মেইন ম্যেনু

তনু হত্যা: দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে নতুন বিতর্ক

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে শুরু থেকেই একের পর নাটকীয়তা ও বিতর্ক যেন এ মামলার পিছু ছাড়ছে না। তদন্ত সংস্থা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের সমন্বয়হীনতার মধ্য দিয়ে শুরু থেকেই এ মামলার তদন্ত কার্যক্রম জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়ে।

সর্বশেষ রোববার দুপুরে ফরেনসিক বিভাগ থেকে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর তনু হত্যার ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তনুর পরিবার ও সচেতন মহল। প্রথম ময়নাতদন্তের ন্যায় বহুল প্রত্যাশীত তনুর দ্বিতীয় ময়নাতদন্তেও তার মৃত্যুর কারণ উল্লেখ নেই।

তবে মৃত্যুর পূর্বে তনুকে ‘ধর্ষণ’ নয় বরং তার সঙ্গে ‘সেক্সুয়্যাল ইন্টারকোর্স’ করা হয়েছে ফরেনসিক বিভাগ এবং ২য় ময়নাতদন্ত বোর্ডের প্রধান ডা. কেপি সাহার গণমাধ্যমে এমন তথ্য প্রকাশের পর এ নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

ফরেনসিক বিভাগ ‘পচা-গলা’ মরদেহ থেকে তনুর মৃত্যুর কারণ না খুঁজে না পেলেও শুধু মাত্র ডিএনএ রিপোর্টের ৩ পুরুষের পৃথক শুক্রাণু থেকে তনুর ‘সেক্সুয়্যাল ইন্টারকোর্স’ (সেচ্ছায় যৌন সংসর্গ) করার তথ্য নিয়ে তনুর পরিবার, সিআইডিসহ সর্বমহলে আরও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে মৃত্যুর আগে তনু ধর্ষিত হয়ে থাকলে প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেই ‘ফোর্সফুল সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের’ বিষয়টি উল্লেখ করা যেতো। কিন্তু ২য় প্রতিবেদনে ফোর্সফুল শব্দ বাদ দিয়ে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের’ তথ্য উল্লেখ করাই বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

মামলার তদন্ত সংস্থা সিআইডির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্র জানায়, গত ২০ মার্চ তনুর মরদেহ কুমিল্লা সেনানিবাসের একটি ঝোপ থেকে উদ্ধারের পরদিনই কুমেকের ফরেনসিক বিভাগে তার প্রথম ময়নাতদন্ত করেন ডা. শারমিন সুলতানা। কিন্তু ৪ এপ্রিল দেয়া ওই ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তনুকে হত্যা, ধর্ষণ কিংবা সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স করার মতো কোনো তথ্যই দেয়া হয়নি।

সিআইডি সূত্র জানায়, প্রথম ময়নাতদন্ত রিপোর্ট তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ায় ফরেনসিক বিভাগ বিতর্কমুক্ত হতে ডিএনএ প্রতিবেদনের উপর নির্ভর করে ২য় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে গিয়ে আবারো সমালোচনার মুখেই পড়েছে। ফরেনসিক বিভাগ তনুর ‘পচা মরদেহ’ হত্যার আলামত খুঁজে না পাওয়ার খোঁড়া যুক্তি দেখালেও অনুমানের উপর নির্ভর করেই সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’র তথ্য সন্নিবেশ করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লার একাধিক গাইনী বিশেষঞ্জ জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষণের পরীক্ষা করলে সঠিকভাবে আলামত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ, কোনো নারীকে ধর্ষণ করা হলে সাধারণত তার শরীরে `স্পার্ম ম্যাটোজোয়া` ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত জীবিত থাকে। এ সময়ের পর মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত নির্ণয় করা দুঃসাধ্য।

তবে কারও শরীরে বাহ্যিকভাবে ধর্ষণের কোনো গভীর আলামত থাকলে আর একই সঙ্গে মরদেহে পচন না ধরলে আলামত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তনুর প্রথম ময়নাতদন্ত ২৪ ঘণ্টার আগেই হয়েছে, তাই তাকে হত্যার কারণ থেকে শুরু করে ধর্ষণ, ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ কিংবা ‘ফোর্সফুল সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকই নির্নয় করতে পারতেন। এটা বিশ্বাসযোগ্য হতো।

এতে তিনি (শারমিন সুলতানা) হয়তো এসব কিছু গোপন রেখেছেন বলে তনুর পরিবার অভিযোগ করেছেন। ধর্ষণের ক্ষেত্রে স্পার্ম ম্যাটোজোয়া মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষার ব্যবস্থা কুমেকেই রয়েছে। তবে যে ডিএনএ প্রতিবেদনে শুধু মাত্র ৩ পুরুষের পৃথক শুক্রাণু পাওয়ার তথ্য ছিল, সেই ডিএনএ প্রতিবেদনকে মূল ভিত্তি ধরে সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স করার তথ্য নিয়ে তনুর পরিবারসহ সচেতন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

তবে মৃত্যুর আগে তনুকে ধর্ষণ করার প্রসঙ্গ টেনে ফরেনসিকের বিভাগীয় প্রধান ডা. কেপি সাহা সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, মেডিকেল টার্মে ধর্ষণ বলে কিছু নেই। এটা আইনি ব্যাখ্যা। ময়নাতদন্তে ডাক্তাররা কখনোই ধর্ষণ বলে না। ডাক্তারেরা বলে ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ (যৌন সংসর্গ বা যৌন সংঘম), আমরা কখনো ধর্ষণ বলি না।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান হাবিবুজ্জামান চৌধুরী বলেন, কোনো ভিকটিমের ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা হলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ‘জোরপূর্বক যৌন সংসর্গ’ লেখা হয়ে থাকে।

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে লেখা থাকে, ‘ফোর্সফুল সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের’ আলামত মিলেছে। তনুর ক্ষেত্রে মেডিকেল বোর্ড কেবল `ফোর্সফুল` শব্দটি উল্লেখ করেননি।

এ বিষয়ে মেডিকেল বোর্ডের বক্তব্য হচ্ছে, পচা-গলা মরদেহে এ ধরনের আলামত পাওয়া সম্ভব নয়। জোরপূর্বক ধর্ষণ করলে বাহ্যিকভাবে যেসব আঘাতের চিহ্ন শরীরে সাধারণত থাকে, এতদিন পর তা কোনোভাবে পাওয়া যাবে না। এটা প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব ছিল।

আন্তর্জাতিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ইন্দো প্যাসিফিক এসোসিয়েশন অব ল’ মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্সের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, প্রথম ময়নাতদন্তের সময় তার মৃত্যুর কারণ যেহেতু চিকিৎসক নির্ণয় করতে পারেননি, সেহেতু মরদেহটি সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। তখনই দ্বিতীয় দফায় বোর্ড গঠন করে ময়নাতদন্ত করা দরকার ছিল। তখন মরদেহটি দাফন করা ঠিক হয়নি। আন্তর্জাতিক ফরেনসিক আইন অনুযায়ী মৃত্যুর কারণ নির্ণয় না করা পর্যন্ত মরদেহ দাফন করা যায় না। তাছাড়া তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এখনো হত্যার ঘটনাস্থল সনাক্ত করতে পারেনি। অথচ ঘটনাস্থল সনাক্ত হওয়ার পর সেখান থেকেই অনেক আলামত সংগ্রহ করা যেতো।

২য় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা কুমিল্লা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল আলম চৌধুরী নোমান জানান, তনুকে ধর্ষণ বা সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’র তথ্য প্রকাশের চেয়ে আইনগতভাবে তার মৃত্যুর কারণটি খুঁজে বের করাই ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের উচিত ছিল। কিন্তু মৃত্যুর কারণ বের না করে তনুর ‘সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স’ করার তথ্য প্রকাশ করে ফরেনসিক বিভাগ কী বুঝাতে চেয়েছেন তা সবাই অনুমান করতে পারছে।

তিনি বলেন, চিকিৎসকদের এমন প্রতিবেদন মামলার সুষ্ঠু তদন্তে ব্যঘাত হওয়ার পাশাপাশি তনুর মৃত্যুর রহস্য যেন আরও অন্ধকারেই ঠেলে দিল।

তনুর ভাই আনোয়ার হোসেন জানান, তনুর মৃত্যুর কারণ উল্লেখ না করে ডাক্তাররা যে রিপোর্ট দিয়েছে তা মিথ্যা ও বানোয়াট। মামলা অন্য দিকে মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলেন, আমার মেয়ের নাকে আঘাত, মাথায় আঘাত, শরীরে বুটের পায়ের দাগ, বুটের পারায় পায়ের রানের মাংশ থেতলে ছিল, কিন্তু ডাক্তাররা কেনো মৃত্যুর কারণ খুঁজে পায়নি। ডাক্তাররা কাকে রক্ষা করতে এ মিথ্যা রিপোর্ট দিয়েছে।