মেইন ম্যেনু

জেনে নিন, ঐতিহাসিক মুর্শিদাবাদের বর্তমান হালচিত্র

মুর্শিদাবাদ নামটি বাঙালি সমাজেই শুধু নয় কিংবা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাতে নয় বরং সমগ্র ভারতবর্ষে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম,- যা অনেকেরই জানা। মুর্শিদাবাদ নাম বলতেই যে বিষয়টি সবার মনে প্রথমেই চলে আসে তা হলো বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলার নাম এবং মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের দুশো বছরের সূচনালগ্ন। ভ্রমণপিপাসুদের তৃষ্ণার্ত মনে একটু প্রশান্তি ও পাঠকদের জন্য ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজরিত মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের সামান্য কিছু কথা ও তথ্যউপাত্ত নিয়ে না লিখে পারলাম না।

মুঘল আমলে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার রাজধানী মুর্শিদাবাদ অর্ধশতাব্দি ধরে এক বৃহৎ জনবহুল সমৃদ্ধ নগরীরূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিবর্তনের কালক্রমে ধীরে ধীরে তা হ্রাসও পেয়েছে। বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ এর প্রতিষ্ঠাতা। মুর্শিদাবাদের আগের নাম ছিল মুকসুদাবাদ। ১৭০৬ সালে তৎকালীন দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলার নবাব হন। তার নামানুসারেই মুকসুদাবাদের নতুন নাম হয় মুর্শিদাবাদ। তার হাত ধরেই সমৃদ্ধির সূত্রপাত আর সেটার ম্লানপর্ব শুরু হয় ১৭৫৭ সালের ২৩জুন পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে। ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ ও ১৭৯৩ সালের নিজামত আদালত কলকাতায় স্থানান্তরিত হওয়ায় ঐতিহাসিক অনেককিছুর স্বাক্ষী মুর্শিদাবাদের সমৃদ্ধি পর্বও যেন পরিসমাপ্তি ঘটে। বাংলার প্রাচীন কীর্তিকথা না জানলে ও দর্শনীয় স্থান গুলো না দেখলে বাংলার গৌরবময় অধ্যয় যেন অজানা থেকে যায়। আর সেই উপলব্ধি থেকে অনেকে এখনো ছুটে যান মুর্শিদাবাদ-পলাশীর প্রান্তরে। তবে বর্তমানে সেখানে গেলে একটি বিষয় মনে চলে আসবেই তা হলো- বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলার অবশিষ্ট প্রতিয়মান স্মৃতিটুকুও যেন অত্যন্ত অবহেলিত রয়েছে। এক কথায় নবাব সিরাজ-উ-দৌলা রয়েছেন এখনো অবহেলিতরূপে কেননা সামান্যতম কিছু ছাড়া তার স্মৃতিবিজড়িত সকল স্থাপনা কিংবা ঐতিহাসিক সবকিছুই নিঃশ্বেষ করে দিয়েছিল ইংরেজরা। আর তার সমাধিস্থানসহ যেটুকু সামান্যতম স্মৃতি এখনো অবশিষ্ট আছে তাও যেন দায়সারা অবস্থায় বিদ্যমান।

ভারতের কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদের দূরত্ব দুশো কিলোমিটার। ট্রেন ও বাস যোগে সেখানে যাওয়া যায়। কলকাতার শিয়ালদহ ট্রেন স্টেশন থেকে লালগোলা, ভাগীরথি এক্সপ্রেস, ধনধান্যে এক্সপ্রেস, কলকাতা (চিতপুর) স্টেশন থেকে হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেসসহ হাওড়া স্টেশন থেকেও ট্রেনযোগে মুর্শিদাবাদ যাওয়া যায়। আর বাসযোগে গেলে বহরমপুর নেমে জিপ কিংবা অন্য যানবাহনে মুর্শিদাবাদ যাওয়া যায়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ একটি জেলা শহর। তবে জেলা শহর মুর্শিদাবাদের চেয়ে মহকুমা বহরমপুর শহরটি অনেক বড় ও আধুনিক। বহরমপুরের তুলনায় শহর হিসেবে মুর্শিদাবাদ বলতে গেলে অত্যন্ত ছোট ও সামান্যতম। মুর্শিদাবাদ শহরে অন্য যানবাহনের পাশাপাশি এখনো ঘোড়াগাড়ি বা টমটম বা এক্কা বেশ চলে। পর্যটকরা ওই ঘোড়াগাড়িতে করে বিভিন্ন দর্শণীয় স্থান পরিভ্রমণ করে থাকেন। মুর্শিদাবাদের আম, রেশমের সিল্ক কাপড়, কাঁসার বাসন, হাতির দাতের বিভিন্ন কাজ ও ছানাবড়া মিষ্টি এখনো বেশ প্রসিদ্ধ। মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারী এলাকায় অনেকগুলো আবাসিক হোটেল রয়েছে।

নবাব সিরাজ-উ-দৌলার স্মৃতিবিজড়িত মুর্শিদাবাদে বর্তমানে দর্শণীয় স্থান সমূহের মধ্যে আছে ভাগীরথী নদীর তীরে হাজারদুয়ারী প্যালেস মিউজিয়াম, ঘড়ি ঘর, মুর্শিদকুলি খাঁর সমাধিস্থল কাটরা মসজিদ, ইমামবারা, জগৎশেঠের বাড়ি, নৌসেরি বানুর সমাধি মসজিদ, চক মসজিদ, আস্তাবল, ত্রিপোলিয়া গেট, সিরাজ-উ-দৌলার মদিনা, ওয়াসেফ মঞ্জিল বা নিউ প্যালেস, বাচ্চাওয়ালী তোপ, তোপখানা, জাহান কোষ কামান, আজিমুন্নেসার সমাধি, জাফরাগঞ্জ মোকবারা, নিমকহারাম দেউড়ী খ্যাত মীরজাফরের প্রাসাদের ভগ্নাংশ, মীর জাফরের জাফরাগঞ্জের সমাধিক্ষেত্র, নশিপুর রাজবাড়ি, নশিপুর আখরা, কাঠগোলা বাগান, ফুটি মসজিদ, নেমিনাথের মন্দির, সরফরাজ খাঁর সমাধি, নবাব সিরাজ-উ-দৌলার সমাধিক্ষেত্র ‘খোসবাগ’, মতিঝিল, সুজাউদ্দিনের বাগান বাড়ি, ফার্হাবাগ, নদীগর্ভে বিলীন সিরাজের প্রাসাদ হীরাঝিল, কদম শরীফ, হুমায়ুন মঞ্জিল, রাধামাধব মন্দির, জগদ্বন্ধু ধামা ডাহাপারা, কিরীটেশ্বরী মাতার মন্দির, রাণী ভবানী মন্দির, ভট্টবাটির শিব মন্দির, বঙ্গাধীকারি ভিটা, মোহনলালের ভিটা, উমিচাঁদের মন্দির, আর্মেনিয়ান গীর্জা, কাশিমবাজার রাজবাড়ি, ইংরেজদের সমাধি, ডাস সমাধি, মীরমদনের সমাধি, কুঞ্জঘাটা মহারাজ নন্দকুমারের বাড়ি, পলাশী মনুমেন্ট প্রভৃতি। এছাড়াও আছে মুর্শিদাবাদের মসনদে আরোহিত বিভিন্ন নবাবগণ ও তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মৃতিবিজড়িত নানান স্থাপনা, উপকরণ ইত্যাদি। মুর্শিদাবাদের বহু ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ধ্বংসপ্রায়। এখনো যা ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে তা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে। আর তৎকালীন ইতিহাসের মুছে যাওয়া স্মারকচিহ্ন গুলোও কিছুটা অবলোকন করা যায় মুর্শিদাবাদে ভ্রমণে গেলে। সবমিলিয়ে ওই জনপদে আলিঙ্গন করা যাবে যে, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলা আজো কীভাবে অবহেলিত আর মীরজাফরের বংশধরদের কর্মযজ্ঞতা। মুর্শিদাবাদ ও পলাশীর কিছু ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন ও দর্শণীয় স্থান সমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে না ধরলে যেন ভ্রমণ অসমাপ্ত থেকে যায়।

বর্তমানে মুর্শিদাবাদের মূল আকর্ষণ হাজারদুয়ারী প্রাসাদ (প্যালেস মিউজিয়াম)

Murshidabad9বতর্মানে মুর্শিদাবাদে যে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় তা হলো হাজারদুয়ারী। ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত হাজারদুয়ারী প্রাসাদটি বর্তমানে প্যালেস মিউজিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে এটি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে মন্ত্রণালয়ের তত্বাবধায়নে রয়েছে। মুর্শিদাবাদের লালবাগ এলাকায় বিশালাকৃতির এই তিনতলা প্রাসাদটি হাজারদুয়ারী নামে পরিচিত। প্রাসাদে এক হাজার দরজা থাকায় এমন নামকরণ হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানালেন। ওই এক হাজার দরজার মধ্যে ৯’শ টি আসল দরজা আর বাকী ১’শ টি নকল দরজা। নকল ১’শ টি দরজা দেয়ালের সাথে এমন ভাবে সেট করা যাতে বোঝার উপায় নেই যে, কোনটি আসল আর কোনটি নকল। নবাব সিরাজ-উ-দৌলার মৃত্যুর প্রায় ৭২বছর পর ১৮২৯ সালের ২৯ আগস্ট তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিসের উপস্থিতিতে তৎকালীন পুতুল নবাব নাজিম হুমায়ুন জা এই প্রাসাদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ১৮৩৭ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের সময়ে স্থপতি কর্নেল ডানকানের পরিকল্পনা ও তত্বাবধায়নে প্রাসাদের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ হয়, যার খরচ পড়ে সেই সময়ের ১৮লাখ টাকা। গাথুনি কাজে বহু পরিমাণে ডিমের কুসুম ব্যবহৃত হয়েছিল বলে শোনা যায়।

ছবির মতো ত্রিকোনাকৃতির হাজারদুয়ারী প্রাসাদ বা প্যালেসের কম্পাউন্ডের আয়তন ৪১ একর। প্যালেসের সামনে দুই পাশে মনোরম বাগান শোভিত। একতলা প্যালেসের সামনের ভাগে বিশাল বড় একটি সিড়ি তৃতীয় তলার দরবার কক্ষ পর্যন্ত উঠেছে। ওই সিড়ির দুই পাশে সিংহমূর্তি ও ছোট কামান রয়েছে। তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় অতিথিরা সেখানে গেলে ওই কামানের গোলা বর্ষণ করে স্বাগত জানানো হতো। হাজারদুয়ারীর একটি কক্ষের দুই কোণে দুটি মজাদার জাদু আয়না আছে, যাতে দর্শক তার নিজের মুখ দেখতে পাবে না কিন্তু উপস্থিত অন্যদের মুখ দেখতে পায়। ওই জাদু আয়নায় নিজের মুখ ছাড়া উপস্থিত অন্য সব দেখতে পাওয়া যায়।

Murshidabad8প্রাসাদটির প্রথম তলায় অস্ত্রাগার, অফিস-কাছারি, রেকর্ডরুম ইত্যাদি রয়েছে। অস্ত্রাগারে ২৬০০টি বিভিন্ন অস্ত্র সজ্জিত আছে। এ অস্ত্রের মধ্যে পলাশীর যুদ্ধেও অনেক অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। কিছু বিখ্যাত অস্ত্রও এখানে প্রদর্শিত রয়েছে, যেমন- নবাব আলীবর্দি, নবাব সিরাজ-উ-দৌলা ব্যবহৃত তলোয়ার, বহুনল বিশিষ্ট বন্দুক, নাদির শাহের শিরস্ত্রান, মীর কাশিমের ছোরা, বিভিন্ন ধরন ও আকারের কামান ইত্যাদি। যে ছোরার সাহায্যে মোহাম্মাদী বেগ নবাব সিরাজ-উ-দৌলাকে হত্যা কটরছিল সেটিও এখানে রক্ষিত আছে। রয়েছে ১৭৪৫ সালে ডাস সরকার প্রদত্ত নবাব আলীবর্দি খাঁকে উপহার দেয়া কামান, মীরমদনের কামান, পলাশীর যুদ্ধে ওই কামান বিস্ফোরিত হয়ে তিনি নিহত হন। সেখানে আছে আসামের উনবিংশ শতাব্দির প্রথমাধ্যের ২ফুট ব্যাসের বিশালাকৃতির বড় বাশ, হুমায়ুন জার শিকারকৃত বিশালাকৃতির কুমির ইত্যাদি। আছে নবাবদের পোশাক, জুতা ও ব্যবহারিক বস্তু। সম্রাট আওরঙ্গজেব ব্যবহৃত হাতির দাতের পালকি, সম্রাট শাহজাহানের হাতির দাতের তাজাম, নবাব হাসান আলী মির্জার রৌপ্য তাজাম, হাওদা নামের গদি আটা আসন যা হাতির পিটে ভ্রমণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ‘আর্ট গ্যালারী’ ও ‘লাইব্রেরী অবস্থিত’। আর্ট গ্যালারীতে বহু বিখ্যাত চিত্র শিল্পীর চিত্রকলা ও তৈলচিত্র প্রদর্শিত আছে। কেন্দ্রীয় গ্যালারীতে নবাব মুর্শিদকুলি খা, সিরাজ-উ-দৌলা থেকে শেষ পুতুল নবাব পর্যন্ত ১৮জন নবাবের ছবি আছে। এছাড়া বিভিন্ন গ্যালারীতে দেওয়ান, ইংরেজদের ছবি পরিলক্ষিত হয়। লাইব্রেরী ফ্লোরে ছোট-বড় বহু ধর্মগ্রন্থ, কয়েক হাজার চুক্তিপত্র, নাটক, নভেল, তা¤্রলিপি, ইতিহাস, দলিল দস্তাবেজ, বিভিন্ন ভাষায় লিখিত নানান গ্রন্থ রয়েছে। আবুল ফজল রচিত আইন-ই-আকবরীর পান্ডুলিপি, বাগদাদের তৎকালীন লেখক হারুন-আল-রশিদের হস্তলিখিত বিশালাকৃতির কোরআন শরীফ, বিশালাকৃতির এ্যালবামসহ বিভিন্ন দূষ্প্রাপ্য জিনিষ এখানে বিদ্যমান। প্রাসাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো দরবার হল। বর্তুলাকার ও খিলানের ছাদে আচ্ছিদ দ্বিতীয়তলার বিশালাকৃতির দরবার হলটি গোলাকৃতি-চারদিকে চারটি দরজা রয়েছে। দরবার কক্ষের গামলার মতো বৃহৎ ছাদটি ৭৮ফুট উচু। যা আমাবস্যার রাত ছাড়া সবসময় আলোকিত থাকবে প্রাকৃতিক ভাবে। ফেরাদুনজাকে প্রদত্ত ভিক্টোরিয়ান কাঁচের ১০১ টি বাতি সম্বলিত বিশালাকৃতির ঝাড়বাতি। ফেরাদুনজার ১০১ জন পুত্র থাকায় ১০১ টি বাতি জ্বলে। ওই কক্ষে রক্ষিত নবাব নাজিম হুমায়ুন জার সিংহাসনটি সোনা ও রূপার তৈরী। অস্ত্রাগার, ক্লিয়পেট্রা, ড্যাকোডিল ছবির তৈলচিত্র, ল্যান্ডস্কেপ গ্যালারী, ডাইনিং হল, প্রিন্স গ্যালারী, বিলিয়ার্ড রুম, দরবার হল, কমিটি রুম, বিট্রিশ গ্যালারী, দেওয়ান গ্যালারী, নবাব গ্যালারী, সেন্টার ল্যান্ডিং, ড্রইং রুম প্রভৃতি মিলিয়ে হাজারদুয়ারী প্যালেস মিউজিয়ামটি শুধু পরিপূর্ণতা লাভ করেনি পর্যটকদের বিশেষ আকৃষ্টও করেছে।

নবাব সিরাজ-উ-দৌলার মদিনা ও ঘড়ি ঘর

Murshidabad7হাজারদুয়ারী প্যালেসের ঠিক সামনে মদিনা অবস্থিত। ‘মদিনা’-টিই বর্তমানে নবাব সিরাজ-উ-দৌলার সময়কার স্থাপত্য শিল্পের একমাত্র নিদর্শন। মদিনা হলো চারকোনাকৃতির সাদা রং-এর ঘর, যাতে মূল্যবান রতœ সামগ্রী রক্ষিত থাকতো। নবাব সিরাজ-উ-দৌলা নিজে এই মদিনার জন্য কারবালা হতে পবিত্র মাটি মাথায় করে বয়ে এনেছিলেন। কথিত আছে, সিরাজের মা আমিনা বেগম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তার পুত্র নবাব হলে মদিনার পবিত্র মাটি এনে বহু মূল্যবান রতœ সামগ্রী দ্বারা দরজা প্রস্তুত করবেন। শোনা যায়, মীর কাশিম নবাব হলে, তিনি মুঙ্গেরে রাজধানী স্থানান্তরিত করার সময় ওই মদিনার সব ধনরতœ মুঙ্গেরে নিয়ে যান। এই মদিনার দরজাটি কেবলমাত্র মহরমের সময় খুলে দেয়া হয়, বছরের বাকী সময় বন্ধ থাকে। মদিনার পাশেই রয়েছে একটি ঘড়ি ঘর। একটি সুউচ্চ টাওয়ারে চারদিকে বৃহৎ ঘড়ি স্থাপন করায় এটির নাম ঘড়ি ঘর।

ইমামবাড়া ও বাচ্চাওয়ালী তোপ

Murshidabad10হাজারদুয়ারী প্যালেসের ঠিক বিপরীতে বিশাল দ্বিতল ভবনের ইমামবাড়াটি অবস্থিত। এটি দৈর্ঘ্যে হাজারদুয়ারীর চেয়েও বেশি। ইমামবাড়াটির মধ্যের মসজিদে ইমামের পদচিহ্ন, ধর্মপুস্তক, তাজিয়া ইত্যাদি রয়েছে। নবাব সিরাজ-উ-দৌলা নির্মিত কাঠের ইমামবাড়াটি ১৮৪৬ সালে আগুনে পুড়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেলে নবাব হুমায়ুন জার পুত্র শেষ পুতুল নবাব নাজিম মনসুর আলী খা ফেরাদুন জা ১৮৪৭ সালে মাত্র সাত মাসে ৭লাখ টাকা ব্যয়ে ২০৭ মিটার দীর্ঘ বর্তমানের ইমামবাড়াটি নির্মাণ করেন। আয়তকার বিশাল এই সৌধটি তিনটি সম-চতুর্ভূজ অংশে বিভক্ত। এটির অভ্যন্তরের চতুর্দিকে রয়েছে বিস্তৃত প্রার্থনাকক্ষ ও কেন্দ্রস্থলে বর্গাকার উচ্চভিত্তির উত্থিত গম্বুজ সমন্বিত মদিনা। এখনো প্রতিবছর মহরম উপলক্ষ্যে মহরম মাসের প্রথম দশদিন ইমামবাড়ায় জাকজমক মেলা বসে। দূরদূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগন মহরমপর্বে যোগ দেন ও হাসান-হোসেনের জন্য শোকাতুর হয়ে মাতম করতে থাকেন। মহরমের ওই সময় ছাড়া এটি বছরের বাকী সময় বন্ধ থাকে। এটির তত্বাবধায়নে আছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। হাজারদুয়ারী ও ইমামবাড়ার মাঝস্থানে মদিনার পাশে ‘বাচ্চাওয়ালী তোপ’ নামের একটি বৃহৎ কামান রয়েছে। নবাব হুমায়ন জার সময় এটি নদীগর্ভ থেকে উদ্ধার করা হয়। জানা যায়, ১৬৪৭ সালে জনার্দন কর্মকার এটি তৈরি করেন। এই কামানটিতে তিনটি চেম্বার রয়েছে এবং ১৭০ সের বারুদ দাগার প্রয়োজন হতো। শোনা যায়, এটি একবার মাত্র দাগা হয়েছিল এবং এর প্রচন্ড আওয়াজ ১০মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়লে বহু গর্ভবতী মহিলার গর্ভপাত ঘটে যায়। আর সেই কারণেই ওই কামানের নাম ‘বাচ্চাওয়ালী তোপ’ বলা হয়ে থাকে। এটির দৈর্ঘ ১৮ফুট ও ওজন প্রায় ১৭হাজার পাউন্ড।

নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর সমাধি ও কাটরা মসজিদ

Murshidabad16মুর্শিদাবাদ শহরের উত্তর-পূর্ব দিকে কাটরা বাজারের পাশে নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর সমাধিস্থলে কাটরা মসজিদ অবস্থিত। এক তলা উচ্চ মঞ্চের উপর উত্থিত কাটরা মসজিদ মুর্শিদাবাদের প্রাচীনতম ও চিত্তাকর্ষক ইমারত। প্রবেশদ্বারের উপরে একটি লিপি অনুসারে এটি ১৭২৩ সালে মুর্শিদাবাদের স্থাপয়িতা মুর্শিদকুলি খাঁ নির্মাণ করেছেলিন। এ মসজিদটির গুরুত্বের অন্যতম কারণ হলো উচ্চ মঞ্চ বিশিষ্ট মসজিদের প্রবেশ সিড়ির নিচের তলদেশে মুর্শিদকুলি খাঁর সমাধি অবস্থিত। আকর্ষনীয় বৈশিষ্ট হলো প্রতিরক্ষার জন্য নির্মিত রন্ধ্র বিশিষ্ট দুইটি বৃহদাকার বুরুজ ও মিনার। ঐতিহাসিকদের মতে, বার্ধক্যে উপণিত মুর্শিদকুলি খাঁ মসজিদ সংলগ্ন নিজের একটি সমাধিভবন নির্মানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী ১৭২৩-২৪সালে এটি নির্মিত হয়। মসজিদের দুই প্রান্তে ৭০ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট দুটি গম্বুজ আজো ভগ্নাদশায় দাড়িয়ে আছে। গম্বুজের উপর থেকে মুর্শিদাবাদ নগরীর অধিকাংশ দেখা যেতো। মসজিদের চারদিকে অনেকগুলো ছোট ছোট প্রকোষ্ঠ বা খোলা ঘর আছে যেখানে বসে কোরআন পাঠ করতেন অনেকে। বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এটি তত্ববধায়ন করলেও চারদিকের সুন্দর ফুল বাগান ছাড়া স্থাপনাটি অত্যন্ত অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। কাটরা মসজিদ পরিদর্শণের সময় দেখা গেলো একসময়ের কোরআন পাঠের ওই সুরক্ষিত ঘর গুলোতে চলছে কতিপয় ব্যক্তিদের নেশার আসর।

ত্রিপোলিয়া গেট

মুর্শিদাবাদের চকবাজার হতে উত্তরে নবাব বাহাদুর স্কুল যাওয়ার পথে রাস্তার উপর ত্রিপোলিয়া গেট বা তোরণ দেখা যায়। এটি বর্তমানে ভগ্নদশা অবস্থায় রয়েছে। নবাবী আমলে এখানে নহবৎ বসতো, যা দূর হতে শোনা যেতো। নবাব সুজাউদ্দীনের আমলে এই তিনমূখী গেটটি নির্মিত হয়েছিল।

জাহানকোষা কামান

বৃহৎ কামান ‘জাহান কোষা’ অর্থাৎ বিশ্বজয়ী ঢাকার বাঙালি কর্মকার জনার্দ্দনের ধাতু বিদ্যায় পারদর্শিতার একটি অটুট প্রমাণ স্বরূপ বিদ্যমান। ইহা দৈর্ঘ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটার এবং ওজন সাত টনের উর্দ্ধে। এটির উপর লেখা লিপি অনুযায়ী জানা যায়, স¤্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে সুবেদার ইসলাম খাঁর আদেশে ১৬৩৭সালে এটি তৈরী হয়েছিল। মুর্শিদাবাদের তোপখানা এলাকায় এটি অবস্থিত। নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করবার সময় ওই কামানটি এখানে নিয়ে আসেন। মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে পরবর্তী অন্যান্য নবাবগণ এখানে তাদের অস্ত্রাগার বা ‘তোপখানা’ স্থাপন করেন। এখানেই বিধ্বংসী ‘জাহানকোষা’ কামানটি প্রদর্শনের জন্য রয়েছে।

ফুটি মসজিদ ও চক মসজিদ

কাটরা মসজিদের পশ্চিমদিকে অসম্পূর্ণ অবস্থায় জঙ্গলের মধ্যে ধ্বংসপ্রায় ‘ফুটি’ বা ফৌতি মসজিদটি কোনরকমে দাড়িয়ে আছে। এই ফুটি মসজিদটি মুর্শিদকুলি খাঁর দৌহিত্র সরফরাজ খাঁ তৈরি করেন। এটি কাটরা মসজিদের অনুকরণে তৈরি কিন্তু এর নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। অনেকগুলো গম্বুজের মধ্যে বর্তমানে দুটি গম্বুজ এখনো আছে। স্থানীয় গাইড মোস্তফা জানালেন, কথিত আছে- এ মসজিদটি এক রাতে তৈরি হয়। একটি গম্বুজ তৈরি হয়নি বলে নাম ‘পুটি’ মসজিদ। মুর্শিদাবাদের চকবাজার এলাকায় চক মসজিদটি অবস্থিত। মীরজাফরের দ্বিতীয় স্ত্রী মণি বেগম বীণাকার ওয়াজেদ আলীর নামে এই মসজিদটি দান করেছিলেন বলে শোনা যায়। পূর্বে এখানে মুর্শিদকুলি খাঁর দরবার গৃহ ‘চেহেল সেতুন প্রাসাদ’ অবস্থিত ছিল।

আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি

Murshidabad11ঘোড়ার গাড়িতে করে মুর্শিদাবাদের নশিপুর যাওয়ার পথে মহিমাপুর এলাকায় দেখতে পেলাম মুর্শিদকুলি খাঁর একমাত্র কন্যা ও সুজা খাঁর স্ত্রী আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ। একতলা পাকা মঞ্চের উপর মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে আজিমুন্নেসার সমাধি। কথিত আছে, একবার আজিমুন্নেসা ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজহেকিমের নির্দেশে সুস্থতার জন্য প্রতিদিন জীবন্ত শিশুর কলিজা দিয়ে তৈরি ঔষধ খেতে হতো অত্যন্ত গোপনীভাবে। পরবর্তীতে তিনি সুস্থ হয়ে পড়লেও মানবদেহের কলিজায় আসক্ত হয়ে পড়েন। একথা পিতা নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ বা স্বামী সুজা খাঁ জানার পর তার নির্দেশে আজিমুন্নেসাকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়। এবং সাধারণ মানুষের পদধূলিতে তার পাপ মোচনের জন্য মসজিদে উঠার সিড়ির নিচে তাকে সমাহিত করা হয়। আর এ কারণেই আজিমুন্নেসাকে ‘কলিজাখালী’ বলেও অনেকে অবহিত করেন।

নশিপুর রাজবড়ি ও নশিপুর আখড়া

Murshidabad14মুর্শিদাবাদ শহরতলীর অদূরে নশিপুরের বিশাল রাজবাড়িটি তৈরি করেন ইতিহাস প্রসিদ্ধ কুখ্যাত দেবি সিংহ। আদিবাড়ি পানিপথ থেকে দেবি সিংহ মুর্শিদাবাদ এসে ইংরেজ কোম্পানির অধীনে রাজস্ব আদায়কারীর পদে ভূষিত হয়ে ৭৬এর ভয়াবহ দূর্ভিক্ষের সময়ও প্রজাদের উপর অত্যাচার নিপিড়ন করে রাজস্ব আদায় করতেন। তিনি হাজারদুয়ারী প্রাসাদের আদলে নশিপুর রাজবাড়িটি তৈরি করেন। নশিপুর রাজবাড়ির দক্ষিণে নশিপুর আখড়া অবস্থিত। এটি ছিল রামানুজ সম্প্রদায়ের সাধুগণের আস্তানা বা আখড়া। সাধুগণের মধ্যে যিনি চিরকুমার থাকতেন তিনিই হতেন সেবাইত। বর্তমানে এখানে শ্রীশ্রীকৃষ্ণের ঝুলনযাত্রা উপলক্ষ্যে সমারোহ চলে।

কাঠগোলা বাগান ও প্রাসাদ

নশিপুর রাজবাড়ির পাশ্ববর্তী এলাকায় মনোরম একটি প্যালেস, বাগান ও পরেশনাথের মন্দির দেখা গেলো যেটি কাঠগোলা বাগান নামে পরিচিত। বৃহৎ এলাকা বেষ্টিত বিভিন্ন বৃক্ষ ও ফুল বাগানের মধ্যে বাগান বাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত এই প্রাসাদটি তৈরি করেন লছমীপৎ নামের এক ধর্নাঢ্য ব্যক্তি। বর্তমানে এটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণের একটি স্থাপনা ও জায়গা।

জগৎ শেঠের বাড়ি

Murshidabad15মুর্শিদাবাদ শহরতলীর অদূরে নশিপুর এলাকাতে আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা এখনো কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে তা হলো নবাবী আমলের ধর্নাঢ্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তি জগৎ শেঠের বাড়িটি। যদিও আগের সেই জৌলুস হারিয়েছে তবু বেসরকারি ভাবে রক্ষণাবেক্ষনের মাধ্যমে মিউজিয়াম হিসেবে টিকিট কেটে দর্শণার্থীরা অবলোকন করছেন সেটি। সেখানে জগৎ শেঠদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস ও আসবাবপত্র রয়েছে। বাড়ির ঠিক পিছনে রয়েছে ভূগর্ভস্থ গুপ্ত সুরঙ্গ, মাটির তলায় গুপ্ত ঘর। রয়েছে জগৎশেঠের টাকশালে তৈরি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, স্বর্ণ ও রৌপ্য শাড়ি, খাজঞ্চি খানা, ঢাকাই মসলিন ও তৎকালিন ব্যবহার্য্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শণ সমূহ। বাড়ির আঙিনায় রয়েছে বিশাল একটি মন্দির।

ওয়াসিফ মঞ্জিল বা নিউ প্যালেস

Murshidabad5মুর্শিদাবাদের শেষ নবাব ওয়াসিফ আলি মীর্জার বাসস্থান হলো ওয়াসিফ মঞ্জিল বা নিউ প্যালেস বা নতুন প্রাসাদ। হাজারদুয়ারী প্রাসাদের পার্শ্ববর্তী এলাকায় এটি অবস্থিত। একজন বাঙালি প্রকৌশলী সুরেন্দ্র বরাট এই প্রাসাদ নির্মাণের কাজ তত্ববধায়ন করেন। পাহাড় সংলগ্ন কৃত্রিম পাহাড় এবং নয়নাভিরাম বাগিচা ছিল যার অস্তিত্ব এখন নেই। মার্বেল পাথরের বাধানো সিড়ি ও অন্যান্য নকশা নিউ প্যালেসের সৌন্দর্য বাড়িয়েছিল। ১৮৯৭ সালে ১২জুন ভূমিকম্পে তিনতলা এ প্রাসাদের ওপরের তলাটি ভেঙ্গে পড়ে। নবাব ওয়াসিফ আলি মীর্জা ১৯০৬ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত ৫৩বছর পর্যন্ত নবাব ছিলেন।

আস্তাবল

মুর্শিদকুলি খাঁর সময়ে ঘোড়ার বসবাসের জন্য আস্তাবলটি নির্মিত হয়। মুর্শিদাবাদের পাচরাহা বাজারের পূর্বদিকে আস্তাবলটি অবস্থিত। পরবর্তীতে নবাব নাজিম হুমায়ুন জা সেখানে বিশাল আস্তাবল পূনর্নিমান করেন। নবাবী আমলের ২ হাজার ঘোড়া, সাড়ে ৬’শ উট, প্রায় ২’শ হাতি, ৮’শ খচ্চর, সাড়ে ৩’শ গাধা, ফিটন গাড়ি, এক্কা গাড়ি, মোটর গাড়ি রাখা হতো। লর্ড কার্জন মুর্শিদাবাদে এসে এর বিশাল আকৃতি দেখে সিরাজ-উ-দৌলার প্রাসাদ ভেবে ভুল করেছিল। বর্তমানে এটি একটি পাটের আড়ত।

নিমকহারাম দেউড়ী এবং মীরজাফর ও তার বংশধরদের ১১০০ কবর

Murshidabad13নিমকহারাম দেউড়ী হলো বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরের প্রাসাদ। অনেকে মীরজাফরের ওই প্রাসদকে বিশ্বাসঘাতকের বাড়ি বা নিমকহারাম দেউড়ী বলে অবহিত করে থাকেন। হাজারদুয়ারী থেকে দেড়/দুই কি.মি দূরে নশিপুর বাজবাড়ি যাওয়ার পথে জাফরাগঞ্জে এটি অবস্থিত। বর্তমানে এটি জনসাধারণ ও দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ। বর্তমানে জীর্ণ-ভগ্নদশা ও ধ্বংসপ্রাপ্ত ওই প্রাসাদের ভগ্নপ্রাপ্ত গেটে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার এমনই রূপ লেখা। জানা গেলো- নবাবী আমলে আলীবর্দ্দি খাঁ তার বোন শাহখানমের জন্য ওই প্রাসাদটি তৈরি করেছিলেন। উল্লেখ্য, মীরজাফর হলো শাহখানমের স্বামী। এই নিমকহারাম দেউড়ী ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ভেঙ্গে পড়ে। এই প্রাসাদেই মীরনের নির্দেশে মোহাম্মাদী বেগ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলাকে হত্যা করে। আমরা মুর্শিদাবাদ অবস্থানের সময় নিষেধাজ্ঞার কারণে সেখানে ঢুকতে না পারলেও জানা গেলো যে, ওই নিমকহারাম দেউড়ীর আঙিনায় নতুন বাড়ি ঘর করে মীরজাফরের বংশধরেরা এখনো বসবাস করে।

Murshidabad12মীরজাফরের প্রাসাদ নিমকহারাম দেউড়ীর পাশ্ববর্তী এলাকার সমাধিক্ষেত্রে রয়েছে মীরজাফরের কবর। ওই সমাধিক্ষেত্রে পুত্র মীরন, ফেরাদুন জা ব্যতিত মীরজাফরের বংশধরের ১১০০ কবর রয়েছে। ভ্রমণপিপাসু ও দর্শণার্থীরা সেখানে গেলে এখনো অনেকে বিশ্বখ্যাত বিশ্বাসঘাতকের প্রতীক মীরজাফরের কবরে বিভিন্ন ভাবে ঘৃনা প্রকাশ করে। পাপ-পূণ্যের হিসাব ভুলে অনেকে আবেগে এখনো মীরজাফরের কবরে থুথু দেয়, নুড়ি-পাথর নিক্ষেপ করে, জুতা মারে। আবেগে এমনই ঘৃনা প্রকাশকারী পর্যটক মাসুম, বিল্লাল, টিুটু, মোকবুল, আমিরুলসহ অনেকে জানালেন যে, ‘পাপ-পূণ্য বুঝি না, যার নামই এখন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে পরিগণিত হয় সেই মীরজাফরের কবর দেখে ঘৃনা প্রকাশ না করে পারি না।’ বর্তমানে ওই সমাধিক্ষেত্রটি মীরজাফরের বংশধরেরা দেখভাল করে। যারা দেখভাল করে তাদের ভন্ডামি আচরণও সেই মীরজাফরের চরিত্র মনে করিয়ে দেয়।

মতিঝিল

মুর্শিদাবাদ শহরতলীতে মতিঝিল অবস্থিত। তৎকালীন সময়ে ঐ ঝিল হতে প্রচুর পরিমাণে মতি বা মুক্তা সংগৃহীত হতো বলে এ ঝিলের নামকরণ করা হয় মতিঝিল। এটি অশ্ব-খুরাকৃতির হৃদ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে থাকার দরুন এটি কেম্পানি বাগ নামেও পরিচিত। নবাব আলীবর্দ্দী খাঁর সময়ে মুর্শিদাবাদে বহু অট্টালিকা প্রস্তুত করার জন্য ইটের প্রয়োজনে যে সমস্ত খাদ কাটা হয়েছিল, উক্ত খাদ মতিঝিলে পরিণত হয়। মতিঝিল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলীবর্দ্দি খাঁর জামাতা নৌজেস মহম্মদ ওই ঝিলের তীরে বা হৃদের বাকের মুখে নিজ স্ত্রী ঘসেটি বেগম ওরফে মেহেরুন্নেসার বসবাসের জন্য ‘সঙ্গ-ই-দালান’ নামে পাথরের প্রাসাদ তৈরি করেন। ১৭৫৮সালে মীরজাফর বড়দুয়ারী নামে এখানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছিল যেখানে ১৭৬৫সালে লর্ড ক্লাইভ কয়েকদিন বাস করেছিলেন। ওয়ারেন হেস্টিংসও এই প্রাসাদে থাকতেন। বর্তমানে ওই প্রাসাদটি অধুনালুপ্ত। সেখানে দরজা-জানালা বিহীন একটি বদ্ধ ঘর বা প্রকোষ্ঠ ছিল। কথিত আছে, ওই ঘরে ঘসেটি বেগমের ধনভান্ডার ছিল, আবার অনেকে মনে করেন- সিরাজ যখন মতিঝিল থেকে ঘসেটি বেগমকে তার প্রাসাদে নিয়ে যান তখন ঘসেটির সহচরীদের ওখানে কবর দিয়ে চতুর্দিকে প্রাচীরদ্বার-ছাদ দ্বারা বন্ধ করে দেয়া হয়। জেলা গেজেটে উদ্ধৃতি অনুযায়ী, একজন ইংরেজ উৎসুকবশত কয়েকজন মজুর নিয়ে ওই প্রকোষ্টটি ভাঙতে আরম্ভ করলে কয়েকজন মজুর রক্তবমি করে মারা যায়। কিছুদিন পর ওই ইংরেজও আত্মহত্যা করে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ওই প্রকোষ্টের ভগ্নাংশ এখনো পরিলক্ষিত হয়। এখানে একটি মসজিদ আছে, যেটি কালা মসজিদ নামে খ্যাত। মসজিদের সামনে সিরাজের ভাই একরামুদৌলা ও খালু নৌজেস মহম্মদের কবর রয়েছে। বর্তমানে মতিঝিলে স্থানীয়রা মাছ শিকার করে থাকে।

নবাব সিরাজ-উ-দৌলার সমাধিক্ষেত্র ‘খোসবাগ’

Murshidabad4নবাব সিরাজ-উ-দৌলার শেষ স্থাপনা স্মৃতি হলো তার সমাধিক্ষেত্র ‘খোসবাগ’। মুর্শিদাবাদের লালবাগ সদরঘাটের ভাগীরথী নদীর পশ্চিমপাশে খোসবাগ অবস্থিত। নবাব সিরাজ-উ-দৌলা এখনো যে কীভাবে অবহেলিত তা খোসবাগের তার সমাধিক্ষেত্র না দেখলে অনুধাবন করা যাবে না। অত্যন্ত দায়সারা অবস্থায় অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতায় নবাবের সমাধিক্ষেত্রটি বর্তমানে প্রতিয়মান হয়। মুর্শিদাবাদের অন্যান্য বেশকয়েকটি স্থাপনাগুলো সংশ্লিষ্টরা যেমন পরিপাটি ও গোছালো করে তত্ববধায়ন করে রেখেছে সেই তুলনায় নবাব সিরাজ-উ-দৌলার অবশিষ্ট শেষ স্মৃতিস্থান টুকু যেন অত্যন্ত দায়সারা অবস্থায় বিদ্যমান। সমাধিক্ষেত্রের চতুর্দিকে ফুলের সুন্দর বাগান রয়েছে। রয়েছে একটি মসজিদ, যদিও সেখানে বর্তমানে নামাজ হয় না। কিন্তু সমাধিক্ষেত্রে দুটি স্থাপনার মধ্যে নবাব সিরাজ-উ-দৌলা ও তার পরিবারের যে কবর রয়েছে তা বর্তমানে অপরিস্কার ও অপরিচ্ছন্নতা অবস্থায়। বর্তমানে একজন ব্যক্তি দায়সারা ভাবে ওই খোসবাগ দেখভাল করেন। পাকাছাদের ঘরের মধ্যে পাকা করা কবর থাকলেও নেই কবর চিহ্নিতকরণে কোন নিশানা। ফলে নতুন পর্যটকদের দ্বিধায় পড়তে হয় নবাব সিরাজ-উ-দৌলার কবর চিহ্নিত করতে গিয়ে।

Murshidabad3‘খোসবাগ’ অর্থাৎ ‘আনন্দ উদ্যান’ যা মুর্শিদাবাদের শেষ স্বাধীন নবাবগণের সমাধিক্ষেত্র। আট প্রকার বেষ্টিত এক বহুবেদির উপর একটি চতুষ্কোন ইমারতের মধ্যে নবাব আলীবর্দ্দী খাঁ ও তার দৌহিত্র নবাব সিরাজ-উ-দৌলার সমাধি অবস্থিত। নবাব আলীবর্দ্দী খাঁ দিল্লির জামে মসজিদের অনুকরণে ৭দশমিক ৬৫ একর জমির উপরে খোসবাগ বা গার্ডেন অফ হ্যাপিনেস তৈরি করেন। এটি চারদিকে ২৪৭১ফুট উচু দেয়াল দ্বারা ঘেরা। এখানকার সাজানো সুন্দর বাগানের মাঝে নবাব আলীবর্দ্দী খাঁ, আলীবর্দ্দীর খাঁর মা, নবাব সিরাজ-উ-দৌলা, তার বেগম লুৎফউন্নিসা এবং নবাব পরিবারের অন্য সদস্যদের কবর এখানে রয়েছে। চারদিকে বারান্দা দিয়ে ঘেরা চৌকাকৃতির সমতল ছাদবিশিষ্ট ঘরের মধ্যে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলার সমাধি রয়েছে।

পাশের চারদিকে দেয়ালবিশিষ্ট চত্বরের মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশদের গুলিতে নিহত দানিশ ফকিরের কবর, ওই দানিশ ফকির বিশ্বাসঘাতকতা করে নবাব সিরাজ-উ-দৌলার গুপ্ত স্থান ব্রিটিশদের দেখিয়ে নবাব সিরাজকে হত্যা করতে সাহায্য করেছিল। সিরাজের মৃত্যুর পর তার বেগম লুৎফুন্নেসা ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ ফিরে আসেন এবং মৃত্যুর আগে বেশ কয়েকবছর ওই খোসবাগেই ছিলেন। লুৎফুন্নেসার মৃত্যুর পর তাকে স্বামী নবাব সিরাজ-উ-দৌলার কবরের পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। একসময় খোসবাগে সমাধিস্থ নবাব আলীবর্দ্দী খাঁ ও নবাব সিরাজ-উ-দৌলার সমাধি দুটি সোনা ও রূপার কাজ করা কালো কাপড় দিয়ে আবৃত থাকতো। বর্তমানে বিভিন্ন কারণে খোসবাগের সুশ্রী বিলুপ্ত হতে চলেছে, চলছে নবাব সিরাজ-উ-দৌলার শেষ স্মৃতিস্থান টুকুর অবহেলার প্রতিযোগিতা। মুর্শিদাবাদে বেশ কিছুক্ষেত্রে এখনো মীরজাফরের প্রেতাত্মার পাশাপাশি বংশধরের পদচারণা ও আধিক্যতা যেন বেশি- নবাব সিরাজের প্রতি পরোক্ষভাবে অবহেলার দরুন এমনই মন্তব্য করলেন সেখানে পরিদর্শনে যাওয়া কয়েকজন পর্যটক ও দর্শণার্থীরা।

নবাব সিরাজের প্রাসাদ- হীরাঝিল

বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলার স্বপ্নের প্রাসাদটি হলো হীরাঝিল। মুর্শিদাবাদের অদূরে জাফরাগঞ্জের বিপরীতে ভাগীরথী নদীর ওপারে পশ্চিমতীরে নবাব সিরাজের সাধের প্রাসাদ হীরাঝিলটি ছিল। নবাব সিরাজ-উ-দৌলাকে হত্যার পরবর্তীতে সর্বস্ব লুটপাটের পাশাপাশি ওই প্রাসাদটি ইংরেজরা ধ্বংস করে দেয়। বাকিটুকু স্রোতধারা ভাগীরথী নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ভগ্নচত্বরের কয়েকটি অংশ ছাড়া কোন চিহ্নই আর বিদ্যমান নেই। জানা যায়, হীরাঝিল প্রাসাদ তৈরির জন্য সিরাজ নবাব হওয়ার বহু পূর্ব হতেই গৌড় হতে নানান প্রস্তরাদি এনেছিলেন। প্রাসাদের সন্নিকটে একটি ঝিল প্রস্তুত করে তার চারদিকে নানারূপ প্রস্তর দ্বারা আবৃত করে ঝিলটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেন। হীরাঝিলটি ভিন্ন ভিন্ন চত্বরে বিভক্ত ছিল যা ভিন্ন ভিন্ন নামে অবহিত হতো। দিনের বেলা ও জ্যোস্না রাতে ঝিলের পানিতে প্রাসাদের প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়ে এক অপরূপ সৌন্দর্য বিস্তার লাভ করতো। হীরাঝিল প্রাসাদকে মনসুরগঞ্জ প্রাসাদও বলা হয়ে থাকে। ঐ প্রাসাদের উত্তর দিকে ছিল নবাব সিরাজ-উ-দৌলার দরবার কক্ষ ও মসনদ।
এই হীরাঝিল প্রাসাদ থেকেই নবাব সিরাজ-উ-দৌলা পলাশীর প্রন্তরে রওনা দিয়েছিলেন এবং যুদ্ধে পরাজয়ের পর স্ত্রী লুৎফা ও শিশু কন্যাকে নিয়ে শেষবারের মতো হীরাঝিল প্রাসাদ ছেড়ে গিয়েছিলেন। নবাব সিরাজ-উ-দৌলা হীরাঝিল ছেড়ে গেলে বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি মীরজাফর প্রাসাদ দখল করেন। ১৭৫৭ সালের ২৯জুন লর্ড ক্লাইভ হীরাঝিল দরবার কক্ষে অবস্থিত মসনদে মীরজাফরকে নবাব হিসেবে হাত ধরে বসিয়ে দেন। হীরাঝিল প্রাসাদের কোষাগার থেকে ওই সময় বিপুল পরিমাণ সোনা, রূপা, টাকা, সোনার টাকা, হীরা, জহরত, চুনি, পান্না ইত্যাদি ইংরেজরাসহ নবাবে সাথে বিশ্বাসঘাতকের দলেরা ভাগ বাটোয়ারা করে নেন। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ইংরেজদের অনুশাসনে পুতুল নবাব হলে ওই হীরাঝিল প্রাসাদে বহুদিন বসবাস করেছিল এবং তার সময় থেকেই হীরাঝিলের পতন শুরু হয়। নবাব সিরাজ-উ-দৌলার সাধের হীরাঝিল প্রাসাদ আজ না থাকলেও দুই-একটি চত্বরের ভিত্তিভূমি গভীর জঙ্গলে আচ্ছিদ্য হয়েও এখনো ওই প্রাসাদের স্থান নির্দেশ করে দেয়। ঝোপঝাড় ও আগান-বাগানের মধ্যে প্রাসাদ চত্বরের ভিত্তিভূমি স্বাক্ষী হয়ে অবশিষ্ট শেষ স্মৃতিরূপে আছে হিরাঝিল প্রাসাদ।

কাশিমবাজার

Murshidabad2মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে কাশিমবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। এইখানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কুঠী স্থাপন করে। কাশিমবাজার কুঠীতে বসেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলাকে সিংহাসনচ্যুত করার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। নবাব সিরাজ-উ-দৌলা যখন কাশিমবাজার কুঠী আক্রমণ করেন তখন ওয়াটসন রেসিডেন্টের ও ওয়ারেন হেস্টিংস সামান্য কর্মচারী রূপে কাজ করতেন। কাশিমবাজার রেলস্টেশনের মাইল খানিক পাশেই কাশিমবাজার রাজবাড়িটি অবস্থিত। রাজবাড়ির প্রবেশদ্বারে কাশ্মীর রাজা চৈৎসিং-এর রাজ প্রাসাদের প্রস্তর স্থম্ভ শোভা পায়। ওই রাজবাড়িটি কান্তমুদি গোমস্তা ছিলেন যাকে ওয়ারেন হেস্টিংস সাহায্য করেন। কাশিমবাজারকে ঘিরে ইতিহাস আছে কিন্তু বর্তমানে সামান্য ছাড়া নেই তেমন কোন ঐতিহাসিক বিষয়াদী।

কাশিমবাজার ডাচ ও ইংরেজ সমাধি

কাশিমবাজার রেল স্টেশনের নিকট কালিকাপুর নামক স্থানে ডাচ বণিকগণের বসতি ছিল। তারা হীরা-জহরতের ব্যবসা করতো। বর্তমানে উক্ত স্থানেই তাদের সমাধিগুলো আছে। বহু ডাচরা নবাব সিরাজ-উ-দৌলাকে সমর্থন করে তার পক্ষে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিল। কাশিমবাজার রেলস্টেশন ও রাজবাড়ির মাঝামাঝি এলাকায় ইংরেজ কুঠীর শেষ নিদর্শণস্বরূপ ইংরেজদের সমাধিস্থান রয়েছে। এখানে ওয়ারেন হেস্টিংসের স্ত্রী, কন্যাসহ বহু ইংরেজদের সমাধি রয়েছে।

পলাশী প্রান্তর

মুর্শিদাবাদ জেলার শুরুতে পলাশী রেল স্টেশন থেকে মাইল তিনেক দূরে ঐতিহাসিক পলাশীর প্রান্তর অবস্থিত। ইতিহাসখ্যাত পলাশী আম্রকানন আর নেই। বিশ্বাসঘাতকতার নিদর্শণে দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত আর বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলার পতনের নাটক যেখানে মঞ্চস্থ হয় সেই পলাশীর প্রান্তর তথা পলাশীর আ¤্রকানন আজ শুধুই স্মৃতি ও তাত্ত্বিক ইতিহাস। পলাশী যুদ্ধের সেই নিদর্শণের জায়গায় বর্তমানে পলাশী সুগার মিল আর পাশেই ইংরেজ সরকার কর্তৃক মনুমেন্ট নির্মাণ করা হয়েছিল। এছাড়া পলাশী যুদ্ধক্ষেত্রের কিছু স্মৃতিস্তম্ভ পার্শ্ববর্তী ফসলী মাঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওই স্মৃতিস্তম্ভ গুলোও আজ বড়ই অবহেলায় দৃশ্যমান।

মীরমদন ও ফরিদ শাহের সমাধি

পলাশী প্রান্তরে ফরিদ শাহ নামের এক মুসলিম পীরের সমাধি রয়েছে। এছাড়া বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলার বিশ্বস্ত ও অন্যতম সেনানায়ক মীরমদনের সমাধি পলাশীর ফসলী ক্ষেতের মাঝে একটি বটগাছের নিচে রয়েছে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের বিরুদ্ধে কামানে বারুদ সংযোগ করার সময় সেটি ফেটে যাওয়ায় সেখানেই মৃত্যু হয় মীরমদনের। পরে সহযোদ্ধারা গোপনে পলাশী প্রান্তরের পাশেই তাকে সমাহিত করেন। মীরমদনের সমাধিক্ষেত্রে একটি সামান্যতম নিদর্শণ চিহ্ন ছাড়া আর কিছুই নেই। ভরা ফসলী মৌসুমে সেখানে যেতে গেলে মাঠের আইল বেয়ে যেতে হয়। অনেকে মন্তব্য করলেন- নবাব সিরাজ-উ-দৌলার মতোই অনেকটা অবহেলায় রয়েছে তার বিশ্বস্ত সহযোগী মীরমদনও।

মুর্শিদাবাদের রেলস্টেশনের কাছে রয়েছে নবাব সফররাজ খাঁর সমাধি, হাজারদুয়ারীর পূর্বদিকে মুর্শিদকুলি খাঁর স্ত্রী বেগম নৌসেরীবানুর সমাধি ও মসজিদ। কলন্দর বাগে সিরাজ-উ-দৌলার শ্যালক বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহনলালের ভিটাবাড়ি ভগ্নদশায় পড়ে আছে। আছে পাথর বাধানো পুকুর। ডাহাপাড়ায় আছে বঙ্গধিকারীর ভিটা। ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় আছে বাগানবাড়ি রোশনিবাগ, ফার্হাবাগ, হুমায়ুন মঞ্জিল, স্মৃতিস্বরূপ আছে কদম শরীফ, নবাব বাহাদুর স্কুল। মহম্মাদী বেগের বংশধরের বাগিচাপাড়া মসজিদ যেমন আছে তেমনি আছে বহু মন্দির- বড়নগরে রাণী ভবানীর মন্দিরসহ বহু মন্দির, কিরীটেশ্বরী মন্দির, একলিঙ্গদেবের মন্দির, রাধামাধব মন্দির, উমিচাঁদের মন্দির, তারামায়ের মন্দির, ভট্টবাটির মন্দির ইত্যাদি। এই এলাকাতেই রয়েছে কুঞ্জঘাটা মহারাজ নন্দকুমারের বাড়ি, রাঙামাটি চাঁদপাড়া, মানকর ভাস্করদহ জলাভূমি যেখানে মারাঠা সেনাপতি ভাস্করকে হত্যা করে নিক্ষেপ করা হয়, সাধকবাগ আখড়া, আর্মেনিয়ান চার্চ বা গীর্জা ইত্যাদি। উৎসব-মেলাতেও কম যায় না এই এলাকা। বছরের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয় বেরা উৎসব, নশীপুরের ঝুলন ও রথযাত্রা, পৌষ মেলা, লালবাগ শ্মশানঘাটের মেলা, ডাহাপাড়া জগদ্বন্ধু ধামের মেলা ইত্যাদি। মুর্শিদাবাদে বর্তমানে কাঠাল গাছের পাতা আটি করে বা তাড়ি বেধে রীতিমত বিক্রি হয় ফেরি বা হকারি করে। শাকশবজি যেমনটি করে তাড়ি বেধে বিক্রি হয় ঠিক তেমনি কাঠালের পাতা ফেরি বা হকারি করে বিক্রি করতে দেখা গেছে।

Murshidabad6মুর্শিদাবাদ, কাশিমবাজার, পলাশী বলতেই যাদের নাম ইতিহাসের স্মৃতিপটে মনের আঙিনায় ভেসে আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো মুর্শিদকুলি খাঁ, আলীবর্দ্দী খাঁ, সিরাজ-উ-দৌলা, লুৎফুন্নেসা, মীরজাফর, ঘসেটি বেগম, জগৎশেঠ, মীরমদন, মোহনলালসহ অনেকের নাম, অনেক ঘটনার ইতিহাস। কালের স্বাক্ষী হয়ে এখনো অনেক স্থাপনা কিংবা স্মৃতিচিহ্ন দাড়িয়ে আছে মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন এলাকায়। আবার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ রাখা হয়েছে ভারতের কোলকাতাস্থ ভিক্টোরিয়া মিউজিয়ামে। তবু মুর্শিদাবাদ এলাকায় এখনো যা আছে তা চোখ জুড়ানো, মন ভরানোর মতোই।

লেখক:
আরিফ মাহমুদ
সম্পাদক
আওয়ার নিউজ বিডি ডটকম