মেইন ম্যেনু

ঠাকুরগাঁওয়ে অবাধে চলছে পাখি শিকার

প্রতি বছর শীত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন জলাশয় ও ছোট ছোট বিলগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে শুরু করে দেশি ও অতিথি পাখি। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠে আশপাশের এলাকাগুলো। এ সুযোগে শৌখিন ও পেশাদার পাখি শিকারিরা বন্দুক, বিষটোপ, জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ পেতে এসব পাখি নিধন করছেন।
পাখি শিকার করা আইনত নিষিদ্ধ হলেও এ ব্যাপারে প্রশাসনকোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

ঠাকুরগাঁও বন বিভাগ সুত্রে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে বন্য প্রাণী রক্ষা আইন ও ২০১২ সালে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে দণ্ডের বিধান রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছর জেল, এক লাখ টাকা দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত।একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে অপরাধীর দুই বছরের জেল, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের কোনো প্রয়োগ হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রেজিয়া সুলতানা বলেন, পাখিরা শুধু প্রকৃতির শোভা বর্ধন করে না, ভারসাম্যও রক্ষা করে। পোকামাকড় খেয়ে এরা কৃষকের উপকার করে। কিন্তু আইন থাকলেও পাখি নিধন বন্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। এ কারণে দেশ থেকে নানা প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হচ্ছে।

জানা যায়, শীতের শুরুতেই উপজেলার জলাশয় ও ছোট ছোট বিলগুলোর পানি নেমে যায়। এ সময়অল্প পানিতে খাবার সংগ্রহের জন্য বিলে প্রচুর দেশি ও অতিথি পাখি আসে। চলতি বছর জলাশয় ও বিলগুলোতে আমন ধানের আবাদ ভালো হয়েছে। প্রচুর মাছও দেখা যাচ্ছে। ফলে বিলে ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস, বাটুল, চখাচখি, শামখোল, পানকৌড়ি, বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখি বসতে শুরু করেছে। আর এ সুযোগে এক শ্রেণীর শৌখিন ও পেশাদার পাখিশিকারি বন্দুক, বিষটোপ, কারেন্ট জাল ও ফাঁদ পেতে প্রতিনিয়ত পাখি নিধন করছেন।
প্রকাশ্যে এসব পাখি বিক্রি হচ্ছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ীহাট, নেকমরদহাট, ভুল¬ীহাট, গড়েয়াহাট, খোচাবাড়ীহাট, ফাড়াবাড়ি, পাটিয়াডাঙ্গীহাট সহ জেলার বিভিন্ন এলাকায়।

সোমবার (৩০ নভেম্বর) সকালে সদর উপজেলার রাজাগাঁও ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় টাঙ্গন ব্যারেজ এলাকায় ছোট বিল তৈরি হয়েছে। শতশত সাদা বক ও পানকৌড়ি এখানে আশ্রয় নিয়েছে। কিছু মানুষ লাঠি হাতে পাখিগুলোকে তাড়াকরে বেড়াচ্ছে। আর তাড়া খেয়ে জালে ও ফাঁদে পড়লে পাখিগুলোকে খাঁচায় আটকানো হচ্ছে।
পাখি ধরে শিকার করে বিক্রির কথা স্বীকারও করেছেন টাঙ্গন ব্যারেজ এলাকায় পাখি শিকারি অলিল চন্দ্র। তিনি জানান, শীত মৌসুমে অতিথি পাখির আগমন বেশি। তাই এই সময় তিনি পাখি শিকার করে থাকেন এবং ওইসব পাখি বাজারে বিক্রি করেন।

Thakurgaon pic 1বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চাড়োল ইউনিয়নের পাখি শিকারি কুদ্দুস আলী বলেন, বাজারে পাখির প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই কোনোমতে ধরতে পারলেই বিক্রি করতে সমস্যা হয় না। প্রতি জোড়া সাদা বক ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, চখাচখি ১০০ থেকে ১২০, কাইয়ুম পাখি ৩৫০ থেকে ৪০০ ও বালিহাঁস ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। ফলে বেশি লাভের আসায় অনেকেই মাছ ধরা বাদ দিয়ে পাখি শিকার করছেন।এভাবে অতিথি পাখি নিধন হলে পরিবেশ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে বলে অভিমত স্থানীয় সচেতন মহলের।

পরিবেশ কর্মী রেজাউল হাফিজ রাহী জানান, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাক-পাখালির গুরুত্ব অপরিসীম। তাই এ সকল পাখি রক্ষায় প্রশাসনসহ স্থানীয়দের এগিয়েআসা জরুরি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. শাহাবুদ্দীন খাঁন লার্জ বলেন, অতিথি পাখি হল সৌন্দর্য। আর এসব পাখিদের শিকার করছে কিছু ব্যক্তি। তাই প্রশাসনের উচিৎ দ্রুত এসব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু আমাদের করার কিছু নেই। এটা বন বিভাগের দেখার দায়িত্ব।’

ঠাকুরগাঁও বন বিভাগের কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বন্যপ্রাণী আইনে দেশি ও অতিথি পাখি এবং প্রাণি শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। শিকারীদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।