মেইন ম্যেনু

ডাকাত ধরতে পুলিশের প্রেমের ফাঁদ!

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আক্তার হোসেন ওরফে আক্তার কোম্পানির বাসায় স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে বেঁধে ৮৪ ভরি স্বর্ণ ও নগদ ১৩ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। এরপর ডাকাত সরদার নূর মোহাম্মদ ভারত পালিয়ে যায়। ওই ডাকাত সরদারের ভারতীয় মোবাইল নম্বর যোগাড় করে এক নারী কনস্টেবল দিয়ে প্রেমের ফাঁদ তৈরি করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সেই ফাঁদে পা দিয়ে ঘটনার ৯ মাস পর ঢাকায় এসে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় ওই ডাকাত সরদার।

ঘটনাটি এখানেই শেষ নয়, ওই ডাকাত সরদারকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আক্তার হোসেনের ছোট ভাই নাজির হোসেন শামীম, আর ডাকাতির নেতৃত্ব দেয়া ডাকাত সরদার নূর মোহাম্মদ আক্তার কোম্পানিরই বাড়ির দীর্ঘদিনের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন।

শামীম নিজের ভাতিজির বিয়ের গহনা ও বিয়েতে খরচ করার জন্য ভাইয়ের জমি বিক্রির টাকা পরিকল্পিতভাবে ডাকাতি করান। এরপর এই শামীমই ভাই আক্তারকে দিয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলাও করান।

ঘটনাটি গত বছরের ১১ নভেম্বরের। ৯ মাস পর রহস্য উন্মোচন করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা চমকে যান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করার পর সত্যিই আমরা চমকে গেছি। এই শামীম আর নূর মোহাম্মদ মামলা থেকে শুরু করে ডাকাত ধরার জন্য পুলিশের কাছে ছোটাছুটি করেছে। তাদের সন্দেহ করারও কোন অবকাশ ছিল না।

ঘটনাটি প্রথমে তদন্ত করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। থানা পুলিশ সাহাবুদ্দিন নামে কোম্পানির এক কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছিল। ডাকাতির ঘটনাটি সে কোনভাবেই স্বীকার করেনি, যদিও সে ডাকাতির পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

পরে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে মামলাটির তদন্তভার আসে। গোয়েন্দা পুলিশ তদন্তে নেমে জানতে পারে, নূর মোহাম্মদ কয়েকদিন পর চাকরি ছেড়ে ভারতে চলে গেছে। এরপরই তাকে সন্দেহের তালিকায় রেখে তার ভারতীয় মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এরপর এক নারী কনস্টেবলকে দিয়ে প্রেমের ফাঁদ তৈরি করে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পর পুরো ঘটনার বর্ণনা সে গোয়েন্দা পুলিশকে দিয়েছে। এছাড়া ঘটনার পরিকল্পনাকারী শামীমও গোয়েন্দা পুলিশের কাছে সব স্বীকার করেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, ক্লুলেস ডাকাতির ঘটনাটির রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দাদের বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে। এখন ডাকাতির মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে গোয়েন্দাদের কাছ থেকে পুরো ঘটনা শুনে রীতিমতো বিস্মিত ব্যবসায়ী আক্তার কোম্পানি। তিনি জানিয়েছেন, প্রথমে সে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কথা বিশ্বাস করতে চাননি। পরে নিজের কানে ভাই ও তত্ত্বাবধায়কের কাছে সব শুনে রীতিমতো ‘থ’ বনে গেছেন তিনি।

তিনি বলেন, শামীম ছয় বছর সৌদি আরবে ছিল। কয়েক বছর আগে সে দেশে ফিরে আসে। দেশে এসে সে মাদকাসক্ত ও খারাপ লোকজনের সঙ্গে মেশা শুরু করে। তার দুই স্ত্রী রয়েছে।

যেভাবে ডাকাতি সংঘটিত হয়েছিল:

শামীম ও নূর মোহাম্মদ পুরো ডাকাতির ঘটনার বর্ণনা দেন গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। তারা গোয়েন্দা পুলিশকে জানিয়েছে, আক্তার কোম্পানির পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে নাজির হোসেন শামীম হলো চতুর্থ। আক্তার কোম্পানি নিজের একমাত্র মেয়ের বিয়ের জন্য প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার তৈরি করেন। খরচের জন্য ঘরে রাখেন ১৩ লাখ টাকা। এই বিষয়টি পরিবারের সদস্য হিসেবে শামীম জানতে পেরে এই টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করার জন্য পরিকল্পনা করে।

এরপর এই পরিকল্পনার কথা শামীম বাড়ির কেয়ারটেকার নূর মোহাম্মদকে জানালে সে ডাকাতি বাস্তবায়নের পুরো দায়িত্ব নেয়। এজন্য সে সেলিম, রিয়াজ, ফারুক ও সাহাবুদ্দিনকে ঠিক করে।
সাহাবুদ্দিনও আক্তার কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতো। পরিকল্পনা মতো ঘটনার দিন বাসার সামনে ভাই আক্তার কোম্পানিকে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব নেয় শামীম। বাসার পাশেই আক্তার কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যালয়। ডাকাতির সময় আক্তার কোম্পানি যেন বাড়িতে প্রবেশ না করে সেজন্য নানা অজুহাতে অফিসেই বসিয়ে রাখে সে। সাহাবুদ্দিনও অবস্থান করে তার সঙ্গে।

ঘটনার সময় নূর মোহাম্মদ বাড়ির সামনে অবস্থান নেন। চতুর্থতলা আক্তার কোম্পানির ফ্ল্যাটে গিয়ে কলিং বেল টিপে ডাকাতি করে সেলিম, রিয়াজ ও ফারুক। আক্তার কোম্পানির ছেলে তানভীর দরজা খুলে দিতেই তাকে প্রথমে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতরা। পরে স্ত্রী সেলিনা ও মেয়ে মীমকেও জিম্মি করে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে। পরে আলমারি খুলে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।

ঘটনার সময় আক্তার কোম্পানি তার কর্মচারী সাহাবুদ্দিনকে বাড়িতে পাঠায় কাজে। সাহাবুদ্দিন বিপদে পড়ে যায়। তাৎক্ষণিক বুদ্ধিতে সাহাবুদ্দিনকেও বেঁধে রাখার পরিকল্পনা করা হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার যায়েদ শাহরিয়ার জানিয়েছেন, টাকা ও স্বর্ণ ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোন্দলের কারণে নূর মোহাম্মদ ভারতে পালিয়ে যায়। শামীম নিজের ভাইয়ের বাসায় ডাকাতির কথা বলে ভাগ বেশি চায় আর নূর মোহাম্মদ সেটি মানতে চায়নি।

এই ঘটনায় ডাকাত দলের সদস্য সেলিম, ফারুক, রিয়াজ ও শাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।