মেইন ম্যেনু

জাকাত দেওয়ার শ্রেষ্ঠ সময়

পবিত্র মাহে রমজানের আজ ১৫তম দিবস। দেখতে দেখতে রমজানের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেল। পবিত্র রমজানের মাগফিরাতের দশকেরও পঞ্চম দিবস আজ। অন্যদিকে পবিত্র এ মাসের তৃতীয় জুমআ’র দিনও আজ। সঙ্গত কারণে এ দিনটি বিশেষ গুরুত্বের। পবিত্র রমজানে দানের গুরুত্ব যেমন অনেক, তেমনি জাকাতের গুরুত্বও অনেক।

জাকাত আদায় করলে যেমন মানুষের উপার্জিত সব সম্পদ পবিত্র হয়, তেমনি রমজান মাসে রোজা পালন করলে সারা শরীর পবিত্র হয়ে যায়। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের জাকাত প্রদান করে, তার সম্পদের দোষ দূর হয়।’ বস্তুর পবিত্রতা হাসিলের জন্য যেমন জাকাত প্রদান করতে হয়, তেমনি মানুষের শরীর তথা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য সত্যিকারের সিয়াম পালন করতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রত্যেক বস্তুরই একটি জাকাত রয়েছে, আর মানুষের দেহের জাকাত হলো রোজা।’ (ইবনে মাজা)

জাকাত প্রদান করলে জাকাতদাতার ধন-সম্পদ কিছু কমে না, বরং আল্লাহ এতে অনেক বরকত দান করেন এবং তা বহু গুণ বেড়ে যায়। ইসলামে ধন-সম্পদ বণ্টনের মূলনীতি সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘ধন-সম্পদ যেন শুধু তোমাদের ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭)

জাকাত দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমজান মাসই জাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়। রমজান মাসে যেকোনো ধরনের দান-সদকা করলে অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ গুণ বেশি নেকি হাসিল হয়। যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটি নফল ইবাদত করেন, তবে তিনি মাহে রমজানে একটি ফরজ ইবাদতের সমান সওয়াব পাবেন। যিনি একটি ফরজ আদায় করবেন, তিনি অন্যান্য মাসের ৭০টি ফরজের সমান সওয়াব পাবেন। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে রমজান মাসই অধিক সওয়াবপ্রাপ্তির জন্য জাকাত দেওয়ার উপযুক্ত মৌসুম ও শ্রেষ্ঠ সময়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘জাকাত ইসলামের সেতু।’ (মুসলিম)

রোজাদার ধনী লোকেরা অসহায়দের জাকাত প্রদান করার কারণে সমাজের গরিব-নিঃস্ব ব্যক্তিরা দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে রেহাই পায় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। রমজান মাসে ধনী লোকেরা দরিদ্রদের জাকাত প্রদানের কারণে উভয় শেণির মানুষের মধ্যে লেনদেন হয় এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে।

সারা বছর নিজের ও পরিবারের যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে যদি কোনো মুসলমানের কাছে নিসাব পরিমাণ অর্থাৎ বছরের আয় থেকে ব্যয় বাদ দিয়ে যদি কমপক্ষে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য অথবা সমমূল্যের ধন-সম্পদ থাকে, তবে তার সম্পদের শতকরা আড়াই টাকা হিসাবে আল্লাহর নির্ধারিত খাতে গরিব-মিসকিনদের মধ্যে বণ্টন করতে হয়, এটাই হলো জাকাত।

আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক ধন-সম্পদের ৪০ ভাগের ১ ভাগ অসহায় গরিব-দুঃখীদের জাকাত প্রদান করে রোজাদার আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে থাকেন। জাকাত গরিবের প্রতি ধনীর অনুগ্রহ নয়, বরং তা গরিবের ন্যায্য অধিকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন, ‘তাদের (সম্পদশালীদের) ধন-সম্পদে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে।’ (সূরা আল-জারিআত, আয়াত: ১৯)

নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা জাকাত আদায় করে, তখন ফেরেশতারা তার জন্য এ দোয়া করেন- হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি তোমার পথে খরচ করছে, তাকে তুমি আরো দান করো; আর যে ব্যক্তি সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে, তোমার পথে খরচ করে না, তুমি তার সম্পদকে ধ্বংস করে দাও!’ (বুখারি)

রোজা পালনকারী প্রত্যেক ধনী ব্যক্তিরই কড়ায়-গ-ায় জাকাত আদায় করা উচিত। রমজান মাসে বঞ্চিত ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় ও সমাজের ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে জাকাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জাকাতের প্রকৃত হকদার হচ্ছে তারা, যারা কর্মক্ষমতাহীন এবং কর্মক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যারা উপার্জনহীন অথবা পর্যাপ্ত পরিমাণে উপার্জন করতে পারছে না।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সাদকা বা জাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, জাকাত আদায়কারী কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্তাকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণ ভারাক্রান্ত ব্যক্তিদের, আল্লাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফিরদের জন্য; এটা আল্লাহর বিধান।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৬০)

জাকাতের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। ইসলামে সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় ধনীরা তাদের সম্পদের কিছু অংশ জাকাত দিলে গরিবদের সম্পদ কিছুটা বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হয়।

জাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মদিনা রাষ্ট্র, খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনামলে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য বিমোচন করে মুসলিম উম্মাহকে সমকালীন বিশ্বে একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত জাতিতে পরিণত করেছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) সব সময় আল্লাহর কাছে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির প্রার্থনা করতেন এবং বরকতের জন্য দোয়া করতেন। তিনি মানুষকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের ওপর সাদকা (জাকাত) অপরিহার্য করেছেন, যা তাদের ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)