মেইন ম্যেনু

জেলখানা থেকে ব্লগারদের হত্যার নির্দেশনা আসে

জেলখানা থেকে ব্লগারদের হত্যার পরিকল্পনা আসে বলে জানিয়েছে র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে রাজধানীর র‌্যাব হেডকোয়ার্টার্সে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন র্যা বের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান।

তিনি বলেন, কাশিমপুর কারাগারে থাকা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সংগঠক জসিম উদ্দিন রহমানি ব্লগারদের হত্যার পরিকল্পনার কথা তার ছোট ভাই আবুল বাশারকে জানাতেন। এরপর বাশার সংগঠনের অন্য সদস্যদের তার বার্তা পৌঁছে দিতেন।

এর আগে সোমবার রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি ও নীলক্ষেত এলাকা থেকে অভিজিৎ এবং অনন্ত বিজয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করে র্যা ব। এরা হলেন, তৌহিদুল ইসলাম, সাদিক আলী ও আমিনুল মল্লিক। গ্রেফতারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দিয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

মুফতি মাহমুদ জানান, অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় পাঁচজন। এরা হলেন, রমজান সিয়াম, নাঈম, জুলহাস বিশ্বাস, জাফরান আল হাসান ও সাদেক। এদের মধ্যে সাদেক র্যা বের হাতে গ্রেফতার হয়। বাকিরা এখনো পলাতক।

তিনি জানান, ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের তিন ঘণ্টা আগে হত্যাকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মোহাম্মদ মুহসীন হলের মাঠে একত্রিত হয়। এরপর তারা মেলায় প্রবেশ করে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করে।

মুফতি মাহমুদ খান জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সংগঠক জসিম উদ্দিন রহমানির স্বাস্থ্য উপদেষ্ঠা, আস্থাভাজন ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অনলাইন কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা সক্রিয় সদস্য সাদেক আলী মিঠুকে (২৮) সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকা থেকে র‌্যাব-৩ এর একটি দল গ্রেফতার করে। সাদেক আলী মিঠুকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের তথ্যের ভিত্তিতে ব্লগার হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অর্থ সরবরাহকারী ও সক্রিয় সদস্য তৌহিদুর রহমান (৫৮) ও আরেক সক্রিয় সদস্য মো. আমিনুল মল্লিককে সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে র‌্যাব-৩ এর আরেকটি দল রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার স্টার কাবাবের পাশের গলি থেকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃত সাদেক আলী মিঠু ও তৌহিদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদে ব্লগার অভিজিৎ রায় ও সিলেটের ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে হত্যার মূল পরিকল্পনা ও কিলিং মিশনে তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন। তৌহিদুর রহমান মূলত জসিম উদ্দিন রাহমানির অনুপস্থিতিতে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আর্থিক বিষয় দেখাশোনা এবং সব হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করতেন। তৌহিদুর রহমান যুক্তরাজ্য প্রবাসী এবং একজন আইটি বিশেষজ্ঞ।

পরবর্তী সময়ে জসিম উদ্দিন রাহমানির মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ওই টিমের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। রাহমানির অনুপস্থিতিতে সংগঠনের সার্বিক আর্থিক ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, তিনি অভিজিৎ ও অনন্ত বিজয়ের সব কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতেন। গ্রেফতারকৃত অপর আসামি সাদেক আলীর সাঙ্গে জসিম উদ্দিন রাহমানির পরিচয় হয় ২০০৭ সালে।

পরবর্তী সময়ে সাদেক আলীও রাহমানির মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ও আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত জসিম উদ্দিন রাহমানির স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মূলত সাদেক আলী ২০১১ সাল থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং বিভিন্ন সময়ে কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে জসিম উদ্দিন রাহমানির সঙ্গে দেখা করে সংগঠনের বিভিন্ন কার্যক্রমের দিকনির্দেশনা নিয়ে আসতেন।
গ্রেফতারকৃত অপর আসামি আমিনুল মল্লিকও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের একজন সক্রিয় সদস্য। সংগঠনের যেসব সদস্য আত্মগোপনে বা পালিয়ে দেশের বাইরে যেতে চাইতো, তাদেরকে বিভিন্ন নামে পাসপোর্ট তৈরি করে দিতেন আমিনুল।

মুফতি মাহমুদ খান আরও জানান, আসামিদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় জসিম উদ্দিন রাহমানি কারাগারে অবস্থানকালীন সাদেক আলী মিঠু ও তার আপন ছোট ভাই আবুল বাশারের মাধ্যমে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের দিকনির্দেশনা দিতেন। এ অনুযায়ী পরবর্তী সময় তৌহিদুর রহমান সব হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করতেন।

অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৪/৫ জন সক্রিয় সদস্য সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেয়। এদের মধ্যে সাদেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। রমজান সিয়াম, নাঈম, জুলহাস বিশ্বাস, জাফরান আল হাসান পলাতক রয়েছেন।

সাদেক ও তৌহিদকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায় যে, পলাতক রমজান ও নাঈম ব্লগার অভিজিৎ ও ব্লগার অনন্ত বিজয় হত্যাকান্ডের কিলিং মিশনের সদস্য এবং তারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়।

জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায় যে, পলাতক রমজান সিয়াম পেশায় কালোজিরা এবং মধু বিক্রেতা। এটি তার ছদ্মবেশ। এর আড়ালে রমজান বাংলাদেশের আল-কায়দার সদস্য রিক্রুটের দাওয়াতি কাজও করত। এ কাজে রমজানের ঘনিষ্ঠ ছিল নাঈম। রমজান, নাঈমসহ অন্যরা ব্লগার অভিজিৎ রায়কে হত্যার ব্যাপারে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই পরিকল্পনা করে আসছিলেন। হত্যার দিন (২৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় সর্বশেষ মিলিত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসিন হলের মাঠে। এর এক দেড় ঘণ্টা আগেই রমজান, নাঈমসহ অন্যরা মেলায় অবস্থান নিয়ে অভিজিৎ রায়কে অনুসরণ করতে থাকেন।

এই গ্রুপটি পরে সিলেটে অনন্ত বিজয় দাস হত্যায় অংশ নেয়।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ৯ টার দিকে রাজধানীর টিএসসি এলাকায় একদল দুর্বৃত্তের হাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা লেখক অভিজিৎ রা্য় নৃশংসভাবে খুন হন এবং তার স্ত্রী রাফিদা আহম্মেদ বন্যা গুরুতর আহত হন। হত্যা সংগঠিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিজিৎ রায়কে হত্যার দায় স্বীকার করে একটি পোস্ট দেয় আনসারুল্লাহ বাংলা-৭ নামের একটি জঙ্গী সংগঠন। ওই ঘটনায় নিহত অভিজিৎ রায়ের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অজয় রায় পরদিন শাহবাগ থানায় অজ্ঞাত আসামিদের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

গত ১২ মে সকালে সিলেট নগরের সুবিদবাজারে নূরানী আবাসিক এলাকার চৌরাস্তায় একদল দুর্বত্ত ব্লগার লেখক ও তরুণ ব্যাংকার অনন্ত বিজয় দাসকে তার বাসার সামনে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনার পর আনসার বাংলা-৮ নামের একটি টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে।