মেইন ম্যেনু

ডিজিটাল গোরস্থানে পরিণত হচ্ছে ফেসবুক

মানুষের জন্ম হয়, মৃত্যু হয়, এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। মানুষ যতই অমরত্বের পেছনে ছুটুক না কেন, শেষমেষ অমরত্ব আর মেলে না। মানবদেহ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিলীন হয়ে গেলেও শুধু রয়ে যায় ওই ব্যাক্তির কাজ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই প্রযুক্তিবান্ধব সময়ে মানুষ মরলেও রয়ে যায় তার সাধের ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি। যতদিন বাড়ছে ততই ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। আর স্বাভাবিক মানবমৃত্যুর কারণে বাড়ছে মৃত মানুষদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা। ফেসবুক তাই ধীরে ধীরে পরিনত হচ্ছে মৃত মানুষদের ডিজিটাল গোরস্থানে। ২০০৪ সালের ফ্রেরুয়ারি মাসে এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটির যাত্রা শুরু হয়।

প্রথমদিকে সবার কাছে এতটা জনপ্রিয়তা না পেলেও যতই দিন যাচ্ছে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা যেন ততই বাড়ছে। বর্তমানে ফেসবুকের নেটওয়ার্ক এখন বিশ্বজুড়ে। আর ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট নেই এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম পাওয়া যাবে। বর্তমান বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তিন মিলিয়নেরও বেশি। এখন প্রশ্ন হলো তিন মিলিয়ন মানুষের মধ্যে সবাই কি বেঁচে আছেন। আর যারা বেঁচে নেই তাদের অ্যাকাউন্টগুলোই বা কেমন প্রভাব ফেলছে সেই ব্যবহারকারির আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের ওপর। এ কথা কি কেউ কোনদিন ভেবে দেখেছেন?

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারি যখন মারা যায়, তখন হতে পারে তার মৃত্যুটি স্বাভাবিক আবার কোন কোন ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক। অনেকে এমনেও আছেন যারা ফেসবুকে অজানা ব্যাক্তির সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার মৃত্যুর আগে সুইসাইড নোট লেখার জন্যও শেষ আশ্রয়টি নেয় এই ফেসবুকেই। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে হাজারো ফেসবুক ব্যবহারকারী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেও রয়ে যায় তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি। আর এই অ্যাকাউন্টটিই প্রতিনিয়ত স্বজনদের মনে করিয়ে দেয় হারিয়ে যাওয়া মানুষটির কথা।

একটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তর বলা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক জ্যাকি। প্রায় দুবছর হলো রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে তার। কিন্তু এখনও রয়ে গেছে ২০০২ সালে খোলা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি। তিনি নেই, কিন্তু রয়ে গেছে ফেসবুকে পোষ্ট করা তার ছবি এবং ভিডিওগুলো। যা প্রতিনিয়ত স্বজনদের তার স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। জ্যাকির মেয়ে এখনও যখন ফেসবুকে বসে তখন বারবার চোখ যায় মায়ের অ্যাকাউন্টটির দিকে। এই অ্যকাউন্টটি যেন কিছুতেই তাকে মায়ের কথা ভুলতে দেয় না। এখনও সে খুঁজে ফেরে মুত্যুর আগে মা তার জন্য কোথাও কিছু লিখে গিয়েছে কিনা। তা না হলে এমন রহস্যময় মৃত্যু কেন হবে তার।

এতো গেল একজন ব্যবহারকারীর কথা। তবে এমন আরো অনেকে আছেন যারা পৃথিবীতে নেই তবে তাদের অ্যাকাউন্টটি রয়ে গেছে একই রকমভাবে। ফেসবুকে মৃত ব্যাক্তিদের এই অ্যাকাউন্টগুলো দিনে দিনে নীরব গোরস্থানে পরিণত হচ্ছে। মাটি চাপা দেয়া সেই মৃত ব্যাক্তিগুলোকে কবরে প্রবেশের আগ পর্যন্ত শেষ দর্শন করা যায়। তবে ফেসবুকের অবদানে এই মানুষগুলোর সঙ্গে আপনি কথা না বলতে পারলেও প্রতিনিয়ত দেখতেতো পারবেন।

তবে মৃত ব্যাক্তির অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেয়ার জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট করলে অ্যকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু খুব হাতেগোনা মানুষই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে আগ্রহী হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এমন আর একজন নাগরিকের সন্ধান পাওয়া যায় যে কিনা মৃত্যুর আগে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখে গিয়েছিলেন ‘দয়া করে আমার এই প্রোফাইলটি বন্ধ করবেন না। আমি চাই আমার মৃত্যুর পর আমার নাতি নাতনিরা আমার সম্পর্কে জানুক’।

ফেসবুক এমন একটি মাধ্যম যেখানে সব অতীত স্মৃতিই বর্তমান। আপনি চাইলেই অতীতে ফিরে যেতে পারবেন। শুধু ফেসবুক নয় সবরকম সামাজিক মাধ্যমগুলোরই এখন একি অবস্থা। আগে মানুষ বিভিন্নভাবে পুরোণো স্মৃতি সংরক্ষণ করতো অ্যালবামের মাধ্যমে। আর এখন ছবি সংগ্রহ করে ফেসবুকের ডিজিটাল অ্যালবামে সুতরাং মানুষ হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু তার স্মৃতি এবং তার অতীত কোন কার্যকলাপ হারিয়ে যায় না। আর এভাবেই হাজার হাজার মৃত ব্যাক্তিরা নীরব হয়ে আছেন ফেসবুক নামক ডিজিটাল গোরস্থানে।