মেইন ম্যেনু

জঙ্গিদের ডিএনএ পরীক্ষা থেকে যা জানতে পারবে পুলিশ

জন্ম পরিচয়, মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, তালিকায় থাকা জঙ্গি আর নিহত জঙ্গি একই ব্যক্তি কিনা, তা জানতেই জঙ্গিদের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) পরীক্ষা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জঙ্গি মামলাগুলোর তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরইমধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত জঙ্গিদের জন্ম পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এ পরীক্ষার মাধ্যমে এসব তরুণের জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া, তাদের নৃশংসতার কারণ এবং গুলশানে হামলাকারী জঙ্গিরা সেদিন কোনও ড্রাগ নিয়েছিল কিনা, সে বিষয়টিও জানা যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই কারণগুলো জানতে এরইমধ্যে আমেরিকার তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) ফরেনসিক ল্যাবেও এই ডিএনএ নমুনার পরীক্ষা চলছে বলে জানায় পুলিশ।

গত ১ জুলাই শুক্রবার রাতে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় জঙ্গিরা। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে জঙ্গিদের ছোড়া বোমা ও গুলিতে নিহত হন বনানী থানার ওসি সালাহ উদ্দিন খান ও গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার রবিউল করিম। এছাড়া পুলিশের আরও ২৬জন সদস্য আহত হয়েছিলেন ওই জঙ্গি হামলায়। এছাড়া ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে জঙ্গিরা। পরদিন শনিবার সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গিসহ ছয় জন। যাদের একজন হলি আর্টিজানের শেফ সাইফুল ইসলাম চৌকিদার। তিনি জঙ্গিদের সহযোগী বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান একই রেস্টুরেন্টের কর্মচারী জাকির হোসেন শাওন। তাকেও জঙ্গিদের সহযোগী সন্দেহে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পুলিশ পাহারায় রাখে।

ঘটনার তদন্ত ও নিহতদের ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের নৃশংসতা ছিল গা শিউরে ওঠার মতো। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও অনেককে কুপিয়েছে জঙ্গিরা। জঙ্গিরা এতজন মানুষকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনার আগে কোনও বলবর্ধক ওষুধ সেবন করেছিল কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট এ ঘটনার সরাসরি তদন্ত করছে। তাদের সহায়তায় ছায়া তদন্ত করছে র‌্যাব ও পিবিআইসহ অন্য সংস্থাগুলো।

ঘটনার ও জঙ্গিদের কার্যকলাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ কারণ জানতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের ইনস্পেক্টর হুমায়ুন কবির সোমবার ঢাকার সিএমএম কোর্ট থেকে জঙ্গি ও তাদের স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি নেন গত ১২ জুলাই। এরপর জঙ্গি ও তাদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পুলিশ। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে এ ঘটনার আলামতগুলোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক ল্যাবেও ডিএনএসহ জঙ্গিদের শরীরের অন্য উপকরণগুলোর পরীক্ষা করা হয়েছে।

তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান, কারও প্রতি ক্ষোভ কিংবা পূর্ব-শত্রুতা থাকলে সাধারণত খুনিরা নৃশংসতা দেখায়। কিন্তু এমন কিছুই নেই। কিন্তু ভিন্ন মতাদর্শ ও ভিন্ন ধর্মের লোক হওয়ার কারণে প্রতিপক্ষের ওপর এমন নৃশংসতার বিষয়টি বিস্মিত করেছে সবাইকে। ঘটনার পরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা ও সদস্য হলি আর্টিজানে গিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই বলেছেন, এমন নৃশংসতা ও বিভৎসতা এর আগে কখনও তারা দেখেননি। ময়নাতদন্ত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও জঙ্গিদের নৃশংসতায় হতবাক হয়েছেন। এসব কারণে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আমেরিকার তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের ফরেনসিক ল্যাবেও জঙ্গি ও তাদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কারণ, ডিএনএ মানুষের মনস্তাত্বিক গঠন ও ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণের জিনগত বিষয়টি ধারণ করে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচ জঙ্গিসহ ছয় জনের পরিচয় সম্পর্কে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। ডিএনএ’র নমুনার সঙ্গে তাদের বাবা-মায়ের ডিএনএ নমুনা মিলেছে। এছাড়া ঘটনার তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় অন্য দিকগুলোতেও ডিএনএ পরীক্ষা কাজে লাগবে। এছাড়া ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে পুলিশের ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’ অভিযানে নিহত ৯ জঙ্গির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ডিএনএ পরীক্ষাটা মূলত পরিচয় নিশ্চিত করার কাজে লাগে। এছাড়া কেউ অপরাধ করে গেলে সেক্ষেত্রে অপরাধীকে চিহ্নিত ও শনাক্ত করা যায়। কতজন অপরাধী একটি ঘটনায় অংশ নিয়েছিল সেটিও জানা যায়।’

জঙ্গিদের ডিএনএ পরীক্ষা তদন্তে কী কাজে আসতে পারে, জানতে চাইলে ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘জঙ্গিদের ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে যেমন তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা সম্ভব হবে। প্রথমে সেটা অজ্ঞাত হিসেবেই এসেছিল।’ তাদের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি জানা যাবে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি কখনও সম্ভব হয় না।’-বাংলা ট্রিবিউন