মেইন ম্যেনু

ঢাকার বাতাস ‘চরম অস্বাস্থ্যকর’

বায়ুমান সূচকে (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স-একিউআই) শূন্য থেকে ৫০ পিপিএম পর্যন্ত মাত্রার বায়ুকে ‘সবুজ বা স্বাস্থ্যকর’ বায়ু বলা হয়। অথচ ১৫ মার্চ রাজধানী ঢাকার বায়ুমানের সূচক ছিল ২২৪ পিপিএম। এর আগে ২ মার্চ ছিল ৩৩৫ পিপিএম, যাকে বলা হয় ‘চরম পর্যায়ের অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু।

পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘টেকসই বায়ু ও নির্মল পরিবেশ’ (ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট-সিএএসই) প্রকল্পের সর্বশেষ আপডেট তথ্য অনুযায়ী এমনই এক অস্বাস্থ্যকর বাতাসে বাস করছে ঢাকাসহ মহানগরগুলোর নাগরিকরা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল মহানগরের বাতাসের প্রতিদিনের বায়ুমানের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। তাদের প্রতিদিনের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বাতাসের মান সবচেয়ে বেশি খারাপ হয় শুষ্ক মৌসুমে।

ঢাকাটাইমস চলতি মার্চ মাসের বায়ুমান সূচকের যে ডেটা সংগ্রহ করেছে, তাতে এক ভয়াবহ চিত্রই পাওয়া যায়। মান নির্ণয়ের সূচকে প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার বাতাস ছিল ‘খুবই খারাপ পর্যায়ের’।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ছিল ২ মার্চ। এদিন ঢাকায় বায়ুমানের মাত্রা ছিল ৩৩৫ পিপিএম। এর আগের দিন ১ মার্চের চিত্রও ভয়াবহ্- ৩৩১ পিপিএম। আর ৩ মার্চ একিউআই ছিল ৩১৯ পিপিএম। তিন দিনই বাতাসে খারাপ পদার্থের পরিমাপ ছিল সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ‘চরম পর্যায়ের অস্বাস্থ্যকর’।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া শুষ্ক থাকলে কিংবা বৃষ্টিপাত না হলে মহানগরের বাতাসে ক্ষতিকর ধূলিকণা ও যৌগ গ্যাসের মাত্রা বেড়ে যায়। প্রতিবছর নভেম্বর মাস থেকে দেশের মহানগরগুলোর বায়ুতে ক্ষতিকারক এসব উপাদানের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজ করে।

ঢাকার পাশের দুই সিটি করপোরেশন গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহীতে শুষ্ক মৌসুমের অধিকাংশ দিনে বাতাসে ভাসমান বস্তুকণা থাকে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ মাত্রায়। ফলে শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু করে ঠাণ্ডাজনিত রোগ, শ্বাসনালীর ক্ষতসহ নানা ধরনের মারাত্মক স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগতে হচ্ছে শিশু ও বয়স্কদের।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্পের পরিচালক এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খানের মতে, বায়ুদূষণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। তবে বর্ষায় অবস্থা তুলনামূলকভাবে ‘ভালো’ থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক জলবায়ু গ্রামের তুলনায় নগরজীবনের জন্য বেশি ক্ষতিকর। এ সময় ইটভাটা, ইমারত নির্মাণ, রাস্তা সংস্কার, যানবাহন চলাচল, গৃহস্থালির বর্জ্য ও কলকারখানার ধোঁয়া তুলনামূলক বেশি বায়ুদূষণ ঘটায়। বৃষ্টিপাত না থাকা এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকে বলে নাইট্রোজেন, কার্বন মনো-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর যৌগ গ্যাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়, যা সহজেই মানুষের শ্বাসনালিতে প্রবেশ করতে পারে। একই সঙ্গে বাতাসে মিশে থাকে প্রচুর ধুলাবালি।

পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, ৫০ পিপিএম পর্যন্ত মাত্রার বায়ুকে ‘সবুজ বা স্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। ৫১ থেকে ১০০ পিপিএম হলে তাকে ‘মধ্যম’ বায়ু বলা হয়, যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। ‘সতর্কতামূলক’ বায়ু ধরা হয় ১০১ থেকে ১৫০ পিপিএম হলে, যেটা মানুষের জন্য মৃদু ক্ষতিকর। একিউআই ১৫১ থেকে ২০০ পিপিএম হলে সে বায়ুকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণীতে ফেলা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ পিপিএম একিউআই মাত্রার বাতাসকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং এরপর থেকে ৫০০ পিপিএম মাত্রা পর্যন্ত ‘চরম পর্যায়ের অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

টেকসই বায়ু ও নির্মল পরিবেশ (সিএএসই) প্রকল্পের প্রতিদিনের একিউআই প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ৯ মার্চ ঢাকায় একিউআই মাত্রা ছিল ২১৩ পিপিএম, ৮ মার্চ ২২৬ পিপিএম, ৭ মার্চ ১৯৭ পিপিএম, ৬ মার্চ ২২৬ পিপিএম, ৫ মার্চ ২৪৮ পিপিএম, ৪ মার্চ ২০৪ পিপিএম, ৩ মার্চ ৩১৯ পিপিএম, ২ মার্চ ৩৩৫ পিপিএম ও ১ মার্চ ছিল ৩৩১ পিপিএম। এমন চিত্র চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেটসহ সব মহানগরীতে।

এ ব্যাপারে কথা হয় পরিবেশবিদ ও প্রকৌশলী অধ্যাপক আশরাফ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশের প্রধান আট মহানগরের বায়ুর মান পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অক্টোবর মাসের শেষ দিক থেকে বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ বাড়তে থাকে। আর পুরো শুষ্ক মৌসুমে তা ‘চরম পর্যায়ের ক্ষতিকর’ রূপ নেয়। বিশেষ করে শুষ্ক বাতাসে জলীয় বাষ্প কম থাকে বলে এসব উপাদান সহজেই ভেসে বেড়াতে পারে। এ সময় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় শুষ্ক বাতাসে এসব উপাদানের পরিমাণ বাড়তে থাকে। তিনি বলেন, এপ্রিল মাসের দিকে বাতাসের অবস্থা সহনশীল মাত্রায় পৌঁছাবে।

এক প্রশ্নের জবাবে আশরাফ আলী বলেন, ইটভাটা, গাড়ি ও কলকারখানার ধোঁয়ার কারণে বাতাসের মান সবচেয়ে বেশি খারাপ হয়। এসব নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইটভাটার দূষণ পুরোপুরি নিরসন করা সম্ভব।

রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক আফজালুল করিম ঢাকাটাইমসকে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে বাতাসের মান খারাপ থাকায় হাঁচি-কাশি, সাইনোসাইটিস, গলাব্যথা, অ্যাজমা-অ্যালার্জি, শ্বাসতন্ত্রে ক্ষতসহ নানা ধরনের রোগে মানুষ আক্রান্ত হয়। বায়ুদূষণ এর বড় কারণ।”

আফজালুল করিম বলেন, বয়স্কদের মতো শিশুরাও বায়ুদূষণের কারণে নানা অসুস্থতায় ভুগছে। ‘সিজনাল ডাস্টের’ কারণে শুষ্ক মৌসুমে এ ধরনের রোগী বেশি আসে বলে জানান তিনি।