরুল ইসলাম খান চলছেন সতর্কভাবে।
ইতালীয় নাগরিক তাভেলা সিজার হত্যাকাণ্ডের পর এক বক্তব্য দেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনার পর চুপসে গেছেন ড. আবদুল মঈন খান।
কুমিল্লায় এক মামলায় হাজিরা দিতে গিয়ে জেলে রয়েছেন বিএনপির ‘অসুস্থ’ নেতা এম কে আনোয়ার।
যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী।
স্থায়ী কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও অবস্থান করছেন লন্ডনে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের যখন এ অবস্থা, তখন বিএনপির মাঠ ও কেন্দ্রীয় অন্য নেতৃত্বের বিষয়টি সহজেই বোঝা যায়। খালেদা জিয়া দেশের বাইরে যাওয়ার পর দলের নীতিনির্ধারণী কিংবা দলীয় দায়িত্ব কার হাতে তা-ও স্পষ্ট নয়। দলের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলেও তাকিয়ে থাকতে হয় লন্ডনের দিকে। দলের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে চান না কোনো নেতাই। অবশ্য মাঠ পর্যায়ের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দেখভাল করছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান। তিনিও এক সপ্তাহ ধরে ব্যাংককে চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফিরেছেন।

দলের ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে বিচারপতি টি এইচ খান, এম মোরশেদ খান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, রাবেয়া চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট হারুন আল রশিদ অসুস্থ। নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন সাদেক হোসেন খোকার এক মামলায় ১৩ বছর জেল হয়েছে। আপাতত তার দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশ ছেড়েছেন কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। সম্প্রতি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন শমসের মবিন চৌধুরী।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘদিন ধরে জেলে আবদুস সালাম পিন্টু। মারা গেছেন সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ।
বাইরে থাকা আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, বেগম সেলিমা রহমান ও মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদের দলীয় কর্মকাণ্ড চোখে পড়ার মতো নয়।

যুগ্ম মহাসচিব আমান উল্লাহ আমান ও অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এখনো জেলের ঘানি টানছেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ এখনো আইনি লড়াইয়ে ভারতের শিলংয়ে অবস্থান করছেন। মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে আড়ালে রয়েছেন যুগ্ম মহাসচিব বরকত উল্লা বুলু।
সদ্য জেল থেকে বের হওয়া মিজানুর রহমান মিনুও চলছেন সতর্কভাবে। আইন-আদালত নিয়ে ব্যস্ততা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, গোলাম আকবর খোন্দকার, মশিউর রহমান, হারুন অর রশীদ ও মজিবর রহমান সরোয়ার। এর মধ্যে দু-এক জন বাদে বাকিদের ভূমিকা নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন। ক্ষুব্ধ খোদ বেগম খালেদা জিয়াও।

এদিকে এখনো হদিস মেলেনি সিলেট বিএনপির জনপ্রিয় নেতা সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর। আন্তর্জাতিক সম্পাদকদের মধ্যে বর্তমানে বিএনপির মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছেন ড. আসাদুজ্জামান রিপন। তার বিরুদ্ধেও দলের এক অংশের হাজারো অভিযোগ। আরেক অংশ তার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। দেশের বাইরে আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মারা গেছেন কমর উদ্দিন আহমেদ। বাকি রয়েছেন গিয়াস কাদের চৌধুরী, লুৎফুর রহমান খান আজাদ, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন ও জাকারিয়া তাহের সুমন। তাদের কারও কারও ভূমিকা নিয়েও নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রশ্নের শেষ নেই।

জানা যায়, ৩৮৬ সদস্যের নির্বাহী কমিটির অন্য নেতাদের ক্ষুদ্র একটি অংশ ছাড়া প্রায় সবাই নিষ্ক্রিয়। আবার কেউ কেউ চলছেন গা বাঁচিয়ে। এদের অনেকেই সরকারি দলের নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে আঁতাত করে চলছেন। বিগত আন্দোলনে বড় একটি অংশেরই ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অবশ্য তৃণমূলে সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর এই নেতারা পকেট কমিটি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কেন্দ্রে এমনকি লন্ডনেও যোগাযোগ করছেন অনেকে।

তবে বিএনপি-প্রধান বেগম জিয়া বলেছেন, কোনো পকেট কমিটি করা যাবে না। সক্রিয়দের কমিটিতে রাখতে হবে। অদক্ষ ও অযোগ্যদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও ত্যাগী নেতাদের সব কমিটিতে সম্পৃক্ত করতে হবে।