মেইন ম্যেনু

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে বিলুপ্তির পথে ঔষধি গাছ

‘ফলজ ও বনজ বৃক্ষের সাথে ঔষধি গাছ লাগান’ / ‘গাছ লাগান গাছের পরিচর্যা করুন’ সরকার যখন এমন সব শ্লোগানকে সামনে রেখে সরকারী তহবিল থেকে মোটা অংকের টাকা বৃক্ষ রোপনের জন্য মানুষকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সভা সেমিনার বা বৃক্ষ মেলা করে, জনগনকে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করে, তখন তাদের ঘটা করা অনুষ্ঠান আনুষ্ঠানিকতার পূর্ণতা পেলেও মাঠ পর্যায়ে তার প্রভাব কতটুকু পড়ে তা খাতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করে না।

যদি তাই করতো তাহলে আমাদের সবুজ সমারোহের বাংলাদেশ ‘বন খেকোদের’ ছোবলে সাবাড় হতো না। হারিয়ে যেতো না ফলজ, বনজ, ঔষধি সহ বিভিন্ন জাতের লতা গুল্ম। এ ভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন ঘাটাইল উপজেলার রতন বরিষ গ্রামের সফল চাষী মোঃ আব্দুস সালাম, তিনি বলেন-‘উত্তর টাঙ্গাইলের ঘাটাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিগত দেড় যুগে প্রায় ৪০ প্রজাতির ঔষধি গাছ ও লতা গুল্ম হারিয়ে গেছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি চলতে থাকলে অবশিষ্ট ঔষধি গাছ গুলো সমূলে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের বনাঞ্চল সহ আশ-পাশের এলাকা থেকে নিশ্চিহৃ হয়ে যাবে বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য ভেষজ ঔষধি গাছ।

ঘাটাইলের বনাঞ্চলে সরজমিনে ঘুরে জানা যায়, এসব অঞ্চলে এক সময় লজ্জাবতী, দেশী নিম, তমাল গাছ, ফুলগুরি, আমলকি, অর্জুন, বহেড়া, হরতকি, পিপুল, বানরলাঠি, চান্দার মূল, সর্পগন্দা, গোক্ষর কাটা, ভূই কুমড়া, সোনাপাতা, রাখাল শসা, যঞ্জ ঢুমুর, যষ্ঠি মধু, বচ, সিটকি গোটা, আনুই গোটা, একাঙ্গি, মৌডাল, কদবেল, শতমূল, তেজবল, অশোক, তোকমা, ইছুবগুল, যকৃত, চাল মুগড়া, কালো মেঘ, তেলা কোচা, ছাতিমসহ প্রায় ৬০ প্রজাতির ঔষধি গাছ ও লতা গুল্ম পাওয়া যেতো। সত্তোর দশকের শেষের দিকে ঘাটাইল বনাঞ্চলে ব্যাপক হারে লুটপাট শুরু হয়।
একদিকে অবৈধ ভাবে বন উজার অন্য দিকে বনভূমি বে-দখলের ফলে এ অঞ্চলের ঔষদি গাছ বিলুপ্ত হতে থাকে। ফলে শাল বনের ফাকে ফাকে ঔষদি গাছ এবং বিচিত্র ধরনের লতা গুল্মের ঝোপ এখন আর পথচারীদের নজরে পরে না।

স্থানীয় ভেষজ চিকিৎসকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ১৯৮৫-৮৬ সালের পর এ বনাঞ্চলে পিপুল, বানর লাঠি এবং গুলঞ্চ লতা কখনো চোখে পড়েনি তাদের। তবে একটা সময় ছিল যখন সারা দিন বনের ভিতর ঘুরলে যে ঔষধি গাছ পাওয়া যেতো তার বর্তমান বাজার মূল্য ছিল প্রায় তিন-চার হাজার টাকা। তবে সে সময় প্রায় ৬০ প্রজাতির ঔষধি ও লতা গুল্ম ছিল। বর্তমানে সারা দিন খোজা খুজি করলে ১০-১৫ প্রজাতির ঔষধি গাছ পাওয়া কঠিন ব্যাপার।
এলাকার কবিরাজ হিসেবে খ্যাত চারিয়া বাইদ গামের ভেষজ চিকিৎসক সুরিন্দ চন্দ্র বর্মনের দাবি, তিনি এ বনাঞ্চলের ঔষদি গাছের উপর অর্জন করে ছিলেন গভীর ঔষধি জ্ঞান। কিন্তু বর্তমানে প্রয়োজনীয় গাছ পাওয়া যায় না তাই সে জ্ঞান এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। গাছই তাদের জীবন-জীবিকা। গাছ নেই জীবিকাও কমে গেছে।
জানা যায়, ৯০ দশকের প্রথম দিকে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক’র আর্থিক সহযোগীতায় এ বনাঞ্চলে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে কৃত্রিম বন (আকাশী বন) সৃষ্টি করা হয়। বিদেশী ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছ লাগিয়ে কৃত্রিম বন সৃষ্টির ফলে এসব গাছের নিচে কিংবা আশে পাশে ঔষধি গাছ ও লতা গুল্ম গজায় না। ফলে এসব লাগিয়ে কৃত্রিম বন সৃষ্টির ফলে এ অঞ্চলে ঔষধি গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। ঘাটাইলের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে বনাঞ্চলের শালবনে (গজারী বনে) এক সময় যে বিচিত্র প্রজাতির গুল্মলতা শোভা পেতো তা এ অঞ্চলের বয়বৃদ্ধের কাছে শুধুই স্মৃতি, নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাপ্নিক।

স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানের দিন বদলের ডিজিটাল সরকার বিদেশী বৃক্ষ রোপনের পারির্বতে পরিবেশ বান্ধব বৃক্ষ রোপন করে ঘাটাইল বনাঞ্চল সমতল ভূমিতে ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগিয়ে অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগী হবে এটাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা।