মেইন ম্যেনু

‘জন্মেছি এই দেশে’র কবি সুফিয়া কামাল

‘অনেক কথার গুঞ্জন শুনি/ অনেক গানের সুর/ সবচেয়ে ভালো লাগে যে আমার/‘মাগো’ ডাক সুমধুর।’ কবি সুফিয়া কামাল ‘জন্মেছি এই দেশে’ কবিতায় এমনি করেই তার মনের আকুতি আর স্বদেশকে নিয়ে গভীর ভালোবাসার কথা অকপটে বলে গেছেন।

কেবল প্রথিতযশা কবি ও লেখিকা-ই নন, তিনি নারীবাদীতার এবং নারী আন্দোলনেরও অন্যতম পথিকৃৎ। বেগম সুফিয়া কামালের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। সুফিয়া কামালের জন্ম ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদের এক নবাব পরিবারে। ৮৯ বছর বয়সে ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান আমারদের সবার প্রিয় কবি।

কবির গোটা জীবনটাই ছিল সংগ্রামের। তিনি যখন ছোট্ট শিশু তখন তার বাবা নিরুদ্দেশ হয়ে যান। শৈশবেই তিনি মায়ের হাত ধরে মামার বাড়ি চলে আসেন। মাতুলালয়ে প্রচুর বিলাস-বৈভব আর আদব-কায়দা সে সঙ্গে রক্ষণশীল পরিবেশে তিনি লালিত হন। সুফিয়া কামালের যে সময়ে জন্ম, তখন মুসলিম পরিবারে অনেক কিছুই নিষিদ্ধ ছিল। বিশেষ করে নারী শিক্ষা ছিল ঘোরবিরোধী। কিন্তু অদম্য স্পৃহা এবং জ্ঞান বাসনা তাকে দমন করতে পারেনি।

সুফিয়া কামাল প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা পাননি অথচ তিনি তার বড় মামার বিশাল লাইব্রেরিতে মায়ের সাহায্য নিয়ে পড়াশোনা করতেন। সেই সময় পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বেগম রোকেয়া ও সারা তৈফুরের লেখা পড়ে তার সাহিত্য সৃষ্টির বাসনা জাগে এবং সাহিত্য চর্চায় মন দেন তিনি।

নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ কবি বেগম সুফিয়া কামাল। বিংশ শতাব্দীর বাংলার নারী জাগরণের সঙ্গে এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের বিচিত্র ইতিহাসের সঙ্গে কবি সুফিয়া কামালের নাম নিবিড়ভাবে জড়িত। কবি সুফিয়া কামালের বড় পরিচয় তিনি একজন বড়মাপের কবি এবং স্বৈরশাসকবিরোধী সাংস্কৃতিক নেত্রী। মাত্র ১২ বছর বয়সে বরিশাল থেকে প্রকাশিত ‘তরুণ’ পত্রিকায় ‘সৈনিক বধূ’ নামক গল্প প্রকাশের মাধ্যমে তার সাহিত্য জগতে প্রবেশ ঘটে।

সুফিয়া কামালের বিয়ে হয় মাত্র ১২ বছর বয়সে তারই মামাতো ভাই নেহাল হোসেনের সঙ্গে। এক সময় তিনি স্বামীর সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন। পূর্ব পরিচয় থাকলেও কলকাতায় আসার পর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।

১৯৩২ সালে স্বামী নেহাল হোসেন মারা যাওয়ার পর তিনি মর্মাহত হন। শুরু হয় তার কঠিন সংগ্রামের জীবন। কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি চলে তার সাহিত্যচর্চা। ১৯৩৯ সালে তার পুনরায় বিয়ে হয় কামালউদ্দীন খানের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি হন সুফিয়া কামাল। শুরু হয় তার আবার নতুন জীবন। বরিশালের মাতৃমঙ্গল সেবাদানের কাজের মধ্য দিয়েই সুফিয়া কামালের সমাজসেবী কর্মজীবনের শুরু।

কবি বেগম সুফিয়া কামালের গোটা জীবনই ছিল কর্মময়। তিনি ছিলেন একজন স্নেহময়ী মা, আপোসহীন নেত্রী। ১৯২৫ সালে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধীজি বরিশাল এলে সুফিয়া কামাল নিজে চরকায় সুতা কেটে গান্ধীজির হাতে তুলে দেন।

তিনি ইন্ডিয়ান উইমেন্স ফেডারেশনে প্রথম মুসলিম মহিলা সদস্য। বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতীনেও কাজ করেন তিনি। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কলকাতায় লেডি ব্রেবোন কলেজে আশ্রয় কেন্দ্র পরিচালনা করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকায় নরীদের সংগঠিত করে মিছিলের আয়োজন ও মিছিলে নেতৃত্বসহ সামগ্রিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে ওয়ারী মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা এবং এর প্রথম সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬০ সালে তার নেতৃত্বে ঢাকায় ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত স্মৃতি কমিটি’ গঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী নিবাসের নাম ‘রোকেয়া হল’ করার প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠন এবং সভানেত্রীর দায়িত্ব শুরু করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা শহরেই অবরুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন।

সুফিয়া কামাল একজন মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব। এদেশের অবহেলিত, নির্যাতিত, শোষিত নারী সমাজের জন্য তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। নারীদের সাহসী, সংগ্রামী এবং আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।

তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম হল ‘সাঁঝের মায়া’, ‘একাত্তরের ডায়েরি’, ‘মায়া কাজল’, ‘উদাত্ত পৃথিবী’, ‘ইতল বিতল’, ‘কেয়ার কাঁটা’, ‘সোভিয়েত দিনগুলো’ ইত্যাদি। এক জীবনে অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন বেগম সুফিয়া কামাল। বুলবুল ললিতকলা একাডেমি পুরস্কার, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, রাশিয়ার লেনিন স্বর্ণপদক, একুশে পদক, নাসিরুদ্দীন পদক, শেরেবাংলা জাতীয় সাহিত্য পুরস্কারসহ আরো অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

পাকিস্তান সরকার সুফিয়া কামালকে `তমখা ই ইমতিয়াজ` উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭০ সালে বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের মধ্যেই তিনি মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচি কাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। ও দেশবিভাগের আগে তিনি ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদনা করেন।

‘হে কবি নীরব কেন, ফাগুন যে এসেছে ধরায়/ বসন্তে বরিয়া তুমি ল’বে না কি তর বন্দনায়?’/কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি/ দখিন দুয়ার গেছে খুলি?/ বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল /দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?’ কবি সুফিয়া কামালের ‘তাহারেই মনে পড়ে’ কবিতার অংশ এটি। পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় আমরাও কবিকে মনে করি। নারী ও মানবাধিকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পুরোধার মৃত্যুবার্ষিকীতে তার আত্মার শান্তি কামনা করি।