মেইন ম্যেনু

জামাটি কেনা হলো না ফাহিমের : বুঝে ওঠার আগেই সন্তানের রক্তাক্ত দেহ মায়ের সামনে

ঈদের জামা কেনার জন্য মায়ের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিল স্কুলছাত্র ফাহিম আহমেদ (১২)। গাজীপুর থেকে বাসে এসে ধানমণ্ডির মিরপুর সড়কে নেমেছিল মা-ছেলে। তখনই আরেকটি বাস এসে ফাহিমকে ধাক্কা দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সন্তানকে রক্তাক্ত দেখতে পান মা ঝর্ণা বেগম। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে নেওয়া হয় পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

সেখানে চিকিৎসকরা জানান, শিশুটি আর বেঁচে নেই। মায়ের সামনে সন্তানের মৃত্যুর মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে গত বুধবার দুপুরে। এদিকে দুর্ঘটনার পর উত্তেজিত জনতা দুটি বাস ভাংচুর করে ও তার মধ্যে একটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুর্ভোগে পড়েন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা।

ধানমণ্ডি থানার ওসি নূরে আযম মিয়া বলেন, দুর্ঘটনায় দায়ী বাসের চালক দেলোয়ার হোসেনকে আটক করা হয়েছে। দুটি বাস জব্দ করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।

নিহত ফাহিমের ভাই পাভেল জানান, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ডুমনির বাসুদেবপুর এলাকায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত ফাহিম। সে স্থানীয় প্রহ্লাদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র ছিল। পাভেল হাজারীবাগের গণকটুলিতে নানার বাসায় থাকেন। পাশাপাশি রাজধানীর ইস্টার্ন প্লাজায় একটি কাপড়ের দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেন। দু’দিন আগে তিনি ঈদের বোনাস ও বেতন বাবদ আট হাজার টাকা পান। এরপর তিনি ঈদের কেনাকাটা করার জন্য মা ঝর্ণা বেগম ও ভাই ফাহিমকে ফোন করে ঢাকায় আসতে বলেন। গতকাল সকালে গাজীপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন মা-ছেলে। ধানমণ্ডি থানার এসআই ইমাম মেহেদী জানান, দুপুর দেড়টার দিকে ধানমণ্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের সামনে ট্রান্সসিলভা পরিবহনের বাস থেকে নামেন ঝর্ণা ও ফাহিম। তখনই নিউমার্কেটগামী ভিআইপি পরিবহনের একটি বাস এসে ফাহিমকে ধাক্কা দেয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ব্র্যাক ব্যাংক এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী নূর আলী জানান, তিনি বুথের ভেতরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। হঠাৎ নারীকণ্ঠের তীব্র চিৎকার শুনে এগিয়ে যান। তখন দেখতে পান, দুই বাসের মাঝের স্থানে এক নারী এক শিশুর রক্তমাখা নিথর দেহ দুই হাতে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন। একটু পর লোকজন শিশুটিকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালটির চিকিৎসক ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছিল। নাক-মুখ-কান দিয়ে রক্ত বেরিয়েছিল। পরীক্ষা করে দেখা যায়, একটু আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। বাসের ধাক্কায় তার মৃত্যু হয় বলে সঙ্গে থাকা লোকজন জানায়।

গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ট্রান্সসিলভা ও ভিআইপি পরিবহনের দুটি বাসের জানালা ও সামনের কাচ পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি ভিআইপি পরিবহনের বাসটি আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। পরে পুলিশ দুটি বাসকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে ধানমণ্ডি থানার সামনে নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী আইএফআইসি ব্যাংকের এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী আনোয়ার হোসেন জানান, শিশুটিকে ধাক্কা দেওয়ার পরপরই বিভিন্ন বাস থেকে লোকজন নেমে আসে। উত্তেজিত লোকজন দুটি বাসে ভাংচুর চালায়। একপর্যায়ে একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত চলে এ পরিস্থিতি। নিহতের চাচা আবু তাহের জানান, নিউমার্কেটে বাস থেকে নামার কথা ছিল মা-ছেলের। তাদের বহনকারী বাসটিতে কোনো ত্রুটি দেখা দেওয়ায় তারা আগেই নেমে যান। নিহত ফাহিম দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট ছিল। তাদের বাবা জাহাঙ্গীর আলম পলাশ গ্রামে মুদি দোকান চালান।

এদিকে ময়নাতদন্তের জন্য ফাহিমের লাশ নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে। মৃত্যুর খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হন ফাহিমের নানা জাহাঙ্গীর আলম, মামা জিতুসহ অন্য স্বজনরা। তাদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। মা ঝর্ণা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, ‘ক্যান যে মরতে ঢাকায় আইছিলাম, না আইলে তো এমন সর্বনাশ হইতো না।’