মেইন ম্যেনু

জিয়ার মাজার সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে মিরপুরে?

বগুড়া নয়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজার সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মিরপুরে। সংসদ ভবনের উত্তর পাশের চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে জিয়ার মাজার প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সেক্টর কমান্ডারদের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় এ মাজার সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সংসদ এলাকা থেকে খুব শিগগিরই সরে যাবে নকশাবহির্ভূত সব স্থাপনাও। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। সরিয়ে নেওয়া হবে সংসদ ভবনের দক্ষিণ চত্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত জাতীয় কবরস্থানের সাতটি কবরও। তবে সেখান থেকে সব কবর মিরপুরে যাবে না। বিতর্কিত ব্যক্তিদের কবর অন্যত্র সরানো হবে। এদের কবর নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে বা কোনো সরকারি কবরস্থানে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে।

সংসদ ভবন এলাকা থেকে জিয়ার মাজার মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কবরস্থানের জায়গায় কবর হবে। মুক্তিযোদ্ধারা-সেক্টর কমান্ডাররা একসঙ্গেই থাকুন। আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমাকেও সেখানে দিলে অসুবিধা কোথায়? কবর কবরস্থানেই থাকা উচিত। স্থপতি লুই আই কানের নকশায় এখানে কোনো কবরস্থান নেই। সচিবালয়ের জায়গা আছে। আইয়ুব খান সংসদ ভবনকে ঘিরে শেরেবাংলানগরজুড়ে সেকেন্ড ক্যাপিটাল গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেভাবেই লুই আই কানের ডিটেইল নকশা প্রণীত হয়েছে। আমরা সে নকশাটাই কেবল প্রতিস্থাপন করতে চাইছি।’

তবে তিনি এও বলেন, ‘কোনো কবর সরানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সরবে নকশাবহির্ভূত সব স্থাপনা। আমরা অবশ্যই লুই কানের নকশা পুনঃস্থাপন করব। অবশ্যই আইয়ুব খানের সেকেন্ড ক্যাপিটালের নকশা বাস্তবায়ন করব।’ প্রতিস্থাপনের ঘটনাটি স্বাধীনতা দিবসের আগেই ঘটছে কিনা— এমন প্রশ্নে তিনি শুধু বলেন, ‘সহসাই সরে যাবে। কবরস্থানের জায়গায় কবর হবে। অন্য কবরগুলোও সময়মতো যথাস্থানে প্রতিস্থাপিত হবে।’
জানা যায়, গত বছরের ১৭ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় জিয়াউর রহমানের মাজার চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা প্রথম বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই বছরের ৭ জুলাই একনেকের সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সংসদ ভবনের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি লুই আই কানের নকশা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কবরগুলো যদি সরানোর দরকার হয়, তাহলে সরকার তা করবে।

এরপর গত বছরের ১৪ জুলাই গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠায়। সেখানে স্থপতি লুই আই কানের নকশায় শেরেবাংলানগর এলাকায় কবরস্থানের জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি উল্লেখ করে জিয়ার মাজারসহ সংসদের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত জাতীয় কবরস্থান থেকে অন্য সাতটি কবরও সরানোর পক্ষে মত দেয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এর পর থেকেই সংশ্লিষ্ট মহলে এ পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে সংসদ ভবন এলাকা থেকে জিয়াউর রহমানের মাজারটি সরিয়ে জিয়ার জন্মস্থান বগুড়া জেলার বাগবাড়ীর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে নানা দিক বিবেচনা করে সরকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সেক্টর কমান্ডারদের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের আরেক সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের মাজারও সেখানে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, জিয়ার মাজার সংসদের জুরিসডিকশনের মধ্যে পড়ে না। লুই আই কানের নকশায় জাতীয় সংসদের জন্য বরাদ্দ ২৫০ একর জমি। এর উত্তরের সীমানা ক্রিসেন্ট লেক পর্যন্ত। তার মধ্যে জিয়ার মাজার পড়ে না। তবে লুই আই কানের সবিস্তার নকশায় লেকের ওপার থেকে নতুন সচিবালয়, পরিকল্পনা কমিশনসহ অনেক কিছু করার পরিকল্পনাই নকশায় উল্লেখ রয়েছে। তবে সেটা আমার বিষয় নয়।

সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় জাতীয় কবরস্থানের যে সাতটি কবর রয়েছে, সেটা তো আপনার এখতিয়ারের মধ্যে, সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে কিনা— জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে স্থপতি লুই আই কানের নকশায় সংসদ ভবন এলাকায় কোনো কবরস্থানের উল্লেখ নেই। একই কারণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের মৃত্যুর পর তার অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী সংসদ প্রান্তের ‘জাতীয় কবরস্থানে’ দাফন করার অনুমতি দেয়নি জাতীয় সংসদ সচিবালয়। গত বছর ২৭ আগস্ট কাজী জাফরের পরিবার এ অনুমতি চেয়েছিল।

এর আগে জাতীয় সংসদ ভবন সীমানার পশ্চিম প্রান্তে আসাদ গেটের উল্টো দিকের পেট্রলপাম্পটি তুলে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তৎকালীন গণপূর্তমন্ত্রী মির্জা আব্বাসের ভাইকে জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের নকশা অনুযায়ী সংসদ ভবন কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে কমপ্লেক্সটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৮২ সালে।

১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে জিয়ার মাজারকে কেন্দ্র করে চন্দ্রিমা উদ্যানের নাম পরিবর্তন করে ‘জিয়া উদ্যান’ করে এবং এখানে সুদৃশ্য একটি সমাধিসৌধ নির্মাণ করে। এ ছাড়া মাজারে যাওয়ার জন্য স্থাপন করে একটি আকর্ষণীয় বেইলি ব্রিজ। তবে ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ জিয়া উদ্যানকে ফিরিয়ে দেয় তার আগের পরিচয় ‘চন্দ্রিমা উদ্যান’-এ। ক্রিসেন্ট লেকের ওপর থেকে বেইলি ব্রিজটিও সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে আবার বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেখানে কনক্রিটের ঝুলন্ত সেতু নির্মাণসহ একটি কমপ্লেক্স গড়ে তোলে। সেখানে জিয়ার মাজারের চারদিকে থাকা চারটি প্রবেশপথের শুরু বা শেষ প্রান্তে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু, সম্মেলন কেন্দ্র ও মসজিদসহ চারটি স্থাপনা। এ ছাড়া বিএনপি সরকার চন্দ্রিমা উদ্যানের পাশে ১০ একর জমিতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র গড়ে তোলে; যা পরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নামকরণ করা হয়।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব স্থাপনা জাতীয় সংসদের নকশাবহির্ভূত। এ ছাড়া শেরেবাংলানগরে আছে লুই আই কানের নকশাবহির্ভূত আরও সাতটি স্থাপনা। এর মধ্যে জিয়ার মাজার ছাড়াও রয়েছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন এবং সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের জাতীয় কবরস্থান। যেখানে রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান ও আতাউর রহমান খান, সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান যাদু মিয়া, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দীন খানের কবর।



(পরের সংবাদ) »