মেইন ম্যেনু

জেনে নিন, চিত্রনায়ক জসীম সম্পর্কে অজানা বিষ্ময়কর কিছু তথ্য!

নায়ক জসিম ‘৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে একজন সৈনিক হিসেবে দুই নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। দেশের কান্ডারীর ভূমিকায় থেকে আবার চলচ্চিত্রের কান্ডারী হয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন সমানতালে ।

ভুড়িওয়ালা জসিম! শুনলে অবাক হবেন, সেই সত্তর দশকের ভুড়িওয়ালা জসিম ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ধারার প্রবর্তক এবং ‘ফাইটিং গ্রুপ’ এর শুরুটা কিন্তু এই জসিমের হাত ধরেই । আজকের অনেক ফাইট ডিরেক্টর ও স্ট্যান্টম্যানরা জসিমের ছাত্র ছিলেন।

খলনায়ক ও নায়ক দুই চরিত্রেই উজ্জ্বল নক্ষত্র জসিম । ১৯৯৮ সালের ০৮ অক্টোবর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে পরলোকগমন করেন । প্রতিদিনের মতন ওইদিনও বিটিভিতে সিনেমা দেখছিলাম, হঠাৎ নিউজে মৃত্যুর খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলাম । যার খলনায়ক হিসেবে পর্দায় ক্যারিয়ার শুরু আর খেটে খাওয়া সাধারন মানুষের প্রিয় নায়ক হয়ে মৃত্যু হয়েছিল ।

১৯৭৩ সালে জসিম প্রয়াত জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ (বাংলাদেশের প্রথম অ্যাকশন দৃশ্য যুক্ত করা ছবি) ছবিতে খলনায়ক হিসেবে অভিনেতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন এবং যে ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলোও ছিল তাঁর নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা জ্যাম্বস ফাইটিং গ্রুপের করা । স্বাধীনতার পর আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে জসিমের অবদান অনস্বীকার্য, কারণ, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ধারার প্রবর্তক এবং ‘ফাইটিং গ্রুপ’ এর শুরুটা জসিমের হাত ধরেই ।

নিজের কাজের প্রতি কতোটা উৎসর্গীয় ছিলেন তার উদাহরণ দেওয়ান নজরুলের ‘দোস্ত দুশমন’ ছবিতেই পাওয়া যায় । “দোস্ত দুশমন” ছবিটি হিন্দি সাড়াজাগানো ফিল্ম “শোলে” ছবির রিমেক । ছবিটিতে তিনি গব্বারের চরিত্র করেছিলেন । খোদ শোলে ফিল্মের নামকরা চরিত্র গব্বার সিং এর আদলে থাকা ভারতীয় খলনায়ক আমজাদ খান পর্যন্ত ভুয়সী প্রশংসা করেছিলেন জসিমের । তিনি দর্শকের মাঝে এতোটাই প্রভাব ফেলেছিলেন যে, ‘আসামি হাজির’ ছবির ডাকু ধর্মার সাথে ওয়াসিমের লড়াই দেখতে দর্শক সিনেমা হলের মূল গেইট ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করেছিলো ।

মজার ব্যাপার হলো, তিনিই একমাত্র নায়ক, যিনি শাবানার সাথে একই সাথে প্রেমিক এবং ভাইরুপে চরিত্রদান করেছিলেন এবং দুটি চরিত্রই দর্শকেরা খুব সাদরে গ্রহণ করেছিলেন । উদাহরণস্বরুপ, যে শাবানা ‘সারেন্ডার’ ছবিতে জসিমের প্রিয়তমা হিসেবে সফল হয়েছেন, সেই শাবানা ‘অবদান’, ‘মাস্তান রাজার’ মতন ছবিতে জসিমের বড় বোন হয়ে সফল হয়েছিলেন ।

বর্তমানে দেখা যায় যে, নতুন নায়কের আবির্ভাব ঘটলেই বুড়ো হয়ে যাওয়া নায়কের কদর কমে যায়, কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন জসিম । যেই নব্বইয়ের দশকে সালমান শাহ-ওমর সানিরা শেকড় গেঁড়েছিলো, সেই যুগেও জসিমের সিনেমা দেখতে হলে উপচে পড়া ভীড় থাকতো ।

তিনিই একমাত্র নায়ক যিনি একাধারে ধুন্ধুমার একশান দৃশ্য করে হাততালি কুড়িয়ে নিতেন আবার নায়ক হয়ে দর্শকদের আবেগে জড়াতেন, নীরবে অশ্রুবিয়োগের জন্য তাঁর অভিনয় ছিলো সাবলীল ।
আরেকটা তথ্য না দিলেই নয়, জসিমই আবিষ্কার করেছিলেন আজকের নায়ক রিয়াজকে ।

১৯৯৪ সালে রিয়াজ চাচাতো বোন ববিতার সাথে বিএফডিসি’তে ঘুরতে এসে নায়ক জসিমের নজরে পড়েন। জসিম তখন তাকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন এবং পরবর্তীতে জসিমের সাথে ‘বাংলার নায়ক’ নামের একটি ছবিতে ১৯৯৫ সালে অভিনয় করেন রিয়াজ ।

তাঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলো ছিলো, ‘সবুজ সাথি’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘ছোটবৌ’, ‘মোহাম্মদ আলী’, ‘রকি’, ‘হিরো’, ‘অশান্তি’ , ‘বৌমা’ , ‘স্বামীর আদেশ’ , ‘টাকা পয়সা’ , ‘অভিযান’, ‘পরিবার’, ‘সারেন্ডার’, ‘ভাই আমার ভাই’, ‘ভাইজান’, ‘গর্জন’, ‘বিজয়’, ‘লালু মাস্তান’, ‘অবদান’, ‘ন্যায় অন্যায়’ , ‘লোভ লালসা’, ‘আদিল’, ‘কাজের বেটি রহিমা’ , ‘উচিৎ শিক্ষা’, ‘লক্ষ্মীর সংসার’, ‘মাস্তান রাজা ‘ , ‘কালিয়া’, ‘ওমর আকবর’, ‘ দাগি সন্তান’, ‘ সম্পর্ক’ , ‘শত্রুতা’, ‘নিষ্ঠুর’ , ‘পাষাণ’, ‘হিংসা’, ‘ভাইয়ের আদর’, ‘হাতকড়া’, ‘ডাকাত’, ‘বাংলার নায়ক’, ‘রাজাবাবু’, ‘রাজাগুণ্ডা’, ‘ঘাত প্রতিঘাত ‘ ‘স্বামী কেন আসামী’ সহ অসংখ্য অসংখ্য ছবি, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে চিরকাল ।

এইবার তার ব্যক্তিজীবনে ফিরে যাই, তার আসল নাম আবদুল খায়ের জসিম উদ্দিন । জন্ম ১৯৫০ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জের বক্সনগর গ্রামে । লেখাপড়া করেন বিএ পর্যন্ত । আগেই বলেছি যে, উনি একজন গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা । জসিমের প্রথম স্ত্রী ছিলেন ড্রিমগার্লখ্যাত নায়িকা সুচরিতা। পরে তিনি ঢাকার প্রথম সবাক ছবির নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তার মেয়ে নাসরিনকে বিয়ে করেন।

জসীমের তিন ছেলে রাতুল, রাহুল, সামি । যার মধ্যে রাতুল ও সামি ‘Owned’ ব্যান্ডের বেইজিস্ট ও ড্রামার(Owned ইদানিং অনেক ট্রেন্ডিং ব্যান্ড) আর রাহুল ‘Trainwreck’ ব্যান্ডের গিটারিস্ট (এই ব্যান্ডের ড্রামারই অর্থহীনে যোগ দিয়েছে) আর ‘Poraho’r ড্রামার । তার মৃত্যুর পর এফডিসির সর্ববৃহৎ ২ নম্বর ফ্লোরকে জসিম ফ্লোর নামকরণ করা হয় । জসিম শুধুই বাংলা চলচ্চিত্রের একজন জনপ্রিয় নায়কের নাম নয়, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সাফল্য ও পরিবর্তনের একটি অধ্যায়ের নাম।

বর্তমান এই যুগ উন্নতির যুগ । আমাদের পাশের দিকে খেয়াল করলে দেখি যে, বলিউড তাঁদের দিক হতে অনেক বেশীই এগিয়ে গিয়েছে । আরোও খেয়াল করলে দেখা যাবে যে, এর পিছনে কাজ করছে পূর্ব রুপকারদের প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা, সাথে আছে পুরোনো ছবি সংরক্ষণের নিজস্ব উদ্যোগ; আর এটাই তাদের অগ্রগতির মূল কারণ ।

খুঁজলেই সহজে পাওয়া যাবে তাদের ঝকঝকে সত্তর দশকের ছবি, উইকিতে ছোটবড় সবারই পরিচয় একটু ঢুঁ মারলেই পাওয়া যায়, একটা গ্লোবাল সাইট তাঁরা তৈরী করেছে, দিয়েছে যথাযোগ্য সম্মান তাঁদের পথিকৃৎদের ।

সত্য যদিও তেঁতো, তবুও বলতে হয়, আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এই ব্যাপারটি মোটেও নেই আর নেই সংরক্ষনের কোন সরকারী বা ব্যক্তিগত উদ্যোগ। অগ্রজদের সম্মানের কোন নীতি। আরো খারাপ লাগে, যখন এঁদের নিয়ে কিছু লিখতে বসি; তখন অনলাইন হয়ে যায় ধূধূ মরুভুমি। কোথাও এদের কীর্তি বিষয়ক কোন তথ্যই নাই ।

এসব দেশরত্নদের খবর পাওয়া যায় শুধুমাত্র মরণকালে । নেই আমাদের লিড নিউজপেপারগুলো কে, কখন, কোথায় বায়ুত্যাগ করলো, তা নিয়ে হেডিং করে, বাইরের দেশের মিডিয়ায় কী হলো, তা শেয়ারেই পাতা ভর্তি কিন্তু এতোবড় একজন মুক্তিযোদ্ধা আর মহানায়কের মৃত্যুবার্ষিকীতে একটু ছোট কলামও খালি হলো না তাদের ।

আসলে দোষ এইসব মহানায়কদেরই, দরকার কি ছিলো দেশ স্বাধীনের? কী দরকার ছিলো চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে ? উনারা না এগোলে হয়তো বাংলা সিনেমার মান সি গ্রেড থেকে ডি গ্রেডে চলে যেতো । ওইটাই সঠিক হতো ।

নিজের কয়েকটি কথা শেয়ার করি, দোষ আসলেই আমাদের । আমার ল্যাপটপে ইংলিশ-বাংলার পাশাপাশি বাংলা ছায়াছবির একটা হিউজ কালেকশান আছে । হয়তো পুরনো কোন সিডি থেকে কপি করে রাখছি, নয়ত অনলাইনে প্রচুর ঘেটেঘুটে কালেকশান করছি ।

বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, মুভি দেখতে বসলে দিনে একবার হলেও সেই বাংলা ছায়াছবি দেখি । জসিম, জাফর ইকবাল, হানাতা, সালমান শাহ, রুবেল, মান্না, ইলিয়াস কাঞ্চনদের সিনেমা সময় নিয়ে দেখি। দিলদার, টেলি সামাদের স্ট্যান্ড-আপ কমেডি আজও আমাকে হাসতে বাধ্য করে ।

রাজিব, হুমায়ুন ফরিদী, খলিলদের আজও আমার ভিলেন মনে হয়, সত্যিকারের ভিলেনরুপ তারাই এনেছেন । পর্যবেক্ষণ করি মনোযোগ দিয়ে । বাকিরা আমাকে পাগল ডাকে যে, কি সিনেমা দেখছি!

কোন বন্ধু পেনড্রাইভ নিয়ে মুভি নিতে আসলে প্রায় জোর করে বাংলা সিনেমা, পুরোনো ছায়াছবি (জীবন থেকে নেওয়া, সারেং বউ ইত্যাদি ) ছবি ঢুকিয়ে দিই । অনেকে মনোযোগ নিয়ে দেখে আমার মতো, কেউ পাগল বলে আখ্যা দেয় ।

আমি হাসি, আমার মতন কয়েকজন হলেও যদি এইভাবে বসে এই ছবিগুলো দেখতো, আর্কাইভে সংরক্ষণের মতন উদ্যোগ নিতো, সরকারীভাবে উদ্যোগ আসতো, তাহলে আমার চেয়ে খুশি কেউ হতো না ।

আমার ছোটবেলার হিরোগুলো এইভাবে মিলিয়ে যাবে ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে । অনেক তো মানববন্ধন হয়! এসব নিয়ে মানববন্ধন করা যায় না? আমাদের ছায়াছবি, সিনেমা সংস্কৃতি কতো উন্নত ছিলো, সেটা কি জানানোর দরকার নাই? চোখ মিলিয়ে দেখলে দ্বি-দশকের আগে আমাদের সাদা-কালো, রঙ্গীন সিনেমাজগত একটা সোনার খনি ছিলো । পিওর সোনার খনি ।

মাঝেমধ্যে কষ্ট হয় । যাদের কারণে এই সিনেমাজগত আজ অবধি টিকে আছে, তাঁদের জন্য কিছু করার উদ্যোগ এই সমাজের নেই । আকুল আবেদন জানাচ্ছি, এদের মরেও অমর রাখার জন্য ।
খুব কষ্ট পেলাম জসিম সম্পর্কিত কোন পোষ্ট না দেখে বরং ছেয়ে যেতে দেখলাম হলিউড-বলিউড বিষয়ক নানান পোষ্টে ।

অনলাইন সয়লাব তাদের দিয়ে । একজন মুক্তিযোদ্ধা, স্বপ্নের রুপকার হিসেবে জসিম কি এতটুকু সম্মানের দাবীদার ছিলো না? হাত কাঁপছিল কষ্টে, চোখ দিয়ে পানি চলে আসছিলো দুঃখে এই পোষ্ট লিখার সময়। অনেক অভিমান এই লিখায় জড়িয়ে আছে ।

ওপারে সুখে থাকুন । আপনার অভিমানে জর্জরিত চাহনীটা উপেক্ষা করতে পারছি না, বিধায় আপনার জীবনবৃত্তান্ত আপনার এই ভক্ত হিসেবে সামান্য প্রয়াসে বৃহৎ আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আপনার কীর্তি বর্ণনার করার মতন হবে না জেনেও এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। ভালো থাকবেন হে গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা, মহানায়ক । ওপারে সুখে থাকবেন । অভিমান করবেন না । আমাদের মতো আপনার ভক্ত থাকতে আপনাকে ইতিহাস হতে মুছে যেতে দিবো না ।

সশ্রদ্ধ সালাম আর বিদেহী আত্মার প্রতি দোয়া রইলো ।সূত্র : ব্লগ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে লেখাটি ও এইবার্তা