মেইন ম্যেনু

চাপে থাকলেও রামপাল নিয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সরকার

চাপে থাকলেও রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সরকার। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে কার্বন নিঃসরণে সুন্দরবন হুমকির মুখে পড়বে, এই আশঙ্কা করে বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলো শুরু থেকেই সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করে বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলো লংমার্চসহ ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে। পরিবেশবাদীরাও রামপাল ইস্যুতে রয়েছেন সরকারবিরোধী অবস্থানে। বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশও রামপাল নিয়ে সরকারের সমালোচনায় মুখর।

সম্প্রতি এ ইস্যুতে সরকারবিরোধী অবস্থানে যুক্ত হয়েছে দেশের তরুণরাও। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারবিরোধী একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে এতদিন চুপ থাকলেও সম্প্রতি সংসদের বাইরে থাকা বিএনপিও মুখ খুলতে শুরু করেছে। রামপাল ইস্যুতে বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে অবস্থান তুলে ধরার ইঙ্গিত দিয়েছে। এক্ষেত্রে দলটির পক্ষ থেকে আন্দোলনের ঘোষণা আসতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। এসব হিসাব-নিকাশ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে চাপে ফেলে দিয়েছে ক্ষমতাসীনদের।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবনের অদূরে বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুই দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিও সম্পাদিত হয়েছে। ২০১৮ সালে এ কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এদিকে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বছরের শুরু দিকে সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘দেওয়ার উড বি সাম ইমপ্যাক্ট, অবভিয়াসলি’ (অবশ্যই কিছু প্রভাব পড়বে)। ‘এত নৌকা আসবে, ক্যারিং সো মাচ কোল; এই নৌকা আসার ফলেই তো ফ্লোরা-ফনা ভেরি সাবস্টেনশিয়ালি অ্যাফেক্টেড হবে। তবু এটা না হওয়ার এখন মনে হয়, পসিবিলিটি নেই।’

এই নিয়ে বছরের শুরুতে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, ‘মৈত্রী সুপার থারমাল পাওয়ার প্রজেক্ট নিয়ে একটি মহল ও কতিপয় ব্যক্তি বা সংগঠন বিভ্রন্তিমূলক তথ্য প্রচার চালাচ্ছে, যা ভিত্তিহীন, দেশের স্বার্থবিরোধী ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস ছাড়া কিছু নয়।’

নসরুল হামিদ বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে অত্যাধুনিক আল্ট্রা সুপার থারমাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ফলে এখান থেকে পরিবেশ দূষণকারী কালো ধোঁয়া তৈরি হবে না বা ছাই উড়ে বায়ু দূষণেরও সম্ভাবনা নেই। সমুদ্র থেকে নদী পথে কয়লা বহনের সময় তা আচ্ছাদিত থাকবে বলে সেখান থেকেও দূষণের আশঙ্কা থাকবে না।’

নীতি-নির্ধারণী সূত্রগুলো জানায়, শুধু দেশি চাপে নয়, বিদেশি চাপও রয়েছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে। রামপাল নিয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে ইতোমধ্যে খানিকটা বোঝাপড়ার গরমিল সৃষ্টি হয়েছে চীনের সঙ্গে। তবে চীনের সঙ্গে বোঝাপড়া গরমিল মীমাংসা করতে মঙ্গলবার (২৩ আগস্ট) জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল চীন গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে চীনকে বশে আনতে পারবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এ প্রতিনিধি দলটি। জানা গেছে, দেশের ভেতরে একটি বড় অংশ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন। চীন সফরের আগে সোমবার (২২আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৈয়দ আশরাফুল ইসলঅমের নেতৃত্বে দেখা করেন চীন সফরকারী প্রতিনিধির দলের সদস্যরা। ওই প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ‘সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী রামপাল বিদুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি বলেন, রামপাল বিদুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যে বক্তব্য দিয়েছেন, এর কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী।’

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে—এটা সত্য। তবে সব কিছু ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’ ওই মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর একটাই লক্ষ্য দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি। দেশের অগ্রগতির স্বার্থে এটি করা হচ্ছে। তাই যত বাধা-বিপত্তিই আসুক না কেন শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের জন্যে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন।’

জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে দেশে একটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। যারা দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি চায় না, তারাই রামপালের বিরুদ্ধে।’ তিনি বলেন, ‘রামপাল নিয়ে বিভিন্ন মহল না বুঝেই বিরোধিতা করছে।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজি জাফরউল্যাহ বলেন, ‘রামপালের ইতিবাচক-নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে এখনও দেশের বিরোধিতাকারীরা ওয়াকিবহাল নয় বলে মনে করি।’ তিনি বলেন, ‘আজ যারা পরিবেশ নিয়ে কথা তুলছেন, সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে বলে আওয়াজ তুলছেন, তারা অনেকটা হুজুগে কথা বলছেন। যে দলের নেতৃত্বে এদেশের স্বাধীনতা এসেছে সে দল দ্বারা এদেশের কোনও ক্ষতি হবে না। এটা সবাইকে বুঝতে হবে।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, ‘‘রামপাল ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে দেখার চেষ্টা চলছে। ‘এন্টি ইন্ডিয়া’ ও ‘আউট অব ফ্রাস্টেশন’ সরকারকে বেকায়দায় ফেলা যায় কিনা।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি রাজনৈতিক হতাশা থেকে রামপালের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে। তারা চায় এ ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে কিনা। বিএনপি রাজনীতিতে ফিরে আসার জন্য এই চেষ্টা করছে। তাছাড়া একেকটি সংগঠন, ব্যক্তি একেকটি দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে এর বিরোধিতা করছে।’

নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, ‘বামপন্থীরা যেটা করছে, এটা ঠিকই আছে যে রামপাল করতে গেলে প্রকৃতি ও জলবায়ুগত কতগুলো জটিলতা তৈরির সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগগুলো যেন কার্যকর না হয়, তার জন্য সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিচ্ছে তা যথেষ্ট। যে প্রাকৃতিক ও জলবায়ু সমস্যা সৃষ্টি না করেই রামপাল করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘‘রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র করার বিরুদ্ধে বামপন্থীদের যে ভূমিকা সেটার সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা নেই। এটা হলো বামপন্থীদের অনুসারী কিছু ‘অ্যাক্টিভিস্ট’, বুদ্ধিজীবী ও কিছু ‘কনফিউসড’ লোকজনও এটার মধ্যে আছে। এটার মধ্যে যে আশঙ্কাগুলো তারা করছে সেই আশঙ্কাগুলো সবটাই অমূলক আমি মনে করি না। কিন্তু সেই আশঙ্কাগুলো দূর করার জন্য সরকারের মধ্য থেকে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হবে বলে ‘ক্যাটাগরিক্যালি’ বলা আছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ১০ দফা বিবৃতি দিয়ে তারা বলছে যে, এই এই ক্ষেত্রে যে ধরনের ক্ষতিকর হতে পারে, সেগুলোর জবাবে পরিকল্পিত ব্যবস্থা রয়েছে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সুতরাং এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার পরে আর কোনও প্রশ্ন থাকার কথা নয়।’’ তিনি বলেন, ‘‘কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে তোমরা যে ব্যবস্থা নিয়েছ, এগুলো যথেষ্ট নয়, এখানে আরও বিভিন্ন বিষয় যুক্ত করা দরকার। ‘ইট ক্যান বি ডিসকাস’। কিন্তু ওরা যেটা করছে, রামপাল হতে দেব না। এটা সঠিক নয়। এটা সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার।’’ লেনিন বলেন, ‘পৃথিবীতে কার্বন নিঃসরণ সবচেয়ে বেশি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, চীনে। বাংলাদেশে কার্বন নিঃসরণ হয় মাত্র ২ শতাংশ।’