মেইন ম্যেনু

জালিয়াতি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের শতকোটি টাকার গম আত্মসাৎ

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য আমদানি করা ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গম জালিয়াতচক্রের শিকারে পরিণত হয়েছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একটি জালিয়াতিচক্র প্রতারণার মাধ্যমে শত কোটি টাকা মূল্যের এই গম ব্যাক্তি পর্যায়ে কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তাদের বিদেশ গমনেও নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। তবে চক্রের সবাই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। এ ব্যাপারে দুদকের সহকারী পরিচালক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এইচ এম আখতারুজ্জামান বলেন, “আসামিদের গ্রেফতারের সংশ্লিষ্ট সকল থানা ও বিমানবন্দরে বার্তা পাঠিয়েছেন, তবে তারা পলাতক। শত কোটি টাকা হারিয়ে বাংলাদেশ থেকে জীবননাশের হুমকি পেয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক মি. হো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিষয়টি তিনি দক্ষিণ কোরিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসকে অবহিত করেছেন।”খবর দ্য রিপোর্টের।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য বিভাগের সাথে দক্ষিণ কোরিয়ার M/S Samjin cs & t co. ltd সাথে ৫০ হাজার (+ ৫%) টন গম সরবরাহ চুক্তি হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার এই রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি খুলনার হাজী শেখ আশরাফ আলী এন্ড সন্সকে স্থানীয় বিশেষ প্রতিনিধি (EXCLUSIVE AGENT) নিয়োগ দেয়। সেই হিসেবে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই ১৯ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন গম বোঝাই প্রথম চালান নিয়ে M/v Brave leader জাহাজ মংলা বন্দরে আসে ও খালাস করে। পরে দ্বিতীয় চালানে ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গম নিয়ে M/v Vyritsa জাহাজ ২০১৪ সালের ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দরে পৌছায়। কিন্তু এই সময় M/v Vyritsa স্থানীয় শিপিং এজেন্ট জে কে শিপিং এর অসহযোগিতায় খাদ্য বিভাগ নমুনা গম সংগ্রহ করতে পারেনি। নানা টানাপোড়েনে জাহাজের গম খালাস নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে হাজী আশরাফ আলী কমিশনের জন্য বার বার রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে তাগাদা দিতে থাকে। তাতেও কাজ না হলে পরে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। উচ্চ আদালত এই ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গমের উপর স্থিতাবস্থা জারি করেন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালত জাহাজ ছেড়ে দিয়ে জাহাজের বোঝাইকৃত গম নামিয়ে রফতানিকারকের হেফাজতে রাখার অনুমতি দেয়।

আদালতের এই আদেশকে অপব্যবহার করে জে কে শিপিং গম রফতানিকারকের অনুমতি না নিয়ে গুদামজাত করে। কিছুদিন পর গোপনে ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গম প্রতারণা ও জালিয়াতি করে একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সমস্ত গম বিক্রি করে দেয় জে কে শিপিং। কিন্তু খাতা কলমে দেখানো হয় এই গম চট্টগ্রাম মালেক মাঝির গুদামে রক্ষিত আছে। অথচ আদালত নির্দেশ দিয়েছিল এই গম স্থান পরিবর্তন বা বিক্রি করা যাবে না।

এই জটিলতার খবর পেয়ে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে M/S Samjin cs & t co. ltd এর প্রেসিডেন্ট Mr. Hco man Woog গত বছরের ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম আসেন। তিনি মালেক মাঝির গুদামে রক্ষিত গমের প্রকৃত অবস্থার সন্ধানে গেলে শিপিং এজেন্ট অসহযোগিতা করেন ও তাকে জীবননাশের হুমকি দেন। এই হুমকির পর রফতানিকারক Hco man Woog চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় জে কে শিপিং লাইনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মো. কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ২০১৫ সালের ১১ মার্চে করা ৪৯৭ নম্বর জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন এই গম বাংলাদেশ সরকারের ফুড ডিপার্টমেন্টে সরবরাহ করার জন্য আনা হয়েছিল।

বিদেশি নাগরিক হয়রানি ও ৩৩ হাজার টন গমের নিরাপত্তা বিধান সংক্রান্ত ঢাকার স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) স্মারক নং ৫৬৩/সা. তাং ২৭/০৫/২০১৫ তারিখে পত্রের তদন্ত শেষে সিটি স্পেশাল ব্রাঞ্চ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ পরিদর্শক আসাদ করিম চৌধুরী ২০১৫ সালের ২০ জুলাই পুলিশ সুপারকে এই ৩৩ হাজার টন গমের সরেজমিন তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেন।

তিনি তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেন, সরেজমিনে চট্টগ্রামের সদরঘাটস্থ মালেক মাঝির ৫ নং গোডাউনে ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গমের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। এই সমুদয় গম মালেক মাঝি ঢাকাস্থ রোকেয়া ফুড প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিকে বিভিন্ন তারিখে ডেলিভারি করেন। এই ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গমের বাজারমূল্য প্রায় শতকোটি টাকা।

এদিকে খুলনার হাজী শেখ আশরাফ আলী এন্ড সন্স লি. এর ম্যানেজিং পার্টনার শেখ আজিজুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশে তার পাওনা আদায়ের জন্য ৩৩ হাজার টন গম থেকে ৭ হাজার টন গম বিক্রির নির্দেশনা পেয়ে তিনি মালেক মাঝির গোডাউনে গিয়ে কোন গম পাননি। তিনি গম আত্মসাত করার অভিযোগ এনে জে কে শিপিংয়ের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মো. কামরুল ইসলাম, তার পার্টনার আখতারুজ্জামান খান মামুন, সাইফুল ইসলাম এবং মালেক মাঝিসহ মোট ৫ জনের নামে বন্দর থানায় গত বছরের ৩১ মে মামলা দায়ের করেন। যে মামলাটি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে।

শেখ আজিজুল হক আরো জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার ওই কোম্পানিটির মালিক শতকোটি টাকা হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে এখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন। গত বছর ২৯ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এক ইমেইল বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, জে কে শিপিং গম সরবরাহ করতে জঘন্য প্রতারণা করেছে।

জানা গেছে, শত কোটি টাকার গম লুটপাট করে শিপিং এজেন্ট কামরুল ইসলাম ও তার পার্টনার আক্তারুজ্জামান খান মামুন বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন। বিদেশের বড় বড় ক্যাসিনোতে নিয়মিত যাতায়াতের ছবি তাদের ফেসবুকে পাওয়া গেছে। যা তারা নিজেরাই ফেসবুকে প্রচার করছেন, তাই নিয়ে তাদের বন্ধুমহলেও তোড়পাড় সৃষ্টি হয়েছে।

৩৩ হাজার মেট্রিকটন গম আত্মসাতের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলার তদন্ত এখন শেষ পর্যায়ে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম দুদকের সহকারী পরিচালক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এইচএম আখতারুজ্জামান বলেন, অভিযুক্ত আক্তারুজ্জামান খান মামুন ও কামরুল ইসলামকে আটকের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল থানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তারা পলাতক। একইভাবে এই দুইজনের পাসপোর্ট নম্বর ও ফটোকপি দিয়ে হয়রত শাহজালাল বিমানবন্দরসহ দেশের সকল ইমিগ্রেশন বিভাগকে পত্র দেওয়া হয়েছে। তবে পুলিশ তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারছে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ৩৩ হাজার টন গম আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

মামলার প্রত্যক্ষ সাক্ষী অন্য একটি জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট মেসার্স এন আর ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. আব্দুর রাজ্জাক দুদকের কাছে লিখিতভাবে জানিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের খাদ্য বিভাগের জন্য আমদানি করা ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গম লুটপাট করা হয়েছে। খাদ্য অধিদফতরে ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গম সরবরাহের যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তারা নানা টালবাহানা করে গম আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে ডিজি ফুডকে গম সরবরাহ করেননি। বরং জাহাজের ড্রাফট কমানোর কথা বলে দক্ষিণ কোরিয়ার রফতানিকারকের কাছ থেকে প্রায় চার লাখ ডলার আদায় করে। একইভাবে ভূয়া অজুহাত দেখিয়ে শিপিং এজেন্ট শুল্ক কর্তৃপক্ষর অনুমতি নিয়ে জাহাজ থেকে গম খালাস করে মালেক মাঝির গোডাউনে রাখে, যা পরবর্তীতে এই সিন্ডিকেটচক্র বিক্রি করে দেয়।

তিনি তার লিখিত জবানবন্দিতে আরো জানান, শিপিং এজেন্ট কামরুল ইসলাম ও আখতারুজ্জামান মামুন সিন্ডিকেট অসৎ উদ্দেশ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক M/s Samjin এর president man Woog heo এর বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারি মামলা করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে যাতে এই বিদেশি এখানে এসে তাদের কাজের বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। একইভাবে বিদেশি নাগরিকের সই জাল করে শুল্ক কর্তৃপক্ষর গম খালাসের ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে।

এই শত কোটি টাকা মূল্যের গম বিক্রির সাথে জড়িতরা হলেন- জেকে শিপিং ম্যানেজিং ডাইরেক্টর খুলনার কামরুল ইসলাম, তার ব্যবসায়ী অংশীদার আক্তারুজ্জামান খান মামুন, রোকেয়া অটোমেটিক ফ্লায়ার মিল মালিক ঢাকার মো. সাইফুল ইসলামসহ মোট ৫ জন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কামরুল ইসলাম ও আক্তারুজ্জামান খান মামুন এ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন গম মো. সাইফুল ইসলামের কাছে বিক্রি করেন। এ কাজে মালেক মাঝির গোডাউন ব্যবহার করা হয়।

এ ব্যাপারে জে কে শিপিংয়ের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর কামরুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ঘটনা স্বীকার করে জানান, জাতীয় সংসদে আইন পাশ হয়েছে সরকারি ছাড়া ব্যক্তিগত কোন দুর্নীতির বিষয় দুদক তদন্ত করতে পারবে না। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, এই ৩৩ হাজার মেট্রিকটন গমের মালিক দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক। তাই খুলনার হাজী শেখ আশরাফ আলী এন্ড সন্সের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আজিজুল হকের অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, সবাইকে যে ভাবেই হোক ম্যানেজ করা হয়েছে। তবে গম যাই হোক সরকারি অর্থ আত্মসাৎ হয়নি। বিদেশিদের অর্থ লুটপাটে তো দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন— ‘না এতে কোন সমস্যা নেই’।