মেইন ম্যেনু

‘ঢাকার মৃত্যু ঘটিয়েছে ফ্লাইওভারগুলো’ : বুয়েট অধ্যাপক

ড. সামছুল হক বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পরিবহন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণ করেছেন। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিডেটের পরিচালক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবহন, যানজট, উন্নয়ন, পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি দীর্ঘ আলাপ হয় তার সঙ্গে। এ সময় ঢাকা থেকে রাজধানী স্থানান্তর সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেন এই নগরবিদ। সাপ্তাহিকে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি আওয়ার নিউজ বিডি’র পাঠকদের জন্য শেয়ার করছি।

সায়েম সাবু : রাজধানীর যানজট অসহনীয় পর্যায়ে। পরিবহন বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিষয়টি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?
সামছুল হক : ঢাকা এখন মৃতপ্রায় নগরী। পরিবহনে গন্তব্যে পৌঁছার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নগরের সমস্যা অনেক এবং প্রতিটি সমস্যা একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। গাড়ি চলার যেমন চাহিদা থাকে তেমনি থামানোর চাহিদাও থাকে। আমি গণপরিবহনের বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করব। ঢাকা শহর যেহেতু অপরিকল্পিত নগরী সেহেতু রাস্তাঘাটগুলোই ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রধান সড়কের বাইরে শুধু রিকশাই চলবে। আপনি কলাবাগানের ভেতরের রাস্তাগুলোর কথা চিন্তা করেন। অথচ পরিকল্পিতভাবে হলে সেই রাস্তাগুলোতে অন্তত মিনিবাস চলাচল করতে পারত। জাপানে এর চেয়ে সরু রাস্তায় বাস চলাচল করে। সেখানে ১০ ফুটের চেয়ে কম প্রশস্ত রাস্তায় গাড়ি চলাচল করছে।

সায়েম সাবু : তা কীভাবে সম্ভব?
সামছুল হক : সেখানকার রাস্তা সোজা। সোজা রাস্তায় একমুখী গাড়ি চলাটা খুবই সহজ। শহরের মধ্য দিয়ে ২শ থেকে ৩শ ফুট দূরত্বে দুটি রাস্তায় গাড়ি দুই দিকে চলাচল করছে। মানুষ একেবারে দোরগোড়ায় গাড়ি পেয়ে যাচ্ছে।
যারা এসবের পরিকল্পনা করছে তাদের পেশাই পরিকল্পনা প্রণয়ন। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ালে যানজট হতে পারে বলে রাস্তার পাশে যাত্রী ওঠানামার জায়গা নির্ধারণ করা আছে। থামানো গাড়িতে যাত্রী ওঠানামা করছে অন্যের কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি ছাড়াই।

সায়েম সাবু : এমন রাস্তা ঢাকাতেও আছে?
সামছুল হক : না পরিকল্পনা করে কোনো রাস্তা তৈরি করা হয়নি। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে যাচ্ছেতাই রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকায় অনেক রাস্তা আছে ২০ ফুট চওড়া অথচ সেখানে বাস চলাচল করতে পারছে না। কারণ রাস্তার কিছুদূর যেতে না যেতেই দেখা যাবে ৯০ ডিগ্রি কোণের একটি মোড়। ওই রাস্তায় ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্সও প্রবেশ করতে পারবে না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে কাউকে উদ্ধার করার মতো উপায় থাকবে না।
একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স পাশাপাশি চলতে পারলেই তাকে আমরা সড়ক বলে জানি। কিন্তু ঢাকার ৯২ শতাংশ রাস্তা রয়েছে যেখানে বড় গাড়ি চলতে পারবে না। সুতরাং আমাদের অবকাঠামোই বলে দিচ্ছে রিকশা থাকবে।
ঢাকা শহরটি অভিভাবকহীন অর্থাৎ পরিকল্পনার বাইরে থেকে এসে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে (ডিকটেটেড) দেয়া হয়েছে। পরিকল্পিত এবং চাপানো আলাদা বিষয়। চাপিয়ে দেয়া হতে পারে কিন্তু সেখানে যদি পরিকল্পনা থাকে তাহলে এক সময় ভালো কিছু হবেই।

সায়েম সাবু : পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন তো সরকারগুলোর পরম্পরায়?
সামছুল হক : পরিকল্পনাহীন শুধু স্বাধীনতার পরবর্তী সরকারগুলোর ক্ষেত্রেই নয়। ব্রিটিশ আমল এবং পাকিস্তান আমল থেকেই ঢাকা অপরিকল্পিত নগরী। উন্নয়নে কলকাতাকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ঢাকাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। একইভাবে পাকিস্তান আমলেও করাচিকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে ঢাকাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
এ কারণেই স্বাধীনতার পর উন্নয়ন প্রশ্নে ওপর থেকে নিচের দিকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া নীতি অবলম্বন করতে হয়। যে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা ছিল নিচ থেকে ওপরে। যখন যেখানে, যা দরকার সেটা করতে গিয়ে ঠোকা দেয়ার মতো কাজ হয়েছে মাত্র। উন্নয়নে কোনো পরিকল্পনা ছিল না।
এ কারণে ঢাকায় মাত্র তিনটি সড়ক রয়েছে, যেখানে বাস চলাচল করতে পারে। সংখ্যায় তিনটি হলেও সড়কগুলোর গুণগত মান কিন্তু অনেক দুর্বল। এরশাদ সাহেব প্রগতি সরণি সড়ক করলেন। উত্তরা থেকে এসে সড়কটি একদিকে জনপদ সড়ক এবং আরেকটি মৌচাকের সড়কের সঙ্গে মিলে গেল। উত্তরা-পূর্বাচলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে মেট্রোরেল কুড়িল হয়ে মৌচাকে আসতেই ৯০ ডিগ্রি একটি মোড় মিলবে। কাকরাইলের দিকে যেতে আরেকটি একইরকম মোড় পাচ্ছি। বিজয়নগরের কাছে আরেকটি মোড়। রেলপথ তো এভাবে মোড় নিতে পারে না।

সায়েম সাবু : মেট্রোরেল ছাড়া তো উপায় নেই?
সামছুল হক : মুমূর্ষু রোগী মরে যাওয়ার আগে যেমন অতিশক্তিশালী ইনজেকশন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, তেমনি মৃতপ্রায় ঢাকাকে বাঁচানোর চেষ্টায় মেট্রোরেলের মতো প্রজেক্ট করা হচ্ছে। ঢাকা নগর এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) রয়েছে বলে আমি মনে করি। দুর্ভাগ্য যে নিবিড় পর্যবেক্ষণ থেকে ঢাকা শহরকে ফেরাতে আমরাও সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।

সায়েম সাবু : আইসিইউ-তে রাখা অধিকাংশ রোগীকেই আর ফেরানো যায় না। তাহলে মেট্রোরেলের মতো প্রজেক্টে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে লাভ কি?
সামছুল হক : কোনো মা কি চায় তার সন্তান চিকিৎসার অভাবে মারা যাক? ঢাকার অবস্থান এখন তাই। মেট্রোরেলের মতো প্রজেক্ট দিয়ে শেষ মুহূর্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। যদি কোনো সত্যিকার নগরপিতা থাকতেন, তাহলে ৫০ বছর আগেই নগরের জন্য গণমুখী সিদ্ধান্ত নিত।
দিল্লি থেকে নয়াদিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তর করা হয়েছে। করাচি থেকে ইসলামাবাদে চলে গেল। মাহাথির বলল, কুয়ালালামপুর ভালো কিন্তু রাজধানীর জন্য চলবে না। চলে গেলেন পুত্রজায়ায়। মায়ানমারের রাজধানীও সরানো হলো। শ্রীলঙ্কাও তাই করছে। এর কারণ হচ্ছে, ওই শহরগুলোতেও ঢাকার মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। চিকিৎসা দিয়ে বাঁচানোর আর উপায় ছিল না। এ কারণেই তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শুধু সড়ক দিয়ে তো আর নগর চলে না। বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা দরকার হয়। এখানে রেল আছে সড়কের সঙ্গে জট লাগিয়ে। নৌপথ আছে সড়কের সঙ্গে জট লাগিয়ে। এই জট লাগানো যোগাযোগ ব্যবস্থা অধিক মানুষের পরিবহন চাহিদা কোনোদিন-ই পূরণ করা যাবে না।

সায়েম সাবু : এই অবস্থায় কি করার আছে?
সামছুল হক : প্রশ্ন হচ্ছে, এমন অবস্থায় ঢাকায় বিনিয়োগ করব নাকি এখানে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ করে রাজধানীকে ধীরে ধীরে স্থানান্তর করার চেষ্টা করব। রাজধানী এখন সরিয়ে নেয়াই হচ্ছে যুগোপযোগী এবং বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত। ভারত এমন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল বলেই নয়াদিল্লি পরিকল্পিতভাবে সাজাতে পেরেছে। ইসলামাবাদ অনেক সুন্দর পরিকল্পিত নগরী। কারণ, তারা কোনো না কোনোভাবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছিল। দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমরা আজও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে পারিনি। কুয়ালালামপুর চমৎকার একটি শহর। এরপরেও তারা মনে করছে বাইরের বিনিয়োগ বাড়াতে হলে রাজধানী স্থানান্তর করতেই হবে। মিয়ানমার চায়নাকে দিয়ে তাদের রাজধানীর পরিকল্পনা করছে। এই দৃষ্টান্তগুলো তো আমাদের সামনে আছে।
আর আমাদের ঢাকার ভবিষ্যৎ কী হবে তা এখনই বলে দেয়া যায়।

সায়েম সাবু : কি হবে?
সামছুল হক : ইতোমধ্যেই ঢাকা শহর কলাপ্স (আটকে) হয়ে গেছে। একটি শহর সুন্দর কী না, তা বোঝার জন্য দুটি পিক দেখার দরকার পড়ে। একটি সকাল বেলা, আরেকটি বিকেলে। এটিকে বলে একটি নগরের রিদম। শহরের সবাই জানে সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত অফিসে যাওয়ার সময় গাড়ির চাহিদা থাকবে, অধিক যাত্রী থাকবে, যানজট থাকবে। একই চিত্র থাকবে বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত। ট্রাফিক চাপ ধরে কথা বললে, দেখা যাবে সকাল বেলা দুই ঘণ্টা যানজট এবং বিকেলের দুই ঘণ্টা যানজট নগরবাসীর অভ্যস্ত হওয়ার কথা। কিন্তু সকালে যে চাপ বাড়ছে, তা বিকেল পর্যন্ত গড়িয়ে যাচ্ছে। নগরকে যদি একটি শরীরের সঙ্গে তুলনা করি এবং সেই শরীরে যদি রিদম না থাকে তাহলে তো দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার কথা নয়।
সমস্ত পৃথিবীর শহরগুলোর এই দুই সময়ে পিক থাকে। এটি মানুষ মেনে নেয়। বাকি সময় কোনো যানজট নেই। অথচ ঢাকায় রাত ১০টা পর্যন্তও এখন তীব্র যানজট। ঢাকা মরে যাচ্ছে, তার লক্ষণ এটিই। শরীরে রক্তের চাপ বেড়ে যদি আর না কমে তাহলে বেঁচে থাকতে পারে না।
শহরে প্রতিনিয়ত মানুষ বাড়ছে, পরিবহনের সংখ্যাও বাড়ছে। যার ওপর ভিত্তি করে শহরের বেঁচে থাকা, সেই রাস্তা আর বাড়ছে না।
আমি যদি কয়েক বছর পেছনে গিয়ে ফার্মগেট-শাহবাগের রাস্তার দিকে তাকাই, দেখতে পাবো অনেক সুন্দর একটি সড়ক ছিল। কারণ এই সড়কের আশপাশের ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল। এখন দু পাশের রাস্তায় বহুতল ভবনের প্রতিযোগিতা চলছে। শপিংমল হচ্ছে। বাংলামটরে চার কোণায় চারটি বিশাল ভবন উঠছে। মানে, রাস্তা সরু না করে আরও কীভাবে সংকীর্ণ করা যায়, সেই চেষ্টা চলছে। এসব ভবনে হাজার হাজার মানুষ চাকরি করবে নতুবা বসবাস করবে। তারা মূল রাস্তা ব্যবহার করে পরিবহনও ব্যবহার করবে। ধমনিতে কলেস্টেরেলের পরিমাণ বাড়ালে রক্তচাপ তো এমনিতেই বেড়ে যাবে।
জনস্রোত ঠেকাতে পারছে না, গাড়ি ঠেকাতে পারছে না, রাস্তা চওড়া করতে পারছে না, সেই জায়গায় ভূমি উন্নয়নের নামে এমন ভবন তৈরি করা হচ্ছে, যাতে রাস্তাটি আরও সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। তার সব চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু জোগানটা কমছে। এই শহর কখন-ই বাঁচার কথা নয়।

সায়েম সাবু : মুক্তির উপায় কি?
সামছুল হক : চার-পাঁচ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী জাপান যাওয়ার আগে এক জাপানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশে এসেছিল। তিনি আমার সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেছিলেন। তার ব্যাপারে জাইকা আগেই আমাকে অবহিত করেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, প্রফেসর আমি একটি বিষয় নিয়ে তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই। তিনি বললেন, তুমি ঢাকা নিয়ে কী ভাবছ? আমি বললাম, ‘ঢাকার মৃত্যু ঘটেছে।’ মরে যাওয়ার এক সেকেন্ড পর গাছে পানি দিয়ে আর বাঁচানো যায় না। ঢাকা এখন সেই পর্যায়ে। শক্তিশালী ইনজেকশন দিয়ে আইসিইউতে রেখে জীবন কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখা যেতে পারে কিন্তু বসবাসের নগরীতে ঢাকাকে ফিরে আনার আর কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করি না। তিনি আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন, ‘প্রফেসর আমার গবেষণাও তাই বলে।’ তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন জাপান যাবেন আমি তাকে একটি প্রস্তাব দেব। আমি বললাম, কী প্রস্তাব। তিনি বললেন, রাজধানী সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব।

সায়েম সাবু : আপনি কি বললেন?
সামছুল হক : আমি বললাম, এই ভাবনা আমাদেরও গবেষণার ফসল। রাজধানী সরিয়ে নেয়ার জন্য বড় পরিকল্পনা এবং সময় নিতে হয়। সেই হিসেবে বড় একটি জায়গা নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বললেন, আমি প্রধানমন্ত্রীকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তাব দিচ্ছি। আমি বললাম, দুঃখিত। আপনি সেই সুযোগটিও পাবেন না।

সায়েম সাবু : আপনার এমন ধারণা কেন?
সামছুল হক : রাজধানীর জন্য এমন জায়গা নির্ধারণ করতে হবে যেটা প্রাকৃতিকভাবেই উঁচু। বন্যামুক্ত। দ্বিতীয়ত মাটি ভরাট করতে হবে না এমন জায়গা নিতে হবে। ঢাকায় এখন জলাশয় ভরাট করা ছাড়া আর কোনো জায়গা পাবেন না। বসুন্ধরা সিটিতে জায়গা কিনে আপনি খুশি হতে পারেন কিন্তু বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে আপনার সেই খুশি আর থাকবে না। মাটির নিচেই অধিক টাকা আগে বিনিয়োগ করতে হবে। রাজধানীর শহরের উন্নয়নে বড় একটি অংশ মাটির নিচে চলে গেলে তাকে অর্থনীতিবান্ধব কোনো শহর বলা যায় না।
সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পানি নিষ্কাশন করা হচ্ছে। ঠিক ক্যাথেডিন দিয়ে রোগী বাঁচিয়ে রাখার মতো।
রাজধানী হতে হবে স্টেডিয়ামের মতো। সবাই যেন সমান দূরত্ব অনুভব করে। আমি বুয়েট থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যাব, আর উত্তরা থেকে আরেকজন বাংলাদেশ ব্যাংকে আসবে, তা কখনও সমান হতে পারে না। সব প্রশাসনিক কার্যালয়, অফিস হবে দক্ষিণে আর সব আবাসিক এলাকা হবে উত্তরে এমনটি কোনো নগরের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

সায়েম সাবু : রাজধানী সরানোর ব্যাপারে কি বললেন?
সামছুল হক : বাংলাদেশ হচ্ছে বদ্বীপ। যাকে প্লাবনভূমি বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই প্লাবিত হয়। আমি তাকে বললাম, রাজধানী সরানোর উপযোগী একমাত্র জায়গা ছিল সাভার, পূর্বাচল এবং ভাওয়াল গড় এলাকা। কারণ, সেখানে লালমাটি আছে। টিলা আছে। কিন্তু সেই জায়গাটিও আবাসিকতার জন্য দখল হয়ে গেল।
মাহাথির পুত্রজায়ায় রাজধানী করেছেন ৭ হাজার একর জমির ওপর। আর আমাদের পূর্বাচলের জমির পরিমাণ ছিল সাড়ে ৬ হাজার একর। পূর্বাচলেই রাজধানী হয়ে যায়। শুধু পরিকল্পনার দরকার। তা না করে গুটিকয়েক মানুষকে কোটিপতি বানিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক মহাতুঘলকি কারবার।

সায়েম সাবু : এর জন্য কোনটিকে বিশেষত দায়ী করা যেতে পারে?
সামছুল হক : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাজ হচ্ছে রাজধানীর উন্নয়ন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি এখন ব্যক্তির উন্নয়নে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ের পরিবর্তে ব্যবহারে রূপ নিচ্ছে। সরকারগুলো এসে পরিকল্পনা ছাড়াই চাপিয়ে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে।

সায়েম সাবু : তাহলে এর জন্য প্রধানত রাজনীতিকেই দায়ী করতে হয়?
সামছুল হক : অবশ্যই। পলিসি তো একটি রাজনৈতিক সরকারই নিয়ে থাকে। রাজনীতি আর ব্যুরোক্রেসি-ই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে মনে করি। রাজউক-এর চেয়ারম্যান হওয়ার কথা প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট থেকে। আজ পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনাবিদ এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পায়নি। প্রেষণে পাঠানো লোক দিয়ে রাজউকের মতো প্রতিষ্ঠান চলছে। পরিকল্পনার জন্য ধ্যান লাগে, জ্ঞান লাগে। রাজধানী সরালে ৫০ বছর পর কীরূপ নিতে পারে তার জন্য ধ্যান করতে হয়।
এখানে দায়িত্ব নিয়েই উন্নয়নের কাছে যেতে থাকে পরিকল্পনাকারীরা। তাকে আলাদা অর্থের উৎস খুঁজতে হয়। কারণ তার সুযোগ-সুবিধা আর দশজনের মতো রাখলে চলে না। তাকে আলাদা করে মূল্যায়ন করতে হয়। অর্থের পেছনে ছুটলে পরিকল্পনা শূন্যের কোঠায় পৌঁছায়। পরিকল্পনাবিদ স্বাধীনভাবে কাজ করবে। তার কাজে অন্য কেউ প্রভাব ফেলবে না। এখন পরিকল্পনাকারী যদি প্রেষণে থেকে আসা কোনো ব্যক্তি হয়ে থাকেন, তিনি তো নিজের প্লট বরাদ্দ নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। দু’বছরের জন্য এসে নিজের আখের গুছিয়ে চলে যাচ্ছে।
সরকারের অযাচিত হস্তক্ষেপে প্রতিষ্ঠানগুলোর অক্ষমতার কারণেই এমন হচ্ছে। ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামেই গলদ রয়েছে। বলা হয়েছে তুমি রাজধানীর উন্নয়ন করবা কিন্তু তোমাকে অর্থ দেয়া হবে না। কারণ তুমি নিজেই কর্তৃপক্ষ। নিজের বাজেট নিজেকেই করতে হবে। ফলে এখানকার চেয়ারম্যানকে সারাক্ষণ টাকার পেছনে দৌড়াতে হয়। ভূমির উন্নয়ন করলে টাকা আসবে এই চিন্তায় তাকে কাজ করতে হয়। সড়ক বিভাগ, এলজিইডিকে হাজার হাজার কোটি টাকা দিতে হচ্ছে, অথচ রাজউককে বলছে তোমার টাকায় উন্নয়ন কর।
এই বৈপরীত্য থাকলে কোনো দিন-ই উন্নয়ন হবে না। উন্নয়ন হতে পারে কিন্তু গুণগত কোনো পরিবর্তন আসবে না। এক বছরের ব্যবধানে এক তলা ভবন দশ তলা হয়ে যাচ্ছে। পুরো একটি গ্রামের লোক একটি ফ্ল্যাটে বাস করছে। কিন্তু পাকিস্তান আমলে যে রাস্তা সেটাই আছে। বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে।

সায়েম সাবু : বাজেট না থাকার কারণ কি?
সামছুল হক : এর দায় সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। রেল তো ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে গেল। সড়ককে অর্থ দেয় সরকার আর রেলকে বলে তোমাকে আয় করতে হবে। সড়ককে হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে কোনো আয়ের হিসাব দেখে না সরকার, অথচ রেলকে বলছে, তুমি লোকসান করছ। কেন রেলকে লাভ করতে হবে? এ কারণেই আমি মনে করি, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্ম এবং অর্পিত দায়িত্বের মধ্যে সাংঘাতিক রকম বৈপরীত্য আছে।
জনবহুল এই দেশে সড়ক যেই পরিমাণ জমি নেয়, রেল কিন্তু সেই পরিমাণ জমি নেয় না। সরকারের কৌশল তো এখানেই। বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার কৌশল নিয়ে থাকবে। কারণ শুধু সড়কের উন্নয়ন করে যোগাযোগ নিশ্চিত করা যাবে না। রেলকে জনপ্রিয় করলে জমি যাবে না, অধিক জ্বালানি যাবে না, ভর্তুকি যাবে না। এগুলো হচ্ছে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার।

সায়েম সাবু : সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রশ্নে সরকারের মধ্যে অন্য কোনো সরকার কাজ করে কি না?
সামছুল হক : উন্নয়ন প্রশ্নে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ দাতানির্ভর। অর্থ সাহায্য করে দাতাদেরও তো কিছু না কিছু গোপন শর্ত থাকে। দাতারা দেখেছে, সড়ক বানালে তাদের গাড়ি বিক্রি হবে। তাদের লাভের উদ্দেশ্য তো থাকবেই। কারণ তাদের টাকাও জনগণের। অন্যদিকে আমাদের সরকারগুলোও জনগণের পালস বোঝেই সিদ্ধান্ত নেয়। রেল, নৌযান ব্যক্তির কথায় ছাড়ে না। ঘরের সামনে নামিয়ে দেয় না। মানুষ চায় চলার স্বাধীনতা, যা সড়ক দেয়। সরকার তাই দিতে গিয়ে জনগণের বাহবা পেতে চায়। কোথায় উন্নয়ন করলে ভোট বেশি পাওয়া যাবে সেই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সড়কে বিনিয়োগ করে থাকে। কৌশল এক বিষয় আর জনপ্রিয়তা আরেক বিষয়। সরকারগুলো জনপ্রিয়তার দিকে যেতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
জনগণ চায় ঘরে ঘরে সুবিধা, সরকার চায় ভোট এবং দাতারা চায় গাড়ি বিক্রি। তিনটিই সড়কে মেলে। কিন্তু সুদূরপ্রসারী চিন্তা নিয়ে সরকার কৌশলী হলে জনপ্রিয়তাকে এভাবে গুরুত্ব দেয়ার দরকার পড়ে না। সস্তা জনপ্রিয়তা, বিনিয়োগের গোপন এজেন্ডার কারণে কখন যে মানুষ ভুলে গেল যে, রেলের একটি অমিত সম্ভাবনা ছিল।

মানুষ এক টাকায় লিজ নিয়ে রেলের জমি দিয়ে কোটিপতি হয়ে যাচ্ছে। রেলের হাজার হাজার একর জমি অন্যেরা ব্যবহার করছে। আপনি রেলকে তার জমি ব্যবহার করার সুযোগ দিলেন না। অথচ অন্যকে দিলেন। হংকং দেখিয়েছে, রেলের জমি কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। আপনি ভর্তুকি দিতে পারেন, কিন্তু রেলের জমি ব্যবহার করে সেখান থেকে রিটার্ন পাওয়ার ব্যাপক সুযোগ আছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সম্পদ রয়েছে রেলের। এই সম্পদ ব্যবহার করেই রেলের উন্নয়ন করা সম্ভব হতো। অথচ রেলের জমি অন্যকে ব্যবহার করার সুযোগ দিচ্ছে। মহাখালীতে রেলের জমিতে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছে। আর্মিরা রেলের জায়গায় আবাসিক ভবন করছে। ঢাকার কেন্দ্র ফুলবাড়িতে রেলের জায়গায় মার্কেট, দক্ষিণ সিটি ভবন, পুলিশ সদর দপ্তর নির্মাণ করা হয়েছে।
কারা এগুলো করল, কেন করল তার কোনো জবাব নেই। এই সমাজ দায়বদ্ধ নয়। নইলে রেলের এই হাল হতে পারে না। ঢাকার মতো মেগা সিটিতে রেলের উন্নয়ন ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না। চীন, জাপান হুঙ্কার দিয়ে রেলের গতি বাড়াচ্ছে। সবাই এই জায়গাতে বিনিয়োগ করছে, গবেষণা করছে। কারণ তারা রেলের ক্ষমতা উপলব্ধি করতে পেরেছে।
চাহিদা অনুসারে রেলের গতি বাড়ান, ট্রেনের সংখ্যা-বগির সংখ্যা বাড়ান, প্রয়োজনে দোতলা ট্রেন ব্যবহার করেন। রেলের একটি মাত্র রাস্তায় আপনি ক্যাপাসিটি কয়েকগুণ বাড়াতে পারেন, যা সড়কে পারবেন না।

সায়েম সাবু : ঢাকার এমন বিপর্যয় মোকাবেলায় মেট্রোরেল কতটুকু সহায়ক হতে পারে?
সামছুল হক : এসটিপিতে ঢাকার জন্য ছয়টি রূপরেখা ছিল। এর মধ্যে ৩টি সড়কভিত্তিক এবং ৩টি রেলভিত্তিক।
ঢাকায় যে পরিবহন চলে তাকে গণপরিবহন বলা যায় না। গণপরিবহনের বৈশিষ্ট আছে। আকাশ ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করছে। সড়কেও এমন আয় হতে পারত। সরকার নিশ্চয়তা দিলে অন্যেরা সেবা দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। সড়কে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার জন্য বাইরে থেকে কোম্পানি আসত।
নিয়ন্ত্রণ নেই বলে সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। একটি মাত্র কোম্পানি ঢাকার একটি রাস্তায় পরিবহন সেবা দিতে পারলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। সড়কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহনের লেনটি আলাদা করে দেয়া হোক, দেখা যাবে দিনে একেকটি পরিবহন মিরপুর থেকে মতিঝিলে ১৫ বার ট্রিপ দিতে পারবে। সরকার সে কৌশল না নিয়ে শত শত বাস নামিয়ে আরও যানজট সৃষ্টি করছে। গণপরিবহন চলার নিশ্চয়তা দিলে সবাই বাসে চলাচল করতো।

সরকার গণপরিবহন সমস্যার সমাধান না করতে পেরে মেট্রোরেল করতে চাইছে। রাজধানীতে প্রতি ঘণ্টায় হয়ত ২০ হাজার লোক বাসে চলাচল করছে। কিন্তু চাহিদা রয়েছে আরও ৫০ হাজারেরও বেশি, যার জোগান বাসও আর দিতে পারবে না। বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে সমাধান আসছে না বলেই মেট্রোরেল ব্যবস্থা।
দুর্ভাগ্য হচ্ছে ফ্লাইওভারগুলোর কারণে মেট্রোরেলও আর আগের নকশায় হচ্ছে না। এই শহর এমনিতেই মরে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা ঢোল বাজিয়ে শেষকৃত্যটা করছি। মগবাজার, মৌচাক, মালিবাগ, তেজগাঁও ফ্লাইওভারের কারণে মেট্রোরেল হতে পারবে না। মেট্রোরেলের উৎকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে রাস্তার মধ্যখানে। ফ্লাইওভারগুলোও এখন রাস্তার মধ্যখানে। ফ্লাইওভার কোনো সমাধান নয়। এগুলো ছোট ছোট গাড়িগুলোকে আরও আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। বাস ফ্লাইওভারে কম ওঠে।
সুতরাং ঢাকাকে বাঁচানোর জন্য ন্যূনতম যে সুযোগটি ছিল, ফ্লাইওভারের কারণে তাও শেষ হয়ে গেছে। ঢাকার মৃত্যু ঘটিয়েছে ফ্লাইওভারগুলো।
গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার হওয়ার পরেই মেট্রোরেলের গতি হারিয়েছে। বিআরটি-২ আর হবে না। অর্থাৎ এসটিপিতে সুপারিশকৃত এবং পরীক্ষিত কৌশলগুলোও আর বাস্তবায়ন হতে পারবে না। একমাত্র হতে পারে মেট্রো-৬, যেটি উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত আসার কথা। তাও নানা হোঁচট খেয়ে। বিমান বাহিনীর অযৌক্তিক বাধায় পড়তে হয়েছে এটিকে। আবার গুলিস্তান ফ্লাইওভারের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এসে ঝুলে থাকতে হবে। সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে থাকবে।
তিনটি এমআরটি সমন্বিতভাবে করা হয়েছিল। দুটি উত্তর-দক্ষিণ প্রলম্বিত। আরেকটি ছিল রিংয়ের (গোলাকার) মতো। এই রিং দিয়ে সংযুক্ত করার কথা। কিন্তু ফ্লাইওভারের কারণে বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে থাকবে। একশ বছর পর কী হবে তার ওপর গবেষণা করেই খুঁটি নির্মাণ করার কথা। এক মহাখালী ফ্লাইওভারের কারণে সেখানকার রাস্তায় আর কোনো পিলার দেয়া যাচ্ছে না। একটি ওভারপাস করে নাম দিলাম ফ্লাইওভার। এখনও তাই হচ্ছে। কৌশলপত্র দেখলেই বোঝা যাবে, এগুলো আর বাস্তবায়ন করা যাবে না।

সায়েম সাবু : তার মানে ঢাকাকে স্থানান্তর করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই?
সামছুল হক : চাইলেই তো হবে না। স্থানান্তরের জায়গা কই?

সায়েম সাবু : তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি?
সামছুল হক : ভবিষ্যৎ খুব খারাপ। খুব ক্ষীণভাবে বেঁচে আছি। এ কারণেই অনেকে আমাকে নেগেটিভ মানুষ বলে। শুধু ঢাকা শহর নয়, গোটা দেশের-ই একই অবস্থা। ক্যান্সারের সেল যেমন অনিয়ন্ত্রিতভাবে বড় হয়ে মানুষ মারা যায়, তেমনি অনিয়ন্ত্রিতভাবে নগরায়ণ করে গোটা দেশের মৃত্যু ঘটাচ্ছে। পুরো দেশ অপরিকল্পিত উন্নয়নের খপ্পরে। এমন নগরায়ণে শুধু পরিবহন সমস্যা নয়, সকল সমস্যা দ্রুতগতিতে বেড়ে যাচ্ছে।

সায়েম সাবু : কিন্তু উন্নয়ন তো থেমে থাকতে পারে না?
সামছুল হক : সবাই উন্নয়নে বিশ্বাসী। কিন্তু কীভাবে টেকসই উন্নয়ন করা যায় সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। সরকার উন্নয়নকে যৌক্তিক বলছে। কিন্তু তিনটি গণপ্রজেক্ট আটকিয়ে মগবাজার ফ্লাইওভারকে আমি কোনোভাবেই যৌক্তিক উন্নয়ন বলতে পারি না। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার কোন নকশায় হলো আপনাকে তা দেখতে হবে।
কলকাতার পাশে হুগলি নদীতে কোনো নৌকা নেই। আছে ওয়াটারবাস। আর আমাদের বুড়িগঙ্গায় হাজার হাজার নৌকা চলছে। হুগলি নদী ওয়াটারবাসে পাড়ি দেয়া হয়। এরপর হাওড়া স্টেশনে এসে ট্রেনে। কিছুদূর গিয়ে ট্যাক্সি। যেন হাত মিলিয়ে দেয়া। আর আমাদের এখানে সদরঘাটে নেমে চোখে সরষে ফুল দেখতে হয়। ১শ ট্যাক্সি নামালেই উন্নয়ন নয়। পরিকল্পিতভাবে কিছু করতে পারাই হচ্ছে উন্নয়ন।
নৌ-মন্ত্রণালয় সদরঘাটে মার্কেট বানাচ্ছে। পোর্ট কর্তৃপক্ষও তাই করছে। সেনাবাহিনী, বিজিপি মার্কেট বানালে তো অন্যরাও বানাবে। এয়ারপোর্ট বানিয়েই সরকার ক্ষান্ত। সেখানে কীভাবে যাত্রীরা যাবে তার কোনো তদারকি নেই। সিটি করপোরেশন নগর পরিকল্পনা না করে মার্কেট বানাচ্ছে। আলোকিত সরকার থাকলে জবাবদিহি করত। বাসের রাস্তা নেই, হাঁটার রাস্তা নেই। রাস্তার পাশে সামান্য জায়গা পেলেই দোকান। সিটি করপোরেশন চলে গেছে দোকানে, রাজউক চলে গেছে জমিতে আর বিআরটিএ’র চোখ চলে গেছে যাত্রীর পকেটে। এই বিষয়গুলো বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।

সায়েম সাবু : তার মানে কোনো আশার বাণী শোনাবেন না?
সামছুল হক : মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর আত্মীয়স্বজনকে ডেকে ডাক্তার দুঃখ প্রকাশ করে বলে, রোগীকে বাড়িতে নিয়ে ভালোমন্দ খাওয়াইয়ে একটু আরাম দিন। আর ফেরানো যাবে না। অনেকেই মানতে চায় না। লন্ডন, সিঙ্গাপুরেও নিয়ে যায়। ফেরানো যায় না। ঢাকা নিয়ে আমার গবেষণাও তাই বলে।
সরকার আসে, সরকার যায়। আমলা আসেন আমলা যান। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের এখানে সরকার এসে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজের মতো করে ব্যবহার করতে থাকে। কোনো পরিকল্পনাবিদ বা প্রযুক্তিবিদের মূল্যায়ন হয় না। চীনে কমিউনিস্ট পার্টির পলিট ব্যুরোতে ১০-এর অধিক ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে। উন্নয়ন মানেই তো প্রযুক্তি, পরিকল্পনা। দুবাইয়ের দিকে তাকান। সেখানে আমেরিকাও বিনিয়োগ করছে। কারণ হচ্ছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্যদের বসিয়েছে। তারকাখচিত কোনো সেনা কর্মকর্তা বা প্রিন্সকে বসায়নি। সেখানে যোগ্য ইহুদিরও মূল্যায়ন হচ্ছে। আর আমাদের এখানে অমুক বাহিনীকে খুশি করতে হবে, সুতরাং তাদের কর্মকর্তাদের এই এই পদে নিয়োগ দাও। আর এ কারণে পরিকল্পিত উন্নয়নের ধারেকাছেও আমরা নেই।

সায়েম সাবু : দেশ তো এগিয়েও যাচ্ছে?
সামছুল হক : উন্নয়ন হবেই। তবে সেটা টেকসই কিনা সেটাই দেখার বিষয়। একটি উন্নয়ন আরেকটি উন্নয়নের জট পাকিয়ে দিচ্ছে। সরকার রেলের দুটি ট্রাকের কথা বলছে। ভালো কথা। তাহলে সড়কের কী হবে? রেলের কারণে বাসযাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে থাকতে হয়। সমন্বিত উন্নয়নই হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন। একটিকে অবহেলা করে আরেকটি অধিক গুরুত্ব পেলে তাকে টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না।