মেইন ম্যেনু

জামায়াতের থাবায় বিএনপি

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় জিতেন বিএনপির আকবর আলী। কিন্তু পরের নির্বাচনে সেই আসনটি বিএনপির কাছ থেকে দাবি করে জামায়াত। আর আকবর আলীর বদলে ঢাকা মহানগর জামায়াতের সে সময়ের আমির রফিকুল ইসলাম মিয়া ভোটের প্রস্তুতি নেন।

একই আসন থেকে জোটের দুই নেতা ভোটে লড়তে চান, অথচ দেখা গেল বিএনপির একটি অংশের সমর্থন পাচ্ছেন জামায়াত নেতা রফিকুল ইসলাম মিয়া। নিজ দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে এলাকায় নানা প্রচারণায় নামেন বিএনপির একাংশের নেতারা। রফিকুল ইসলাম মিয়ার জনসভায় প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে তাকে সমর্থনও জানান তারা।

কোনো স্বাভাবিক কারণে এমনটি হয়নি, সেটা নিশ্চিত। জাতীয় নির্বাচনের আগে ঢাকা মহানগর জামায়াতের অফিসে রফিকুল ইসলাম মিয়ার কাছে যেতে হয়েছিল পেশাগত কারণে। সেদিন আকবর আলীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু পোস্টার ছাপা দেখা যায় সেই কার্যালয়ে। আর কয়েকজন লোক সেগুলো নিতে এসেছেন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থেকে। এই কর্মীদের সবাই স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং উপজেলা কমিটিতেও নাম আছে তাদের।

পরে ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই আসনটি জোটের জন্য উন্মুক্ত রাখে বিএনপি। আওয়ামী লীগের শফিকুল ইসলাম জিতেন আর বিএনপির আকবর আলী জামানত হারিয়ে তৃতীয় হন।

সেই নির্বাচনে বিএনপির একটি অংশকে হাত করে নেওয়ার সুফল পুরো ভোগ করেছে জামায়াত। গত সাত বছরে এলাকায় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি। আর শক্তিশালী হয়েছে জামায়াত।

আগামীতে কখনো সংসদ নির্বাচনে জামায়াত অংশ নিতে পারলে এই আসনটি নিজেদের করে পেতে চায় তারা। সে জন্য গত বছর উপজেলা নির্বাচনে উল্লাপাড়ায় চেয়ারম্যান পদে বিএনপিকে ছাড় দিলেও ভাইস চেয়ারম্যান পদটি নিজেদের বাগিয়ে নেয় জামায়াত।

আবার উল্লাপাড়া পরীক্ষা সফল হওয়ার পর জামায়াতের নজর পড়ে পাশের উপজেলা বেলকুচিতে। এখানে জামায়াতের প্রভাব ২০০৮ সালের আগে দেখা যায়নি তেমন। রফিকুল ইসলাম মিয়া নিজের উপজেলা লাগোয়া অন্য উপজেলার কান্দাপাড়া, কল্যাণপুর, ভাঙাবাড়ি ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তারে মনোযোগী হন। বিএনপির নেতা-কর্মীদের হাত করে এসব এলাকায়ও শক্তি বাড়ায় জামায়াত আর দুর্বল হয় বিএনপি।

শক্তি কতটা বাড়ল তার পরীক্ষা নিতে গত উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে উল্লাপাড়া বিএনপিকে ছেড়ে দিলেও বেলকুচিতে জোটের সমর্থন না পেয়েও প্রার্থী দেয় জামায়াত। আর ভোটের ফলে দেখা যায়, বিএনপির প্রার্থী বহু ব্যবধানে তৃতীয় হয়েছে আর জামায়াতের প্রার্থী হারেন সামান্য কিছু ভোটে। বেলকুচিতে জামায়াতের এই উত্থান রীতিমতো বিস্ময়কর ঠেকেছে বিএনপির কাছেও।

কেবল সিরাজগঞ্জ? ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে দেশের বিএনপি অধ্যুষিত বিভিন্ন এলাকায় নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টায় লিপ্ত হয় জামায়াত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজন এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগপন্থি ও আওয়ামী লীগবিরোধী শিবিরে বিভক্ত। জামায়াতের ধারণা, তারা শক্তিশালী হলে আওয়ামীবিরোধী মনোভাবের সুফল পাবে তারাই আর সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল থাকায় বিএনপি বেশিদিন নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে না।

জামায়াতের এই স্বপ্ন সফল হওয়ার কি না সেই প্রশ্নের জবাব পাওয়া সম্ভব নয়। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিচার করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধন করছে সরকার। আবার নির্বাচন কমিশন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করায় জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী দলটি।

তবে স্থানীয় নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হয় না, সেহেতু জামায়াতের নেতা-কর্মীরা এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন আগের মতোই আর এই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থার একটা নমুনা দেখা যায়। বিএনপির ঘাঁটি বগুড়ার ১২টি উপজেলার মধ্যে এবার ৯টিতেই চেয়ারম্যান পদে জামায়াতকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার সংসদীয় আসন গাবতলী এবং বগুড়া সদরে চেয়ারম্যান পদে বিএনপিকে ছাড় দিয়েছে জামায়াত। তবে এর বিনিময়ে দুই ভাইস চেয়ারম্যান পদে জামায়াতকে ছাড় দিয়েছে বিএনপি।

বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্ব পর্যায়ের এই সমঝোতায় মাঠ পর্যায়ে অবশ্য তৈরি করেছে ক্ষোভ। জামায়াতকে যে ৯টি উপজেলায় বিএনপি ছাড় দিয়েছে তার চারটিতে বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতারা শীর্ষ পর্যায়ের সমঝোতা না মেনে প্রার্থী হন। এর মধ্যে দুটিতে বিএনপির বিদ্রোহী নেতারা জিতলেও দুইটিতে জামায়াতের কাছে বিপুল ব্যবধানে হেরে যান বিএনপি নেতারা। বিএনপির ঘাঁটিতেই জোটের প্রধান শরিক দলের বিরুদ্ধে জামায়াতের এই জয় দলের নেতাদেরকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। উপজেলা নির্বাচনে নিজেদের সামান্য ভোট আছে এমন এলাকায় চেয়ারম্যান পদে বিএনপির সমর্থন দাবি করে বসে দলটি। বিএনপি রাজি না হলে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে জিতিয়ে এনেছে অথবা বিএনপির হার নিশ্চিত করেছে জোটের দলটি।

ভোটের অঙ্কে সারা দেশে জামায়াতের অবস্থান নগণ্যই বলা যায়। উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা; দক্ষিণাঞ্চলে খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহের কিছু আসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট আছে জামায়াতের। এর বাইরে সিলেট বিভাগে দুই একটি আসন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, কক্সবাজারের একটি আসনে বলার মতো ভোট আছে জামায়াতের। কিন্তু এগুলোর বাইরে কোনো আসনে জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসার ইতিহাস বিরল। তবে ৭০ থেকে ৮০টি আসনে তাদের পাঁচ থেকে ১০ হাজার ভোট বিএনপিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মোকাবেলায় সুবিধা এনে দেয়। এই হিসাবের কারণে জামায়াত প্রকাশ্যেই বলে, তাদের ছাড়া বিএনপির গতি নেই। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেনও এই কথা।

একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার দোসর এই নেতার জানাজায় বিএনপির শীর্ষ নেতারা অংশ না নেওয়ায় তাদেরকে কটাক্ষ করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন গোলাম আযমের পুত্র। বিএনপির জন্য ভীষণ অপমানকর এই লেখায় দলের কর্মী-সমর্থকরা বিস্মিত হলেও বিএনপির নেতারা জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হবে বলে কিছুই বলেননি। বরং এটা জামায়াতের দলীয় অবস্থান নয়, আযমীর ব্যক্তিগত লেখা বলে পাশ কাটানোর চেষ্টা করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার পর নির্বাচনের আগে নজিরবিহীন সহিংসতার বিষয়টি এখনও আলোচনায় আছে দেশে-বিদেশে। নির্বাচনের এক বছর পূর্তিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের আবারও গণপরিবহনে পেট্রল বোমা হামলায় প্রাণহানি তোলপাড় তোলে দেশে-বিদেশে। জামায়াতই বিএনপিকে এ রকম কট্টরপন্থার দিতে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করা হয়। আর জামায়াত ছাড়তে বিএনপির প্রতি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

‘ভারত গণতন্ত্রের পক্ষে হলেও মৌলবাদের বিরুদ্ধে’ এমন কথা বলে ঢাকা সফরে এসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খালেদা জিয়াকে জামায়াত ছাড়তে বলেছেন বলেই ধারণা করা হয়।

নানা ঘটনায় বিএনপির নেতারাও এখন জামায়াতের সমালোচনায় উচ্চকিত। জামায়াতের কারণে দলের ক্ষতি হচ্ছে, সভা-সমাবেশে এখন এ কথা বলছেন নেতারা। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে ধরি মাছ না ছুঁই পানি জাতীয় অবস্থান নেওয়া বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ প্রথমবারের মতো মুজাহিদের ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের পর আদালতের পক্ষেই কথা বলেছেন।

একদিকে জঙ্গি তৎপরতায় জড়ানোর অভিযোগ, অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতাদের বিচার চলছে, আবার সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ এই অবস্থায় জোটের প্রধান শরিক বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াত ছাড়ার সম্ভাবনা সব মিলিয়ে জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে হতাশা আর উদ্বেগ থাকলেও নেতারা আগের মতোই নির্ভার এবং উদ্ধত।

দলের সাবেক এক সংসদ সদস্য এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য গোপন স্থান থেকে মুখোমুখি হন আমাদের সঙ্গে। বিএনপি তো বলছে জামায়াতে ইসলামীকে তারা ছাড়ার চিন্তা করছে, এ ব্যাপারে আপনারা কী ভাবছেন? জানতে চাইলে ওই নেতা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। বলেন, ‘আগে ছাড়–ক তো, তার পর বলবেন। বিয়ে করা যত সহজ তালাক দেওয়া তত সহজ নয়। বিএনপি যদি মনে করে জামায়াত তাদের জন্য বোঝা তাহলে তারা ভুল করবে। বরং জামায়াত তাদের সঙ্গে আছে বলেই সরকারের ভয় যে, বিএনপি ও সমমনা শক্তিকে শেষ করে দেওয়া যাবে না।’

‘তাহলে কি বলতে চাইছেন জামায়াত ছাড়া বিএনপি অচল?’

‘তাই তো, এটা তো পরিষ্কার। বিএনপি কোনো কর্মসূচি ডাকলে নেতা-কর্মীদের দেখা পাওয়া যায় না। জামায়াত মাঠে ছিল বলেই বিএনপি কর্মসূচি শেষ করে ঘরে উঠতে পেরেছে’- বললেন ওই নেতা।

নিজের অবস্থা গোপন রেখেই আলাপে ইতি টানেন জামায়াতের সাবেক ওই সংসদ সদস্য। লুকিয়ে থাকা এই নেতার মতোই মনোভাব জামায়াতের তৃণমূল নেতা-কর্মীদেরও। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ২০০১ সালে নির্বাচনে যাওয়া ও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়ার পর দলটি রাজনৈতিকভাবে বেশ সুবিধা পেয়েছে। কৌশলে সাংগঠনিক শিকড়ও পৌঁছে দিয়েছে গভীরে। সহিংসতার জন্য প্রশিক্ষিত একটি চৌকস দলও আছে জামায়াতের। যারা আড়ালে থেকেই চালিয়ে যাচ্ছে নানা কান্ড।সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।