মেইন ম্যেনু

জেনে নিন অন্যরকম একটি প্রেমের গল্প!

একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করি। বই মেলা কাভার করছি। এক দিন মেলার মিডিয়া ভবন থেকে বের হয়েছি, ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটল! মিডিয়া ভবনের সামনেই একটা লিটলম্যাগের স্টলে একটি মেয়ে বসে ছিল, তার দিকে তাকানোটাই ছিল দুর্ঘটনা! মেয়েটাও আগ্রহ করে মিডিয়া ভবনের দিকে তাকিয়েছিল। চোখাচোখি হতেই আমি এই পৃথিবী থেকে ‘নাই’ হয়ে গেলাম। আমার বুকের মধ্যে হু হু করে ফাগুনের বাতাস বইতে লাগল, হাত-পা, চোখ-মুখ কাঁপতে লাগল। মনে হলো, এই মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে না পারলে মরেই যাব!

একজন তরুণ সাংবাদিকের এত তাড়াতাড়ি মরে যাওয়াটা ঠিক হবে না ভেবে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম। কথা বলার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস সঞ্চয় করে স্টলের দিকে এগিয়ে গেলাম। স্টলের সামনে অনেক বই-পত্রিকা সাজানো। মেয়েটি স্টলের দায়িত্বে। গিয়ে বই নাড়াচাড়া করতে লাগলাম আর কিভাবে কথা বলা যায় তাই ভাবতে লাগলাম। একবার সাহস করে তার মুখের দিকে তাকালাম, সঙ্গে সঙ্গেই আবার বুকটা হু হু করে ওঠল। ওই চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা, জীবনে কোনো দিন কথা বলেছিলাম কি না সেটাই মনে করতে পারলাম না। চলে যে আসব, তা-ও পারছিলাম না। এ রকম একটি মেয়ের কাছ থেকে বই না কিনে চলে এলে মেয়েটা যদি কিছু ভাবে! তাই ১৫০ টাকা খরচ করে হাতের কাছে যে বই পেলাম সেটাই কিনে সেদিনের মতো চলে এলাম। সাংবাদিকতা মাথায় ওঠল! প্রতিদিন তার সামনে যেতাম, কিছু না বলে হাতে যে বইটা ওঠত সেটাই কিনে চলে আসতাম। এভাবেই ২২ তারিখ পর্যন্ত গেল, মেলা আর ছয় দিন বাকি।

এরই মধ্যে কথা বলতে না পারলে জীবনেও আর বলা হবে না। বাংলা সিনেমার গরিব নায়ক জসিমের কপালেও ৪০ লাখ টাকার লটারি ‘লাইগ্যা’ যায়, বিড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে, আমার ভাগ্যেও কিছু একটা ছিঁড়ল। সেদিন তার স্টলের সামনে যেতেই সে নিজ থেকেই কথা বলে ওঠল। —ভালো আছেন? প্রশ্ন শুনে আমি আবারও হারিয়ে গেলাম। ইচ্ছা হলো—বলি, ‘আমি ভালো নেই। আপনাকে দেখার পর থেকে আমি আমার মধ্যেই নেই, কোথায় আছি তা-ও জানি না, সেখানে ভালো থাকব কিভাবে?’ এত কিছু বলা হলো না। শুধু বললাম, ‘জি, ভালো।’ —আমার নাম সাথী, আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল। আপনার হাতে সময় হবে? সময় থাকলে ১০ মিনিট সময় নিতাম। বলল মেয়েটা। সময় হবে মানে! আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বলে কী এই মেয়ে! যেদিন প্রথম দেখেছি, সেদিন থেকে সময় বলতে আমি শুধু এই মুখটাকেই বুঝি। ঘণ্টা-দিন-মাস তার চোখে আটকে আছে, আর সে-ই কি না জানতে চাইছে আমার সময় হবে কি না! বললাম, ‘আপনি চাইলে বিগ ব্যাঙ থেকে শুরু করে আগামী কয়েক লাখ বর্ষ সময় আমি বের করতে পারি। আর আপনি চাচ্ছেন মাত্র ১০ মিনিট!’ আমার কথা শুনে মেয়েটা হেসে ফেলল। আমরা মেলার ক্যান্টিনে বসে দুই কাপ কফির অর্ডার করলাম।

কফি আসার আগে সে মুখ খুলল, আপনি কি আমার প্রেমে পড়েছেন? ভীষণ লজ্জা করছিল, লজ্জার ঠেলায় হ্যাঁ বলতে গিয়ে বললাম, ‘আরে না। প্রেমে পড়ব কেন? আজব তো!’ —না, মানে কেন যেন মনে হলো, আপনি আমার প্রেমে পড়েছেন। গত ১৫ দিন ধরে আপনি আমার স্টলে আসছেন, তারপর প্রতিদিন ১৫০ টাকার বই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এক দিনও বইয়ের দিকে তাকাননি। বাসায় গিয়েও মনে হয় প্যাকেট খোলেননি। খুললে বুঝতেন আপনি প্রতিদিন আসলে একটি বই-ই কিনেছেন। বইয়ের নাম ‘যৌন সমস্যায় ঔষধি গাছ’! এই এক বই ১৫ দিন এসে কেনার পেছনে আমি আর কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। তার কথা শুনে মাথা নিচু হয়ে গেল। মনে হলো, ধরণী দ্বিধা হোক বা না হোক, আমার এখনই মাটির নিচে ঢুকে যাওয়া উচিত। তবে পিকচার তখনো কিছুটা বাকি ছিল। সে বলল, ‘আসলে আমার প্রেমে পড়ে লাভ নেই। আমি বিবাহিত। আমার একটা বাচ্চা আছে। কেজি ওয়ানে পড়ে…’—এটুকু বলতেই ধপাস করে শব্দ হলো। আমি চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারালাম নাকি জ্ঞান আমাকে হারাল ঠিক পরিষ্কার না। তবে ক্যান্টিনে ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। একসময় চোখ মেলে আবিষ্কার করলাম, আমি মাটিতে শুয়ে আছি। সাথী উপুড় হয়ে আমার মুখে পানির ছিটা মারছে।

সাথী বলল, ‘আমি খুবই দুঃখিত। আসলে আমার বিয়েটিয়ে হয়নি। আপনার সঙ্গে একটু মজা করছিলাম। আপনি এ রকম করে ফিট খাবেন জানলে কখনোই এমন করতাম না। সরি…।’ অধিক শোকে মানুষ পাথর হয়, অধিক সুখে কী হয় জানি না। সম্ভবত পাগল হয়ে যায়। আমিও পাগল হয়ে গেলাম। কিছু না বুঝেই সাথীর হাত আমার হাতে নিয়ে বললাম, ‘সাথী, প্লিজ, প্লিজ…! আমাকে তুমি ভুল বুঝো না। আমি তোমার প্রেমে পাগল হয়ে গেছি। তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারি না, ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি তোমাকে…।’ কোথাও বোমা ফুটল না, শঙ্খচিল উড়ল না, আকাশে বিজলি চমকাল না, পাখি গান গাইল না, কৃষ্ণচূড়া লাল হলো না… শুধু মুচকি হেসে সাথী বলল, ‘সে তো আমি প্রথম দিন থেকেই জানি।’ মহাকাল আরো কিছু কাল অতিক্রম করল, পৃথিবী তার অক্ষের চারপাশে আরেকটু ঘুরল, বিভিন্ন স্টলে বেশ কিছু বই বিক্রি হলো, শাহবাগ মোড়ে তিনটা সিগন্যাল ছাড়ল, টিএসসিতে কয়েক শ কাপ চা বিক্রি হলো। সাথী তার হাত সরিয়ে নিল না!